দেশে ভোগ্যপণ্যের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জে মসলা জাতীয় পণ্যের দাম ফের অস্থির হয়ে উঠছে। সেখানে এক সপ্তাহের ব্যবধানে বেড়েছে পেঁয়াজ, আদা ও রসুনের দাম। যার প্রভাব পড়েছে খুচরা বাজারেও। খুচরা ব্যবসায়ীরা দুষছেন পাইকারদের। আর আড়তদাররা বলছেন চীনে ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাসের অজুহাতে আমদানিকারকরা পণ্য সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে বলেই দাম বেড়েছে এসব পণ্যের। খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, গেল এক সপ্তাহে বাজারে কোনো পেঁয়াজই সরবরাহ করেননি আমদানিকারকরা। অথচ উদ্ভিদ সঙ্গনিরোধ কেন্দ্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে, গত তিন দিনেও ৮৯৪ টন চীনা পেঁয়াজ আমদানি হয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে। তাদের প্রশ্ন, এত পেঁয়াজ গেল কোথায়?
গতকাল বুধবার খাতুনগঞ্জ ঘুরে দেখা যায়, পেঁয়াজ, রসুন ও আদার দাম কেজিপ্রতি বেড়েছে ২০-৫০ টাকা। বাজারে প্রতি কেজি চীনা পেঁয়াজ পাইকারিতে বিক্রি হচ্ছে ৭০ টাকা, যা গত দুই সপ্তাহ আগে বিক্রি হয়েছিল ৪০-৪৫ টাকা। এছাড়া বার্মা পেঁয়াজ কেজিতে ৩০ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ১১০-১১৫ টাকা দরে, যা গত দুই দিন আগেও বিক্রি হয়েছে ৮০ টাকায়।
গত সপ্তাহে নগরীর খাতুনগঞ্জে রসুন বিক্রি হয়েছিল পাইকারিতে কেজিপ্রতি ১৪০ টাকা। এ সপ্তাহে কেজিতে ৪৫ টাকা বেড়ে রসুন বিক্রি হচ্ছে ১৮৫ টাকা। গত সপ্তাহে আদা বিক্রি হয়েছে ১২০ টাকায়। গতকাল বুধবার খাতুনগঞ্জ বাজারে পাইকারিতে আদা বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ১৫০ টাকায়। এছাড়া বার্মা আদা প্রতি কেজি ৭৫ টাকা থেকে দাম বেড়ে ৯০-১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
খাতুনগঞ্জের হামিদুল্লাহ মার্কেট কাঁচামাল আড়তদার সমিতির সাধারণ সম্পাদক হাজী মোহাম্মদ ইদ্রিস দেশ রূপান্তরকে বলেন, চীনের রসুনের দামটা বেড়ে এখন দাঁড়িয়েছে ১৯০ টাকায়; যা গত সপ্তাহ থেকেই বাড়ছে। শুনেছি ভাইরাসের কারণে সরবরাহ বন্ধ, তাই আমদানিকারক বেশি দাম নিচ্ছে। এছাড়া চীনের পেঁয়াজ সরবরাহ বন্ধ বেশ কিছুদিন। তাই মিয়ানমারের পেঁয়াজের দামও বেড়ে যাচ্ছে।
তিনি জানান, প্রতিদিন খাতুনগঞ্জে কমপেক্ষ ৩০-৩৫টি পেঁয়াজের ট্রাক ঢুকে। তার মধ্যে ৫টির মতো চীন থেকে আমদানি করা পেঁয়াজের ট্রাক থাকলেও গত সপ্তাহে চীনের পেঁয়াজের একটি ট্রাকও আসেনি।
খাতুনগঞ্জের আরেক আড়তদার বলাই পোদ্দার বলেন, চীনের রপ্তানি বন্ধ থাকায় বেশ কিছুদিন ধরে আদা-রসুনের দাম কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী। আমদানিকারকরা জানিয়েছে করোনাভাইরাসের কারণে পণ্য আসতে সময় লাগবে। এজন্য অনেক আমদানিকারক পণ্যও দিচ্ছে না। সরকার যদি তাদের চাপ দেয় আর বিষয়টি মনিটরিং করে তাহলে বাজার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
তিনি বলেন, পণ্য আমদানি তো আর একদিনে হয় না। আমদানিকারকরা এখন যা নির্ধারণ করে দিচ্ছেন আমাদের তা কিনতে হচ্ছে। গত এক সপ্তাহ যাবত কোনো ধরনের চীনের রসুন-পেঁয়াজ পাচ্ছি না। বাজারে যারা মজুদ করেছে তারা সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা থেকেই বাড়তি দামে বিক্রি করছে।
কাজির দেউড়ি বাজারে মুদির দোকানি বাবুল চৌধুরী বলেন, করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়েছে চীনে দুই সপ্তাহ হলো। কিন্তু এর প্রভাবে বাংলাদেশে আদা রসুন পেঁয়াজের দাম বেড়ে গেছে। ২০-৫০ টাকা কেজিতে সব পণ্যের দাম বেড়েছে। ক্রেতারা ভাবছে আমরা দাম বাড়িয়েছি। আসল নিয়ন্ত্রক তো খাতুনগঞ্জ বাজার।
এদিকে উদ্ভিদ সঙ্গনিরোধ কেন্দ্রের তথ্যমতে গত জানুয়ারি মাসে ২৩ দিনে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে চীন থেকে ১৭ হাজার ৫৬১ টন পেঁয়াজ আমদানি হয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের উদ্ভিদ সঙ্গনিরোধ কেন্দ্রের উপ-পরিচালক মো. আসাদুজ্জামান বুলবুল বলেন, চলতি মাসের ২ থেকে ৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তিন দিনে ৮৯৪ টন চীনা পেঁয়াজ আমদানি হয়েছে। কোনো ধরনের সরবরাহ বন্ধ নেই, তাই পণ্য আমদানিতে প্রভাব পড়েনি।
একই কথা জানালেন কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) চট্টগ্রাম বিভাগীয় সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন। তিনি বলেন, ব্যবসায়ীদের অজুহাতের কোনো শেষ নেই। পণ্য যেসব খালাস হয়েছে তা কি একদিনে বিক্রি হয়ে যায়। গত মাসে যেসব রসুন পেঁয়াজ আসছে চীন থেকে তাহলে এসব গেল কই। পেঁয়াজ নিয়ে বাজার অস্থিতিশীল ছিল গত কয়েক মাস, এরপর মাঝখানে এলাচি নিয়ে এখন করোনাভাইরাসও তেমনি একটি অজুহাত। সরকারের উচিত বাজার মনিটরিংয়ে জোর দেওয়া।
এদিকে বিএসএম গ্রুপের চেয়ারম্যান আবুল বশর ও ঢাকার ওয়াসিফ ট্রেডিংয়ের স্বত্বাধিকারী মো. করিমুল্লাকে একাধিকবার ফোন করেও এ বিষয়ে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
