স্ত্রী ও সন্তানদের হত্যা করে নিরুদ্দেশ রাকিব

আপডেট : ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০২:২১ এএম

‘আজ ১২ তারিখ। সবাইকে মুক্তি দিয়ে গেলাম। ভবিষ্যতে আমার স্ত্রী ও  দুই সন্তান যেন কারও কাছে হেয় না হয়। আমাকে পাওয়া যাবে রেললাইনে।’ এ কথা ডায়েরিতে লেখা। স্বজনরা বলছেন, এই লেখা রাকিবের। তার বাসা থেকে স্ত্রী ও দুই শিশুসন্তানের লাশ উদ্ধার হয়েছে। পুলিশ ও স্বজনরা বলছেন, অনলাইনে ব্যবসা করতে গিয়ে কোটি টাকা ঋণগ্রস্ত হয়ে ‘মুক্তির পথ হিসেবে’ এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে নিরুদ্দেশ হয়েছেন রাকিব।

গতকাল রবিবার নিহতের একাধিক স্বজন ও তদন্ত সংশ্লিষ্ট র‌্যাব ও পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে এসব তথ্য জানিয়েছেন। তাদের আশঙ্কা, রাকিব নিজেও আত্মহত্যা করতে পারেন। কারণ ডায়েরির ওই বার্তায় তেমন ইঙ্গিত দেওয়া। তার এমন বার্তা পেয়ে রেল বিভাগ ও রেলওয়ে পুলিশ সতর্ক রয়েছে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় রেলে কাটা পড়া মানুষের চেহারার সঙ্গে রাকিবের ছবি মিলিয়ে দেখছে তারা।

পুলিশের উত্তরা বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা জানান, জীবিত রাকিবকে গ্রেপ্তার চেষ্টার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন এলাকার রেলওয়ে পুলিশকে তার মরদেহ শনাক্তের নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। সেভাবে তদন্ত ও অনুসন্ধান চলছে।

রেলওয়ে পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, দক্ষিণখানে যে বাসায় তিন হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, সেখান থেকে উদ্ধার হওয়া ডায়েরির বার্তা সম্পর্কে আমরা অবহিত। সে বিষয়ে সারা দেশের রেলওয়ে পুলিশকে বার্তা পাঠানো হয়েছে। তিনি বলেন, সারা দেশে তিন হাজার কিলোমিটারের বেশি রেলপথ রয়েছে। তাই কেউ যদি রেললাইনে ঘোষণা দিয়ে আত্মহত্যা করতে চান, সেটি তো আমরা ঠেকাতে পারব না। তবে রেলপথের কোথাও অজ্ঞাত লাশ পাওয়া গেলে তা ঊর্ধ্বতন কর্র্তৃপক্ষকে অবহিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

কমলাপুর রেলওয়ে থানা পুলিশের ওসি রকিবুল হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কর্র্তৃপক্ষের মাধ্যমে আমরা নির্দেশনা পেয়েছি। সেইভাবে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি রেলে কাটা লোকজনের সঙ্গে রাকিবের ছবি মিলিয়ে দেখেছি। এখন পর্যন্ত তার কোনো হদিস পাইনি।’

গত শুক্রবার রাতে রাজধানীর দক্ষিণখানের প্রেমবাগানে ৮৩৮ নম্বর ভবনের চতুর্থ তলার ফ্ল্যাট থেকে গৃহবধূ মুন্নি রহমান  (৩৭) ও তার দুই শিশু সন্তান ফারহান উদ্দিন বিপ্লব (১২) ও লাইবার (৩) মরদেহ উদ্ধার করে দক্ষিণখান থানা পুলিশ। গত শনিবার মরদেহগুলোর ময়নাতদন্ত শেষে রাতে রাজধানীর বনানী কবরস্থানে দাফন করা হয়। পরে ওই রাতেই নিহত মুন্নি রহমানের বড় ভাই মুন্না রহমান দক্ষিণখান থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় একমাত্র আসামি করা হয়েছে নিখোঁজ রাকিব উদ্দিন আহম্মেদকে। জানা গেছে, রাকিবের স্থায়ী বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সদর থানার ভাতশালী গ্রামে।  

পুলিশের উত্তরা বিভাগের উপ-কমিশনার নাবিদ কামাল শৈবাল বলেন, প্রাথমিক তথ্য-উপাত্ত ও তদন্তের মাধ্যমে জানতে পেরেছি- এই তিন হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে রাকিব জড়িত। তাকে খোঁজা হচ্ছে। 

মামলার এজাহারে মুন্না রহমান উল্লেখ করেছেন, ১৩ বছর আগে আমার ছোট বোন মুন্নি রহমানের (৩৭) সঙ্গে রাকিব উদ্দিন আহম্মেদের (৪৬) বিয়ে হয়। তাদের ফারহান উদ্দিন বিপ্লব (১২) ও লাইবা (৩) নামে দুই সন্তান রয়েছে। রাকিব বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশনস কোম্পানি লিমিটেডের (বিটিসিএল) উত্তরার কার্যালয়ে কনিষ্ঠ সহকারী ব্যবস্থাপক হিসেবে কর্মরত। ২০১১ সাল থেকে আমার বোন তার পরিবার নিয়ে দক্ষিণখানের ৮৩৮ নম্বর বাসায় থাকতেন। এর মধ্যে গত ১৯ ডিসেম্বর দুপুরের দিকে আমার ছোট বোন মুন্নি রহমান আমার মোবাইলে ফোন করে জানায়, আগের রাত সাড়ে ১২টার দিকে স্বামী ও দুই সন্তানসহ ঘুমিয়ে পড়ার পর সকালে উঠে দেখেন তার স্বামী রাকিব বাসায় নেই। অনেক খোঁজাখুঁজি করেও তার সন্ধান না পেয়ে রাকিবের ভাই সোহেল আহম্মেদ গত ২০ ডিসেম্বর দক্ষিণখান থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি নম্বর:১১৮৭) করেন। ওই জিডি করার পর জানতে পারি, রাকিব কুমিল্লা বুড়িচং থানা পুলিশের হেফাজতে রয়েছেন। কুমিল্লার সীমান্তবর্তী এলাকায় সন্দেহজনকভাবে ঘুরাঘুরির কারণে পুলিশ তাকে আটক করে। ওইসময় তাকে বেশ অসুস্থ ও উ™£ান্ত মনে হয়েছে। পরে ঢাকায় এনে তাকে চিকিৎসা দেওয়া হয়। সুস্থ হওয়ার পর নিখোঁজ হওয়ার কারণ জানতে চাইলে রাকিব জানায়, সে প্রায় এক কোটি টাকার ঋণগ্রস্ত। পাওনাদাররা টাকার জন্য খোঁজাখুঁজি করছিল।

তবে এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাকিবের অন্য এক স্বজন বলেন, তাদের ধারণা পাওনাদারদের হাত থেকে বাঁচার জন্য তিনি সীমান্ত এলাকা দিয়ে পালানোর পথ খুঁজছিলেন। কিন্তু পুলিশের হাতে আটক হওয়ায় পালাতে পারেননি।

মুন্না রহমান এজাহারে আরও উল্লেখ করেন, গত ১৩ ফেব্রুয়ারি বেলা ১১টার দিকে আমার মেজ বোন পারভীন আক্তার ফোনে জানান, মুন্নির দুটি মোবাইল নম্বরের মধ্যে একটি বন্ধ, অন্যটিতে কল হলেও কেউ রিসিভ করছে না। এছাড়া রাকিবের নম্বর বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। এ অবস্থায় দক্ষিণখানে বসবাসকারী আমাদের সোনিয়া নামে অন্য স্বজনকে ওইদিন রাত ৮টার দিকে ওই বাসায় পাঠানো হয়। সোনিয়া মুন্নির বাসার সামনে গিয়ে দেখেন, বাইরে থেকে দরজায় তালা লাগানো। এতে আমার সন্দেহ হলে মুন্নির বাসার মালিক মনোয়ার হোসেনের নম্বরে ফোন করে তার বাসায় থাকা সিসিটিভি ক্যামেরা চেক করার অনুরোধ করি। তিনি চেক করতে পারেন না বলে জানালে আমি, আমার বড় বোন পারভীন আক্তার ও তার স্বামী সোহেল আহম্মেদকে (রাকিবের বড় ভাই) নিয়ে মুন্নির বাসায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। কিন্তু ব্যক্তিগত প্রয়োজনে বাইরে থাকায় আমি যেতে পারিনি। পরেরদিন ১৪ ফেব্রুয়ারি আমার বড় বোন জামাই সোহেল আহম্মেদ ও আমার খালাত ভাই সজিবকে মুন্নির বাসায় পাঠাই। ওইদিন বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে আমার খালাত ভাই সজিব আমাকে ফোন করে জানায়, সব শেষ। কী হয়েছে জিজ্ঞাসা করলে সে একই কথা বলতে থাকে। এরপর সোহেল আহম্মেদকে ফোন করলে তিনি জানান, বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটেছে, তুমি তাড়াতাড়ি আস। পরে আমি ঘটনাস্থলে উপস্থিত হলে পুলিশসহ মানুষের ভিড় দেখতে পাই। সেখানে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পচা দুর্গন্ধ পাই। সেখানে উপস্থিত পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা মুন্নি, ফারহান ও লাইবার লাশ উদ্ধার করে। মুন্নির মাথার ওপরে হাতুড়ির আঘাতের চিহ্ন, লাইবার গলায় আঙুলের চিহ্ন, ভাগিনা ফারহান উদ্দিন বিপ্লবের গলায় জুতার ফিতা পেঁচানো অবস্থায় দেখতে পাই। তিনি আরও উল্লেখ করেছেন, গত ১২ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৪   ফেব্রুয়ারি বিকেল ৪টার আগ পর্যন্ত যেকোনো সময় রাকিব আমার বোন মুন্নি, ফারহান ও লাইবাকে হত্যা করে দরজার বাইরে থেকে তালা দিয়ে পালিয়ে যায়।

মামলার এজাহারে নিখোঁজ রাকিবকে একমাত্র আসামি করার কারণ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে মামলার বাদী মুন্না রহমান মোবাইল ফোনে দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমার বোন ও ভাগিনা-ভাগ্নির লাশ উদ্ধারের সময় পুলিশ ও সিআইডির ক্রাইমসিন বাসা থেকে বিভিন্ন আলামত জব্দ করেছে। সেখানে একটি ডায়েরিও পাওয়া গেছে। সেই ডায়েরির মধ্যে লেখা ছিল, ‘আজ ১২ তারিখ। সবাইকে মুক্তি দিয়ে গেলাম। ভবিষ্যতে আমার স্ত্রী ও  দুই সন্তান যেন কারও কাছে হেয় না হয়। আমাকে পাওয়া যাবে রেললাইনে।’ ডায়েরির ওই লেখা রাকিবের তা নিশ্চিত হলেন কীভাবেথ জানতে চাইলে মুন্না বলেন, রাকিবের বড় ভাই সোহেল আহম্মেদ নিশ্চিত করেছেন, ওই লেখা তার ভাই রাকিবের। এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তাই এই তিন খুনের ঘটনায় রাকিবকেই একমাত্র আসামি করে মামলা করেছি।

রাকিবের একাধিক স্বজন ও তদন্ত সংশ্লিষ্ট একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, অনলাইনে মুদ্রা কেনা-বেচাসহ বিভিন্ন গোপন ব্যবসার চক্রে জড়িয়ে পড়েছিলেন রাকিব। ওই ব্যবসায় মোটা অঙ্কের টাকা ধরা খেয়েছিলেন। এতে তিনি ঋণগ্রস্ত হয়ে বনানী ও উত্তরার বিভিন্ন সহকর্মীর কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা ধার নেন। এছাড়া বেশ কয়েকজন ঘনিষ্ঠ স্বজনের কাছ থেকে টাকা ধার নিয়ে আর ফেরত দেননি রাকিব। আরও টাকার প্রয়োজন হলেও তিনি আর কারও কাছ থেকে ধার পাননি। ধীরে ধীরে সবাই তার কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন। এছাড়া বিষয়টি পারিবারিকভাবে প্রকাশ হয়ে পড়লে তিনি মুষড়ে পড়েন। এ বিষয়ে তার সঙ্গে স্ত্রীর মনোমালিন্য ঘটে। এসব কারণেই তিনি একবার দেশ ছেড়ে পালানোর সিদ্ধান্ত নেন। আবার স্বজনদের কাছে হুমকি দিয়ে বলেন, টাকা না পেলে সপরিবারে আত্মহত্যা করবেন। শেষ পর্যন্ত তিনি নিজেই তার দুই শিশু সন্তান ও স্ত্রীকে হত্যা করবেন–এটি স্বজনদের কেউই বিশ্বাস করতে পারছেন না।

মেয়েকে দেখার জন্য ছটফট করতেন রাকিব : একাধিক সহকর্মী জানান, রাকিব তার মেয়েকে খুবই ভালোবাসতেন। মাঝে-মধ্যে বলতেন, মেয়ে আমার জন্য অপেক্ষা করছে, তাড়াতাড়ি বাসায় যেতে হবে। প্রতিবেশীরা জানান, বাসার গলিতে ছেলে ও মেয়েকে নিয়ে হাঁটতে বের হতেন রাকিব। তিনি নিজের বাচ্চাদের মারবেন এটি কেউ ভাবতে পারছেন না। 

সিআইডি যেসব আলামত পরীক্ষা করছে : তদন্ত সংশ্লিষ্ট এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) বেশ কিছু আলামত জব্দ করে সেগুলোর পরীক্ষা করছে। এরমধ্যে রয়েছে ঘটনাস্থল থেকে জব্দ করা ডায়েরি। যেখানে একটি বার্তা পাওয়া গেছে। লেখাটি রাকিবের কি নাথ তা নিশ্চিত হওয়ার জন্য সিআইডির হস্তবিশারদ শাখায় পাঠানো হয়েছে। এছাড়া একটি চশমা, দুটি মোবাইল, জুতার ফিতা, পরিধেয় কিছু পোশাক, রক্তমাখা লেপ, বিছানার চাদর, বালিশ, কাটার মেশিন, হাতুড়ি ও ঘড়ির ফরেনসিক পরীক্ষা করা হচ্ছে। এসব পরীক্ষার ফলাফল ও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের আলোকে খুনির বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে আসা যাবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত