অর্থপাচার মামলায় ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের বহিষ্কৃত সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়াসহ ছয় আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দিয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। গতকাল রবিবার নিম্ন আদালতে এই অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়।
সিআইডির মুখপাত্র অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ফারুক হোসেন দেশ রূপান্তরকে জানান, অভিযোগপত্রের আসামিরা হলেন খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া (৪৬), তার ভাই মাসুদ মাহমুদ ভূঁইয়া (৩৯) ও হাসান মাহমুদ ভূঁইয়া (৩৬), খালেদের প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপক হারুন রশিদ (৫৩), শাহাদৎ হোসেন উজ্জ্বল ও মোহাম্মদ উল্লাহ খান। শাহাদাত ও উজ্জ্বলের বয়স উল্লেখ করেনি সিআইডি। অভিযোগপত্রে অর্থপাচারের পাশাপাশি আসামিদের বিরুদ্ধে ক্যাসিনো ও মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি এবং টেন্ডারবাজির প্রমাণ পাওয়া যাওয়ার কথা বলা হয়েছে।
সূত্র জানায়, অর্থপাচার ও ক্যাসিনো কারবার সংক্রান্ত মামলায় সিআইডি তদন্তে এটিই প্রথম চার্জশিট। খালেদ ছাড়াও ক্যাসিনো সম্রাট হিসেবে পরিচিত যুবলীগের অপর বহিষ্কৃত নেতা ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট, ঠিকাদার জিকে শামীম, কাউন্সিলর তারেকুজ্জামান রাজীব, আওয়ামী লীগ নেতা এনামুল হক এনু ও তার ভাই রূপন ভূঁইয়াসহ অর্থপাচারের বেশ কিছু মামলার তদন্তে করছে সিআইডি।
গত বছরের ১৮ সেপ্টেম্বরে ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানে প্রথম গ্রেপ্তার হন খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া। অস্ত্র ও মাদকসহ র্যাব তাকে গ্রেপ্তার করার পর ৫টি মামলা করা হয়।
সিআইডির তদন্ত কর্মকর্তারা জানান, রাজনৈতিক পদবি ব্যবহার করে খালেদ কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা কামান। সেই টাকা বিদেশে পাচারের ক্ষেত্রে খালেদ অভিনব কৌশল বেছে নেন। তিনি সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ড ভ্রমণের সময় বিপুল পরিমাণ ডলার সঙ্গে নিয়ে যান। এসব দেশে ঘন ঘন যাতায়াত করলেও তার পাসপোর্টে বিদেশি মুদ্রার কোনো এনডোর্সমেন্ট ছিল না।
এছাড়া আসামি খালেদের পাসপোর্টে একটি মালয়েশিয়ান ভিসা পাওয়া গেছে। ভিসায় ‘এমওয়াইএস মাই টু হোম’ লেখা আছে যা ‘সেকেন্ড হোম ভিসা’ নামে পরিচিত। এই ভিসা গ্রহণের শর্ত হিসেবে মালয়েশিয়ার আরএইচবি ব্যাংকে ৩ লাখ রিঙ্গিত (১ রিঙ্গিত সমান ২০ টাকা ৫০ পয়সা) এফডিআর করা আছে। খালেদ অবৈধভাবে এই অর্থ মালয়েশিয়ায় পাচার করেছেন। সিঙ্গাপুর সিটির জুরং ইস্ট এলাকায় মেসার্স অর্পণ ট্রেডার্স পিটিই লিমিটেড নামে খালেদের একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আছে। এই কোম্পানির মূলধনও বেআইনিভাবে হুন্ডির মাধ্যমে সিঙ্গাপুরে পাচার করেছেন তিনি। খালেদ ও তার প্রতিষ্ঠানের নামে ব্যাংক হিসাব থাকার প্রমাণ হিসেবে ইউওবির ডেবিট কার্ডও জব্দ করা হয়েছে। এছাড়া তার নামে থাইল্যান্ডের ব্যাংকক ব্যাংকে একটি অ্যাকাউন্টে ২০ লাখ টাকার সমপরিমাণ থাই বাথ জমা থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।
খালেদের সহযোগী মোহাম্মদ উল্লাহ বিদেশি মুদ্রা ক্রয় করেন বলে জানা যায়। তিনি আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারা মোতাবেক স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। তদন্তে আসামি খালেদের বিরুদ্ধে পরস্পর যোগসাজশে অবৈধ মাদক, অস্ত্র, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজিসহ সংঘবদ্ধ অপরাধলব্ধ আয় জ্ঞাতসারে স্থানান্তর, হস্তান্তর ও রূপান্তরের মাধ্যমে দেশি-বিদেশি মুদ্রা অবৈধভাবে বিদেশে পাচার ও পাচারের চেষ্টায় জমা রাখার অপরাধ প্রাথমিকভাবে প্রমাণ হয়েছে।
মোহাম্মদ উল্লাহ ২০১২ সাল থেকে খালেদের মালিকানাধীন ভূঁইয়া অ্যান্ড ভূঁইয়া ডেভেলপার লিমিটেড, মেসার্স অর্পণ প্রোপার্টিজ ও অর্ক বিল্ডার্স নামে তিনটি ফার্মের ব্যবস্থাপক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনি খালেদের ভাই মাসুদ মাহমুদ ভূঁইয়া সঙ্গে গিয়ে বিভিন্ন ব্যাংক যেমন-এনসিসি ব্যাংকের মতিঝিল শাখা এবং ব্র্যাক ব্যাংক মালিবাগ শাখায় খালেদের টাকা জমা দিতেন।
এছাড়া তদন্তে অন্য আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে আসামি খালেদের সব অপরাধ কার্যের প্রত্যক্ষ সহযোগী ছিলেন বলে প্রাথমিকভাবে প্রমাণ হয়েছে।
খালেদের বিরুদ্ধে মতিঝিল থানায় মাদকদ্রব্য আইনে, গুলশান থানায় অর্থপাচার প্রতিরোধ আইন ও অস্ত্র আইনে, দুর্নীতি দমন কমিশনে দুদক আইনে এবং ফরেন এক্সচেঞ্জ রেগুলেশন অ্যাক্টে মামলা রয়েছে।
