সিপিডির মূল্যায়ন এসডিজিতে পিছিয়ে বাংলাদেশ

আপডেট : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০১:১০ এএম

জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে সঠিক পথে নেই বাংলাদেশ। এমনকি কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিচার-বিশ্লেষণ করার মতো তথ্য-উপাত্ত পর্যন্ত নেই। বৈষম্য দূরীকরণ, শান্তি ও ন্যায়বিচার, জলবায়ু রক্ষায় ভূমিকা ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার মতো বিষয়গুলোতে বাংলাদেশের এখনো কার্যকর অগ্রগতি হয়নি। তবে সবার জন্য শিক্ষা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে প্রাথমিকভাবে সাফল্য এসেছে। এসডিজি অর্জনে সফল হতে হলে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ ও রাষ্ট্রীয়ভাবে জবাবদিহি এবং সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। কয়েকটি ক্ষেত্রে নীতিগত ব্যাপক সংস্কারের উদ্যোগ নিতে হবে। গতকাল ‘চার বছরে বাংলাদেশের এসডিজি বাস্তবায়ন মূল্যায়ন : বেসরকারি খাতের ভূমিকা’ শীর্ষক সংলাপে বক্তারা এসব কথা বলেন।

রাজধানীর লেকশোর হোটেলে সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি), এশিয়া ফাউন্ডেশন, এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্লাটফর্ম, সুইস এজেন্সি ফর ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড কো-অপারেশন (এসডিসি) যৌথভাবে এ সংলাপের আয়োজন করে। এতে জাতীয় সংসদের পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি ও সংসদ সদস্য আবুল কালাম আজাদ, সুইজারল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত ড. রেনে হোলেস্টেইন, জাতিসংঘের আবাসিক প্রতিনিধি মিয়া সেপ্পো, সিপিডির চেয়ারপারসন ড. রেহমান সোবহান, সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান ও নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বক্তব্য দেন। 

সংলাপে এসডিজির ১৭টি লক্ষ্যের মধ্যে ৬টি লক্ষ্যের ২০১৫-২০১৯ সময়কালের বাস্তবায়ন অগ্রগতি তুলে ধরেন ড. ফাহমিদা খাতুন। ওই ছয়টি লক্ষ্য হচ্ছে শিক্ষা, শোভন কাজ, বৈষম্য, জলবায়ু রক্ষা পদক্ষেপ, শান্তি ও ন্যায়বিচার এবং অংশীদারিত্ব। শিক্ষা, অংশীদারিত্ব ও শোভন কাজ এই তিনটি লক্ষ্য বাস্তবায়নে মোটামুটি সঠিক দিকে রয়েছে কিন্তু নীতিগত অনেক সংস্কার প্রয়োজন। বৈষম্য, জলবায়ু রক্ষায় পদক্ষেপ এবং শান্তি ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য অর্জনে ভুলপথে রয়েছে বাংলাদেশ। আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে এই লক্ষ্যগুলো অর্জনে বিদ্যমান নীতিতে ব্যাপক সংস্কার এবং সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের তাৎপর্য ভূমিকা নিশ্চিত করতে হবে।

অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেন, এসডিজি বাস্তবায়ন সরকারের মূল কাজের অংশ হিসেবে নিতে হবে। কিন্তু আজ পর্যন্ত এসডিজি নিয়ে জাতীয় সংসদে আলোচনা পর্যন্ত হয়নি। অথচ জনপ্রতিনিধিরা দেশের তৃণমূল পর্যায়ের মানুষের প্রতিনিধিত্ব করেন। তার মতে, পুরো এসডিজি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণের কথা খুব বেশি আলোচনা হচ্ছে না। পুরোটা যেন সরকারের বাস্তবায়নের বিষয়। তিনি সুশীল সমাজকে এসডিজি বাস্তবায়নে সম্পৃক্ত করার তাগিদ দেন।

মিয়া সেপ্পো বলেন, এসডিজি বাস্তবায়নে উভয়পক্ষীয় সংলাপ চলমান রাখতে হবে। জবাবদিহিমূলক অংশীদারিত্বের বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। প্রাতিষ্ঠানিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক রূপান্তরের মাধ্যমে এসডিজি অর্জন করতে হবে। তার মতে,  বেসরকারি খাত হলো একটি দেশের ডিএনএ।

সুইডেনের রাষ্ট্রদূত ড. রেনে হোলেস্টেইন বলেন, এসডিজি বাস্তবায়নে সামাজিক আন্দোলন গুরুত্বপূর্ণ। এই আন্দোলনের অংশ হিসেবে চিন্তা, কাজ ও উন্নয়ন রূপরেখায় বেসরকারি অংশীদারিত্ব প্রয়োজন। তবে এটি যেন শুধু ফ্যাশনে পরিণত না হয়। কোনোভাবেই নাগরিক সমাজের কথা বলার জায়গাকে সঙ্কুচিত করা যাবে না। তাহলে এসডিজি অর্জন বাধাগ্রস্ত হবে। বাংলাদেশ উন্নয়ন পরিকল্পনার মধ্যে এসডিজি বাস্তবায়নে অন্তর্ভুক্ত করে কাজ করে যাচ্ছে, এটি ভালো দিক।

ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, অনেক লক্ষ্য অর্জনে সঠিক পথে রয়েছে। কিন্তু সেটি আবার গুণগত মানসম্পন্ন হচ্ছে কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। শিক্ষায় অগ্রগতি হচ্ছে। কিন্তু শিক্ষিত বেকারত্ব বাড়ছে। এমন শিক্ষা দেওয়া যাবে না যে শিক্ষাকে বাজার স্বীকৃতি দেয় না। তাই এখনই ভাবতে হবে শুধু সনদ অর্জন নয় এমন শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে যেটি কাজে লাগে। সংখ্যার আধিক্য নিয়ে আত্মতুষ্টিতে ভুগলে চলবে না। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা, বৈষম্য এবং ন্যায়বিচারে আমরা ভালো করছি না।’ তিনি মনে করেন, বৈষম্য থাকলে অন্য লক্ষ্যগুলো অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে।

অনুষ্ঠানে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে  চৌধুরী বলেন, মানসম্পন্ন শিক্ষা ছাড়া কোনো কিছুই অর্জন করা যাবে না। প্রথম শ্রেণি থেকে ইংরেজি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা উচিত। ১২ বছর পড়াশোনা করেও শিক্ষার্থীরা তিন পাতা ইংরেজি লিখতে পারে না।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি আবুল কালাম আজাদ জানান, সরকার এসডিজি বাস্তবায়নে সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গিতে কাজ করে যাচ্ছে। এসডিজি বাস্তবায়নের  বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ বেশি লাগবে।

সংলাপে দুটি প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়। সিপিডির বিশেষ ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান এসডিজি বাস্তবায়নে বেসরকারি খাতের ভূমিকা এবং নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন এসডিজি অগ্রগতি নিয়ে দুটি উপস্থাপনা দেন। অনুষ্ঠানে এ-সংক্রান্ত দুটি বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করা হয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত