নিত্যপণ্যে উত্তাপ বাড়ছেই

আপডেট : ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০২:৩৫ এএম

ঢাকার পশ্চিম পান্থপথে বউবাজারে সদাই করেন ভ্যানচালক আবদুল হাকিম। অন্যদিনের মতো গতকালও দোকানে দোকানে গিয়ে দাম যাচাই করে নিচ্ছিলেন তিনি। প্রত্যেক দোকানিকে তার একই প্রশ্ন, দুদিন আগের চেয়ে দাম এত বেশি কেন? দোকানিদের জবাব, দুদিন আগের কথা বলছেন, এখন তো সকাল-বিকেল দাম কমে-বাড়ে। এরপর হাকিমের সঙ্গে এই প্রতিবেদকের কথা হয়। তিনি বলেন, ‘আমার সংসারে ছয়জন লোক। ছেলেমেয়ে পড়ালেখা করে। আয় করি আমি একা। দিনে চালই লাগে তিন কেজি। প্রতিদিন আয় হয় কত? বাজারে সবকিছুর দাম বাড়ছেই। একটু ভালো-মন্দ তো পরের কথা, ডাল-ভাতই ঠিকমতো জোটে না।’ হাকিমের মতো আরও অনেকের সঙ্গে এ প্রতিবেদকের কথা হয়। তাদের বক্তব্যও প্রায় একই। অনিয়ন্ত্রিত বাজারে ভোগ্যপণ্যের দামের ঊর্ধ্বগতিতে জীবনযাপনই দুরূহ হয়ে পড়েছে নিম্ন আয়ের মানুষের। তবে দেশের নীতিনির্ধারকরা বিভিন্ন সময়ে মুখরোচক প্রতিশ্রুতি দিলেও সুফল পাচ্ছেন না ভোক্তারা।

চলতি বছর শুরু থেকেই বেড়ে চলেছে চাল, ডাল, রসুন, পেঁয়াজ, ভোজ্য তেল, চিনি, মরিচ, ময়দা, আটা ও বিভিন্ন মসলার দাম। এ সময়ে আজ একটি পণ্যের দাম বাড়ছে, তো কাল অন্যটির। দেশ রূপান্তরের পর্যবেক্ষণ,  এ বছর এখন পর্যন্ত শুধু চালের (চিকন) দামই বেড়েছে কেজিপ্রতি ১০-১২ টাকা, মসুর ডাল ২৫-৩০ টাকা ও সয়াবিন তেলের দাম বেড়েছে লিটারপ্রতি ১০-১৫ টাকা। গত সপ্তাহের বুধবার খাদ্য মন্ত্রণালয় চালের দামবৃদ্ধি রোধে মনিটরিং কমিটি করার পরেই আরেক দফা পণ্যটির দাম বাড়ে। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে সরকার নানা উদ্যোগ নিলেও সেগুলো কাজে আসছে না। ফলে ব্যয়চাপ বেড়ে নাভিশ্বাস উঠছে ভোক্তার।

দেশের বাজার ব্যবস্থা মুক্ত হলেও কিছু নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে সরকার হস্তক্ষেপ করে থাকে। বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের তিনটি প্রতিষ্ঠানÑ ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি), খাদ্য অধিদপ্তর ও জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর কাজ করে থাকে। চালের দাম নিয়ন্ত্রণে খাদ্য অধিদপ্তর খোলা বাজারে আটা ও চাল বিক্রি করে আসলেও টিসিবি সীমাবদ্ধ শুধু পেঁয়াজ বিক্রিতে। আর ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর মাঝেমধ্যে দুয়েকটি অভিযান চালালেও দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে তাদের তেমন কোনো পদক্ষেপ নেই। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই মুহূর্তে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে অন্যতম ভূমিকা রাখতে পারে সরকারের এ তিন প্রতিষ্ঠান। দেশব্যাপী প্রতিষ্ঠানগুলো একযোগে কার্যক্রম চালালে দাম অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আসবে। অন্যথায় উচ্চ মূল্যস্ফীতি অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করবে।

এ বিষয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও অর্থনীতিবিদ এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, ‘এই মুহূর্তে একটাই উপায় আছে, কী কারণে দাম বাড়ছে সরকারের সেটা যাচাই করা এবং বাণিজ্য প্রতিযোগিতা আইন ও ভোক্তা আইনের সঠিক প্রয়োগ। সরকারের প্রতিষ্ঠানগুলোকেও সক্রিয় করতে হবে। অন্যথায় দ্রব্যমূল্য কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণে আসবে না।’

সরকারি বিপণন সংস্থা টিসিবির গত মঙ্গলবারের তথ্য অনুযায়ী, সপ্তাহের ব্যবধানে কেজিপ্রতি চালের (খোলা মিনিকেট) দাম বেড়েছে ২-৪ টাকা, ভোজ্য তেলের (সোয়াবিন) দাম বেড়েছে লিটারপ্রতি ২-৫ টাকা, ৫ লিটারের বোতলে দাম বেড়েছে ১০ টাকা, মসুর ডাল ৫ টাকা, আমদানি মসুর ডাল ১০ টাকা, পেঁয়াজের দাম কিছুটা কমলেও গত ১০ দিন আগের দামের চেয়ে ২০ টাকা বেশি। দুই সপ্তাহ ব্যবধানে রসুনের দাম কেজিতে বেড়েছে ৩০ টাকা, শুকনা মরিচ ২০ টাকা ও চিনির কেজিতে ৪ টাকা দাম বেড়েছে। এসবের মধ্যে ভোজ্য তেল, ডাল ও চিনি আমদানিনির্ভর হলেও বাকিগুলোর জোগান অভ্যন্তরীণভাবে হয়। ভোজ্য তেল, চিনি ও ডালের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে বাড়ায় এসব পণ্যের ওপর আরোপিত ভ্যাট ও ট্যাক্স কামানোর সুপারিশ করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। বিষয়টি অর্থ মন্ত্রণালয়ে বিবেচনাধীন। এরপরও পণ্য দুটির দাম বাড়ার কোনো যৌক্তিক কারণ দেখছে না বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।

গতকাল বুধবার রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা যায়, খুচরায় কেজিপ্রতি নাজিরশাইল চালের দাম নতুন করে ২-৩ টাকা বেড়ে ৬৪-৬৮ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, মিনিকেট ২-৪ টাকা বেড়ে ৫৮-৬২, মোটা চাল ২-৩ টাকা বেড়ে ৩৫-৩৮, পেঁয়াজ ১৪০-১৫০, খোলা সয়াবিন তেল ৯৫-৯৮, বোতলজাত সয়াবিন তেল বেড়ে ১১০-১১৫, ৫ লিটারের সয়াবিন তেলের বোতল ৪৮০-৫২০, রসুন ১০ টাকা বেড়ে ১৬০-২২০, মসুর ডাল ১৩০-১৩৫ ও চিনির দাম বেড়ে ৬৮-৭২ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বিক্রেতাদের একই অজুহাত, সরবরাহ কম থাকায় এবং বিপণন প্রতিষ্ঠানগুলো পাইকারিতে দাম বাড়ানোয় এসবের দাম বেড়েছে।

চালের দাম বাড়ার কারণ জানতে চাইলে রশিদ অটো রাইস মিলের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) আবুল খায়ের ভূঁইয়া হারুন বলেন, বাজারে চালের দাম বাড়লে সব দোষ আমাদের কাঁধে আসে। অথচ ধানের দাম যে নিয়মিত একটি চক্র বাড়িয়ে চলছে তার খবর কেউ রাখে না। ধানের দাম বাড়ানোয় আমরা চালের দাম সামান্য বাড়িয়েছি। এখন খুচরা বাজারে এটা ২-৩ টাকা বাড়ানো হলে তার দায় কি আমাদের? ধানের দাম কেন বাড়ল তা সরকার ও সাংবাদিকদের খতিয়ে দেখা উচিত।

রাজধানীর ভোজ্য তেলের সবচেয়ে বড় পাইকারি আড়ত মৌলভীবাজারের বণিক সমিতির সভাপতি গোলাম মাওলা বলেন, ‘আমরা পাইকারিতে ভোজ্য তেলের দাম কমিয়েছি। কিন্তু খুচরায় বেড়েছে। এটা মূলত বোতলজাত কোম্পানিগুলোর কারণে হচ্ছে বলে আমার ধারণা।’

বোতলজাত ভোজ্য তেল ও চিনি বিপণনকারী একটি কোম্পানির চেয়ারম্যান নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, চিনি ও ভোজ্য তেলের ভ্যাট-ট্যাক্স কমানোর বিষয়ে সরকার গত তিন সপ্তাহ ধরে শুধু আশ্বাস দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এর বাস্তবায়ন দেখছি না। আমরা তো আর লোকসান দিতে বসিনি। প্রতি কেজি চিনি ও ভোজ্য তেলে খরচ বেড়েছে ২৩-২৪ টাকা। এ টাকা আসবে কোথা থেকে? এজন্য দাম বাড়ানো হচ্ছে। সরকার দ্রুত সিদ্ধান্ত না নিলে দাম আরও বাড়বে।

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বাবলু কুমার সাহা বলেন, ‘ভোজ্য তেল, চালসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম যেভাবে বাড়ছে সেটা চিন্তার বিষয়। আমরা চিন্তা করছি এসব পণ্যের মূল্য যাচাই করতে ফের অভিযানে নামব। বিক্রেতারা কত টাকায় পণ্য কিনে কত টাকা দরে বাজারে বিক্রি করছে সেটা যাচাই করব।’ তবে এক সপ্তাহ আগে দেওয়া তার এই বক্তব্যের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।

কয়েক দিন আগে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়া নিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি দেশ রূপান্তরকে বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্য তেল ও চিনির দাম বেড়েছে। এজন্য অভ্যন্তরীণ বাজারে দাম কিছুটা বাড়বে, এটা স্বাভাবিক। কিন্তু কোনোভাবেই সয়াবিন তেলের দাম লিটারপ্রতি ১১০ টাকার বেশি হওয়ার কথা নয়। আমরা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করে এবং বিশ্ববাজার যাচাই করে পণ্য দুটির ওপর আরোপিত ভ্যাট-ট্যাক্স প্রত্যাহারে অর্থ মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছি। আশা করছি, শিগগিরই এসবের দাম কমবে। আর চালের বিষয়টা আমার মন্ত্রণালয়ের অধীনে না হলেও যতটুকু জানি, দেশে চালের বাম্পার ফলন হয়েছে। তাই চালের দাম বাড়ারও কোনো যৌক্তিকতা নেই।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত