কর্মচারী নেতা দেলোয়ারের কব্জায় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ

আপডেট : ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০১:৫১ এএম

জাতীয় গৃহায়ন কর্র্তৃপক্ষের (জাগৃক) উচ্চমান সহকারী দেলোয়ার হোসেন। পদে ছোট হলেও জাগৃকের প্রধান কার্যালয়ে সংস্থাটির চেয়ারম্যানের মতো ক্ষমতাবান হিসেবে পরিচিত তিনি। অভিযোগ আছে, গৃহায়ন ভবনে বিশাল আকারের রুমে বসে রাজধানীসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ এলাকার প্লট ও ফ্ল্যাটের সব কাজ করেন দেলোয়ার। নিজে উচ্চমান সহকারী হলেও নিজের কাজ দাপ্তরিক কাজ করতে তার রয়েছে একাধিক লোক। নিজ নামের পাশাপাশি স্ত্রী, মা ও শ্যালকের নামে সংস্থাটি থেকে হাতিয়ে নিয়েছেন কমপক্ষে ১০টি প্লট ও ফ্ল্যাট। মোহাম্মদপর-ধানম-ি এলাকার দাপ্তরিক দায়িত্ব এছাড়া নিজের কব্জায় নিয়ে জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে হাতিয়েছেন একাধিক প্লট। এভাবে নানা অনিয়মের

মাধ্যমে ‘রাতারাতি’ হয়ে উঠেছেন শত শত কোটি টাকার মালিক। ২০১৭ সালের শেষ দিকে নিজের অবস্থান পাকাপোক্ত করতে জাগৃকের কর্মচারী ইউনিয়নের (সিবিএ) সাধারণ সম্পাদকের পদটিও দখলে নেন তিনি। তবে দেলোয়ার বলছেন, জাগৃকের কিছু কর্মচারী সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে তার বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দিচ্ছে; যেগুলোর অধিকাংশই মিথ্যা।

সংস্থাটির কর্মচারীরা দেশ রূপান্তরকে জানান, জাগৃকের সাবেক চেয়ারম্যান খন্দকার আখতারুজ্জামান ও বিদায়ী চেয়ারম্যান মো. রাশিদুল ইসলামকে ব্যবহার করে বিধিবহির্ভূতভাবে ক্যাশিয়ার থেকে ‘পদ বদলে’ হয়েছেন উচ্চমান সহকারী। জাগৃকের পাম্প অপারেটর আব্দুল ওহিদের ছেলে দেলোয়ার এখন সংস্থাটির অঘোষিত ‘সম্রাট’। পুনর্বাসন প্লট, পদোন্নতি, বদলি, নামজারি, বিক্রয় অনুমতি- সবই এখন দেলোয়ার সিন্ডিকেটের হাতে। দেলোয়ার সিবিএর সাধারণ সম্পাদকের পদ পাওয়ার পরই হয়ে ওঠেন বেশি বেপরোয়া। এসএসসি পরীক্ষার ভুয়া সনদ দিয়ে চাকরি নেওয়াসহ বিস্তর অভিযোগ থাকা ‘প্রভাবশালী’ এ কর্মচারীর অবৈধ সম্পদ অনুসন্ধানে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রীর দপ্তরে জমা লিখিত অভিযোগও খতিয়ে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

দুই উপ-পরিচালকের এক দেলোয়ার : জাগৃকের গুরুত্বপূর্ণ এলাকা মিরপুর, রূপনগর, পল্লবী, কাফরুল ও ভাষানটেক নিয়ে কাজ করেন সংস্থার উপ-পরিচালক (১) মো. শহীদ চৌধুরী। আর মোহাম্মদপুর, ধানম-িসহ দেশের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ জেলা নিয়ে কাজ করেন উপ-পরিচালক (২) তাজিম উর রহমান। এই দুই কর্মকর্তার এখতিয়ারে থাকা সব জমি-জমার ‘ডিলিং অ্যাসিস্ট্যান্ট’ হিসেবে কাজ করেন দেলোয়ার। এসব এলাকার নামজারি, হস্তান্তর, আম-মোক্তার নিয়োগ, বিক্রয় অনুমতি ও বন্ধক অনুমতি নিতে সরকারের এ সংস্থার দারস্থ হতে হয়। এসব কাজের জন্য গুনতে হয় স্থানভেদে ৫০ হাজার থেকে ১০ লাখ টাকা। আর এসব কিছু একচ্ছত্রভাবে নিয়ন্ত্রণ করছেন দেলোয়ার। যদিও দেলোয়ার নিজে কোনো কাজই করেন না। তার কাজ করার জন্য দুই-তিনজন ব্যক্তিগত সহকারী রেখেছেন।

গৃহিণী স্ত্রী প্লট নিয়েছেন ‘শিল্পী-সাহিত্যিক’ ক্যাটেগরিতে : জাগৃকের খুলনা বয়রা এস্টেটের আবাসিক প্লট প্রকল্প থেকে এ ব্লকের ৩ কাঠা আয়তনের একটি প্লট (নং-৪৫) দেলোয়ারের স্ত্রী নুসরাত জাহান পপির নামে বরাদ্দ নেওয়া। প্লট বরাদ্দ পাওয়ার পর ২০১৪ সালের ১৩ নভেম্বর জাগৃকের অনুকূলে একসঙ্গে চার কিস্তির ১৯ লাখ ৯৮ হাজার ৭৫০ টাকা পরিশোধ করা হয়। জাগৃকের নথি ঘেঁটে দেখা যায়, দেলোয়ারের স্ত্রী গৃহিণী হলেও প্লট নিয়েছেন ‘শিল্পী-সাহিত্যিক’ ক্যাটেগরিতে। ভুয়া কাগজপত্র বানিয়ে অর্ধকোটি টাকা মূল্যের এ প্লটটি হাতিয়ে নেন তারা।

গৃহিলী স্ত্রীর কত সম্পদ : নুসরাত জাহান পপির সঙ্গে ৮-৯ বছর আগে বিয়ে হয় দেলোয়ারের। নুসরাতের নামে তখন তেমন কোনো সম্পদ ছিল না। কয়েক বছরের ব্যবধানে তার নামে ঢাকায় একাধিক বাড়ি, প্লট ও ঢাকার বাইরে জাগৃকের প্লট বরাদ্দ নিয়েছেন দেলোয়ার। সরকারিভাবে নেওয়া এসব প্লটের বিপরীতে কয়েক কোটি টাকা কিস্তিও পরিশোধ করা হয়েছে। কুষ্টিয়া, খুলনা এবং ঢাকার মোহাম্মদপুর ও লালমাটিয়া এলাকায় রয়েছে এসব প্লট-ফ্ল্যাট। এছাড়া দেলোয়ার তার শ্বশুর মুহাম্মদ শাহজাহানকে দিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদরে ‘বিপুল পরিমাণ সম্পদ’ কিনেছেন বলেও জানান জাগৃকের কর্মচারীরা।

নিজ নামে একাধিক প্লট/ফ্ল্যাট : মায়ের নামে জাগৃকের টাঙ্গাইলের একটি আবাসিক প্রকল্প থেকে একটি প্লট নিয়েছেন দেলোয়ার। এছাড়া কুষ্টিয়া হাউজিং এস্টেট থেকে নিজ নামে সাড়ে তিন কাঠার প্লট, ৪/৫ লালমাটিয়ায় ফ্ল্যাট, মোহাম্মদপুরে বিটিআই ডেভেলপম্যান্ট কোম্পানির এ ব্লকের ৭/১ প্লটের ভবনে একটি ফ্ল্যাট, মোহাম্মদপুরের জাকির হোসেন রোডের ১/১৫ ব্লক-ই ফ্ল্যাট, প্লট এফ-৪ একটি ফ্ল্যাট কিনেছেন তিনি।

জাল সনদে চাকরি : গৃহায়নের সিবিএ নেতা দেলোয়ারের বিরুদ্ধে জাল সনদে চাকরি নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। জাগৃকে দাখিল করা দেলোয়ারের দেওয়া কাগজপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, তার দুই সনদে বাবার নাম ভিন্ন। তার দেওয়া কাগজপত্রে বলা হয়েছে, কুমিল্লার কোম্পানীগঞ্জ বদিউল আলম উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে এসএসসি পাস করেন তিনি। সেখানে তার বাবা হিসেবে মো. আব্দুল ওহিদ উল্লেখ করা। আর এইচএসসির সনদে তার বাবার নাম শিশু মিয়া। জাগৃকের তদন্তে দুই সনদে বাবার নামের ভিন্নতা থাকার বিষয়ে সত্যতা পাওয়া গেলেও দেলোয়ারের কিছুই হয়নি।

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে জাগৃকের সিবিএ সাধারণ সম্পাদক ও উচ্চমান সহাকারী দেলোয়ার হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে জাগৃকের কিছু কর্মচারী সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দিচ্ছেন। এসব অভিযোগের বেশির ভাগই মিথ্যা। এ বিষয়ে তদন্ত করেও কোনো সংস্থা আমার অবৈধ সম্পদ পাবে না। আমর আয়কর নথিতে যা আছে সবই বৈধ সম্পদ।’ তবে আয়কর নথিতে কী পরিমাণ সম্পদ রয়েছে সে বিষয়ে তিনি কিছু বলতে চাননি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত