স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষার ফলাফলের আগে খুবই উৎকণ্ঠিত থাকতাম আমরা ছাত্রজীবনে। পাশ করব কি না, করলে মোট কত নম্বর পাবÑ এসব নিয়ে রেজাল্টের আগে থাকত দুশ্চিন্তা আর রেজাল্টের পরে চলত পর্যালোচনাÑ কোন সাবজেক্টে কত পেয়েছি, বন্ধুদের কে কত পেল, রোল নম্বর একটু এগোল না পেছাল, নাকি আগের মতোই থাকল এসব আরকি। আমাদের বয়সীর প্রায় সবারই এ অভিজ্ঞতা আছে। সে সময় একটা কৌতুক আমাদের মুখে মুখে চালু ছিল। এক রাগী বাবা বাসার বারান্দায় বসে আছেন, ছেলে স্কুল থেকে কী রেজাল্ট নিয়ে আসে তার অপেক্ষায়। ছেলে এলো। মলিন মুখ আর মাথায় এলোমেলো চুল নিয়ে। বোঝাই যাচ্ছে যে বাবার সামনে আসতে তাকে অনেক সাহস সঞ্চয় আর নিজের কৃতকর্মের জন্য অনুশোচনা করতে হয়েছে। রাশভারী কণ্ঠে বাবা জিজ্ঞেস করলেন, ‘কি রে, রেজাল্ট নাকি দিয়েছে, তা তোর রেজাল্ট কী?’ বাবার প্রশ্নের সামনে ছেলে নিরুত্তর, মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। বাবা রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে বললেন, ‘কথা বলিস না ক্যান? কী রেজাল্ট করেছিস তুই?’ ছেলের মুখে কোনো উত্তর নেই। ছেলে কিছু বলছে না দেখে বাবা এবার একটা একটা করে প্রশ্ন করতে লাগলেন। প্রথম প্রশ্ন, ‘পাস করেছিস?’ ছেলের উত্তর, ‘না।’ বাবার রাগ বাড়তে লাগল, তার পরও তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘তাহলে ফেল করেছিস, তাই না?’ ছেলে উত্তর দিল, ‘না।’ বাবা এবার অবাক! একটু কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তাহলে তোর রেজাল্ট কী বাবা?’ প্রচণ্ড ধমকের পর বাবার এই স্নেহপূর্ণ কণ্ঠ শুনে ছেলে হাপুস নয়নে কাঁদতে কাঁদতে বলল, ‘ফেলই জোটে না তার আবার পাস! নম্বর কম পেয়েছি বলে এক ক্লাস নিচে নামিয়ে দিয়েছে।’ এই কল্পিত ঘটনার সঙ্গে বাস্তবের সিটি করপোরেশন নির্বাচনের কোনো সম্পর্ক নেই। কিন্তু কেউ কেউ কিছুটা মিল খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করতে পারেন। তবে নম্বর কম পেলে এক ক্লাস নিচে নামানোর মতো ভোটার কম বলে ভোট বাতিল করার রেওয়াজ আমাদের দেশে নেই।
সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দুই মেয়র প্রার্থীর জয় তো দেখলাম। প্রচুর আলোচনা ও বিশ্লেষণ হচ্ছে ক্ষমতাসীন দলের মেয়র প্রার্থীর বিজয়, নির্বাচনে ভোটারদের অংশগ্রহণ, নির্বাচনী ব্যবস্থা ও সাধারণ ভোটারদের নির্বাচন-বিমুখতা নিয়ে। এ আলোচনা চলবে আরও বহু দিন, সম্ভবত এর চেয়েও খারাপ নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত। তবে এই নির্বাচন এমন এক অমোচনীয় কালির দাগ রেখে গেল যে, একের পর এক ইস্যু এসে আলোচনাকে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে কিন্তু ভুলিয়ে দিতে পারবে না। ঢাকার মতো একটি রাজনৈতিক শহরে, নির্বাচনকে উৎসব বলে ভাবানো হয় যে দেশে, সেখানে টেনে-টুনে ৩০ শতাংশ মানুষ ভোটকেন্দ্রে গেল না কেন, এই প্রশ্ন যারা রাজনীতি নিয়ে ভাবেন, তাদের বহু দিন তাড়িয়ে বেড়াবে। অতল সমুদ্র কথাটা আমরা ব্যবহার করি বিভিন্নভাবে, তবে বেদনার অতল সমুদ্র কথাটার মধ্যে হাহাকার যেভাবে ফুটে ওঠে, তা অন্য কোনোভাবে বেদনার গভীরতা এবং তীব্রতাকে বোঝানো যায় বলে মনে হয় না। এ এক সমুদ্র, যার যত গভীরেই যাই না কেন, তলা স্পর্শ করতে পারি না। আমরা সাধারণত বলিÑ সবকিছুরই সীমা আছে, কিন্তু নির্বাচনের নামে যা হচ্ছে তার কি কোনো সীমা নেই? শুধু নামছে আর নামছে, ক্রমাগত নেমেই যাচ্ছে নিচে। বিগত দিনগুলোই ভালো ছিল ধারণাটা এখন আরও পোক্ত হচ্ছে। আগেরটার চেয়ে পরেরটা কত খারাপ করা যায়, তার কৌশল উদ্ভাবনের চেষ্টা চলছে অবিরাম। গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি তো পরের কথা, অন্তত নির্বাচনী সংস্কৃতি কি রক্ষা করা হবে না, এ রকম অসহায় প্রশ্ন তুলে ধরেন অনেক মানুষ। অধঃপতনের পথে অন্তহীন যাত্রা কি আমাদের জন্য নির্ধারিত?
নির্বাচনের পর বিজয়ী প্রার্থীর বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস দেখতে আমরা অভ্যস্ত। বিজয় মিছিল করতে গিয়ে প্রাণ হারানোর ঘটনাও ঘটেছে অনেক, এমনকি ঢাকাতেও সে নজির আছে। অবশ্য সব অভ্যাস যে সব সময় চালু থাকবে তা তো নয়। এ না হলে নতুন অভ্যাস গড়ে উঠবে কীভাবে? এবারের বিজয়ের পর উল্লাস, উচ্ছ্বাস বা আনন্দ খুবই পরিমিত। কারণ যা ধারণা করা হয়েছিল, তারই প্রতিফলন ঘটলে আকস্মিক পাওয়ার আনন্দ থাকে না, যা জানা ছিল তাকে নতুন করে জানার কোনো আগ্রহ কি কারও থাকে? ফলাফল যে এ রকম হবে তা তো আমরা জানতাম! কেউ আবার বাঁকা চোখে তাকিয়ে বলছেন, আরে ভাই, রাখেন তো আনন্দ-উচ্ছ্বাস! দেশ চলছে রিমোট কন্ট্রোলে। বাটন টিপে অন অফ করার মতো। তাই কখন আনন্দ করব তার দিনক্ষণ ঠিক করা বা কতটুকু আনন্দ করা হবে, তার মাত্রা ঠিক করা সবই তো হবে রিমোটে। যদি বলা হয়, আনন্দ কর তাহলে আনন্দ হবে বাঁধভাঙা জোয়ারের মতো আর তা না হলে তাকিয়ে থাক মাজাভাঙা রোগীর মতো।
মানুষ নাকি তার অসহায়ত্ব থেকেই ঠাট্টা ও ব্যঙ্গ করা শুরু করেছিল। প্রতিপক্ষের অত্যাচারের সামনে অসহায় মানুষ নিজের অসহায়ত্ব নিয়েও ব্যঙ্গ করে নিজের মনকে হালকা করে থাকে। এটা এক ধরনের থেরাপির মতো কাজ করে। তেমনি ঢাকার মানুষ বলাবলি করেছে, ইতিহাসের প্রথম ব্যক্তি যিনি মশার কাছে পরাস্ত হয়েছিলেন, তার নাম নমরুদ। আর মশার কারণে নমিনেশনবঞ্চিত হলেন ঢাকার সাবেক মেয়র। ডেঙ্গুর আতঙ্ক এবং সিটি করপোরেশনের বাগাড়ম্বর দুটোকেই মানুষ নির্বাচনকালীন ঠাট্টা-মশকারায় পরিণত করেছে। তেমনি গণতন্ত্র ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার দৃঢ় অঙ্গীকার যখন উচ্চস্বরে ঘোষণা করা হয়, তখন মানুষ বলে, এ দেখি সে ধরনের কাজ কারবার! গাছ কেটে কাগজ বানিয়ে সেই কাগজে বড় বড় করে লেখা গাছ কাটবেন না। প্রকৃতি বাঁচাতে একদিকে গাছ লাগানোর আহ্বান আর অন্যদিকে সব ধরনের প্রকৃতিবিনাশী কাজ করা যেমন ক্ষোভের জন্ম দেয়, তেমনি শাসকদের ব্যঙ্গ করার পরিবেশ তৈরি করে। নির্বাচনী ব্যবস্থা ও নির্বাচনী সংস্কৃতিকে অধঃপতিত করার যে কর্মকাণ্ড চলছে, তাতে গণতন্ত্র ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা কীভাবে সম্ভব?
পুঁজিবাদের সবচেয়ে বড় শক্তি সে মানুষকে বিচ্ছিন্ন এবং সুযোগসন্ধানী করে তোলে। মুনাফার কাছে মার খেতে থাকে মনুষ্যত্ব। টাকা থাকলে সব পাওয়া যায়, এই ধারণা সমাজের সকল স্তরে ছড়িয়ে দেয়। টাকা যার আছে সে ভালো খাবে, ভালো পরবে, ভালো চিকিৎসা পাবে, এগুলো যেমন সমাজে দেখে মানুষ, তেমনি এটাও দেখে নির্বাচনী ব্যবস্থাটাও কীভাবে টাকার কাছে বাঁধা পড়ে আছে। নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়ন থেকে শুরু করে সব কাজের সঙ্গে টাকার সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য হয়ে পড়ছে। যাচাই-বাছাই করার পরিবেশ এবং মানসিকতা ধ্বংস করার আয়োজন চারদিকেই। নির্বাচনী ব্যবস্থা যেন প-এর প্যাঁচে আটকা পড়েছে। প-তে প্রার্থী, প্রতীক, পুলিশ, প্রশাসন এবং পয়সা এই চক্করে ঘুরছে নির্বাচনের প্রক্রিয়া।
শোনা গেল ঢাকা সিটির মেয়রদের শপথ গ্রহণ মে মাস পর্যন্ত বিলম্বিত হবে। কারণ নির্বাচিত মেয়র ও কাউন্সিলরদের মেয়াদ পাঁচ বছর। সে হিসেবে আগের মেয়র এবং কাউন্সিলরদের মেয়াদ মে মাস পর্যন্ত। নির্বাচন কমিশন কি এটা জানতেন না? এটা বিবেচনায় নিলে সরস্বতী পূজার দিনে নির্বাচন করার আয়োজন কিংবা বইমেলা ও এসএসসি পরীক্ষা পিছিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন কি হতো? নির্বাচন কমিশন যা করছে সঠিকভাবেই করেছে, এই আত্মতুষ্টির মনোভাব বড় পীড়িত করে মানুষকে। ফলে ভবিষ্যতে শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হলেও তা অবাধ, সুষ্ঠু হবে কি না সে সংশয় থেকেই যাচ্ছে। ভুলটা কোথায় হলো এবং কী কী ভুল হলো নির্ধারণ না করলে সংশোধন করার উপায় কি থাকে!
মানুষ যেমন চায়, তেমন করে তার চারপাশটাকে সাজিয়ে তুলতে চেষ্টা করে। কাজেই যে মানুষ পরিবেশকে অসহনীয় ভাবছেন, তাদের দায়িত্ব সমাজকে গণতান্ত্রিক করার চেষ্টা করা। কারণ কোনো অন্যায় বেশিদিন চললেই তা যুক্তিসংগত হয়ে যায় না। অন্যায় সহ্য করতে থাকলে মানুষ শুধু অপমানিতই হয় না, অপমানিত ব্যক্তির মধ্যেও অন্যায় করার প্রবণতা বাড়তে থাকে। এর প্রভাব যুবসমাজের মধ্যে ভয়ংকর রূপে দেখা দেয়। এর কিছু নিদর্শন আমাদের দেশে এখন দৃশ্যমান হচ্ছে। সমাজের কথা ভাবলে কারও পক্ষে কি এ সময়ে নিরপেক্ষ দর্শক হওয়া সম্ভব?
লেখক
রাজনৈতিক সংগঠক ও কলামনিস্ট
