ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর লেখকদের বই কম, প্রচার নেই

আপডেট : ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০২:১৫ এএম

ভাষা আন্দোলনের চেতনাকে ধারণ করে আয়োজিত অমর একুশে গ্রন্থমেলায়  দেশের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর লেখকদের অল্পসংখ্যক বই যা আছে, সেটাও নেই প্রচারের আলোয়। তিন দিন খোঁজার পর লিটলম্যাগ চত্বরের এক কোনায় গারো সাহিত্যের কাগজ ‘থকবিরিম’-এর স্টল খুঁজে পেলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আনিসা মাহমুদ। দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, ‘গবেষণার কাজের জন্য ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাহিত্যের বই খুঁজছি। কিন্তু এত বড় বইমেলায় মাত্র কয়েকটা বই পেয়েছি।’ অমর একুশে গ্রন্থমেলায় গতকাল বৃহস্পতিবার মেলার ২৬তম দিন পর্যন্ত চার হাজার ছাড়িয়েছে নতুন বইয়ের সংখ্যা। সেখানে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাহিত্যিকদের বই ৫০টিও খুঁজে পাওয়া যাবে না। প্রকাশকরা জানিয়েছেন, পা-ুলিপি সংকটের কারণে অনেক সময় ইচ্ছা থাকার পরও বই প্রকাশ সম্ভব হয় না। তবে একুশের চেতনাকে ধারণ করে যে বইমেলা সেখানে বাংলাদেশে বসবাসরত অন্য ভাষার মানুষদের সাহিত্যচর্চাকে উৎসাহ দিতে প্রণোদনা থাকা উচিত বলে মনে করেন  জগন্নাথ বিশ^বিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের শিক্ষক কামালউদ্দিন কবির। দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, ‘মাতৃভাষার মর্যাদার জন্যই তো ’৫২র ভাষা আন্দোলন, একুশে ফেব্রুয়ারি। তাই বাংলাদেশে বসবাসরত যারা মাতৃভাষায় সাহিত্যচর্চা করেন তাদের উৎসাহিত করাটাও অমর একুশে গ্রন্থমেলার কাজ হওয়া উচিত। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাহিত্যিকদের বইয়ের সংখ্যা কম। মেলায় একটা প্যাভিলিয়ন থাকা উচিত যেখানে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাহিত্যিকদের বই পাওয়া যাবে। শুধু ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী নয়, মাতৃভাষায় সাহিত্যচর্চাকে উৎসাহ দেওয়া উচিত।’

মেলায় থকবিরিম-এর স্টলে গিয়ে পাওয়া যায় বেশ কয়েকটি বই। এর কয়েকটির বাংলায় ভাষান্তরও রয়েছে। আবার বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষায় রচিত কবিতা, গল্পের বইও রয়েছে। যার মধ্যে আছে পরাগ রিছিল ও জুয়েল বিন জহিরের ‘সাংসারেক মান্দিরাংনি ওয়ানগালা’, মতেন্দ্র মানখিনের ‘জাতথাংনি জুমাং’, দেবেশ রেমার ‘ভাষার  প্রেত’, পরাগ রিছিলের ‘খাবি’, থিওফিল নকরেকের ‘আমি উদ্বাস্তু হতে চাই না’, সোহেল হাজংয়ের ‘আদিবাসীদের অধিকার ও আত্মপরিচয়’, মিঠুন রাকসামের ‘জাজংনি রাসং জ্যোৎস্নাদেমাক’, দিগন্ত দানিয়েল ঘাগ্রার ‘বিপন্ন সময়গুলো’, সুমন চিসিমের ‘সাংমা অন আ হুইলচেয়ার’, দিশন অন্তু রিছিলের ‘গারো ভাষা সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক সংকট’। এ ছাড়া পেন্ডুলাম প্রকাশনী থেকে মেলায় এসেছে ম্যাগডিলিনা মৃ’র ‘গারো লোক গল্প’। অ্যাডর্ন পাবলিকেশন এনেছে সাজ্জাদুল হক স্বপনের ‘ভারতের মণিপুর রাজ্য থেকে সিলেটে ৪০০ বছরের মণিপুরি মুসলিম’। থকবিরিম-এর বিক্রয়কর্মী গাসুয়া সিমসাং দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাংলা ভাষাভাষী মানুষও আমাদের সাহিত্যের বই কিনতে আসছেন। এটা ভীষণ ভালো লাগছে। বিক্রিও ভালো হচ্ছে।’ স্টলটির সামনে কথা হয় গারো নৃগোষ্ঠীর লেখক ও ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সদস্য চিবল সাংমার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘বাংলা ভাষাভাষী সাহিত্যিকদের পাশাপাশি বইমেলায় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর অনেক সাহিত্যিকের বই প্রকাশ হচ্ছে। মাতৃভাষার সাহিত্যচর্চা আরও গতিশীল হবে বলেই আমার প্রত্যাশা।’

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাহিত্যের পা-ুলিপির সংকটের কথা উল্লেখ করে বাতিঘর-এর প্রকাশক দীপঙ্কর দাশ বলেন, ‘একুশের চেতনাকে ধারণ করে এই বইমেলা। সেখানে বাংলাদেশে বসবাসরত সব ভাষাভাষীর সাহিত্যিকদের বই থাকা উচিত। কিন্তু ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাহিত্যিক কম থাকায় প্রতি বছর পা-ুলিপি পাওয়া যায় না।’ একই রকম মন্তব্য করেন গ্রন্থমেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব ড. জালাল আহমেদ। তিনি বলেন, ‘বাংলা একাডেমি থেকে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাহিত্যিকদের বই প্রকাশ করা হয়। কিন্তু পাণ্ডুলিপি পাওয়াটা অনেক সময় কঠিন হয়। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাহিত্যিকের সংখ্যা তো হাতেগোনা কয়েকজনই।’

গ্রন্থমেলায় হুমায়ুন আজাদকে স্মরণ

হুমায়ুন আজাদের ওপর মৌলবাদী চক্রের সন্ত্রাসী হামলার বার্ষিকীতে একুশে গ্রন্থমেলায় গতকাল বিকেলে তাকে স্মরণ করা হয়। লেখক-পাঠক-প্রকাশকদের যৌথ উদ্যোগে বাংলা একাডেমির বর্ধমান হাউজের তথ্যকেন্দ্রের সামনে আয়োজিত এ সভার শুরুতে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হাবীবুল্লাহ সিরাজী। বক্তব্য রাখেন কবি কাজী রোজী, শিল্পী ফকির আলমগীর, শিশুসাহিত্যিক লুৎফর রহমান রিটন, প্রকাশক মাজহারুল ইসলাম, গবেষক আসাদুজ্জামান আসাদ, পিয়াস মজিদ, জাহিদুল হাসান ও হুমায়ুন আজাদের অনুজ সাজ্জাদ কাদির ও হুমায়ুন আজাদের কন্যা মৌলি আজাদ। সভাপতিত্ব করেন প্রকাশক ওসমান গনি।

মূল মঞ্চ

বৃহস্পতিবার বিকেল ৪টায় অনুষ্ঠিত হয় শামসুজ্জামান খান সম্পাদিত বঙ্গবন্ধু নানা বর্ণে নানা রেখায় শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন আহমাদ মাযহার। আলোচনায় অংশ নেন সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল, এনামুল করিম নির্ঝর ও আমীরুল ইসলাম। বক্তব্য রাখেন গ্রন্থের সম্পাদক শামসুজ্জামান খান। সভাপতিত্ব করেন মাহফুজা খানম। আলোচনার পর কবিকণ্ঠে কবিতা পাঠ করেন রবীন্দ্র গোপ, বদরুল হায়দার, তপন বাগচী ও খালেদ উদ্-দীন। আবৃত্তি পরিবেশন করেন সামিউল ইসলাম পোলক ও সংগীতা চৌধুরী। পুঁথিপাঠ করেন জালাল খান ইউসুফী। এ ছাড়া ‘লেখক বলছি’ মঞ্চে নিজেদের নতুন বই নিয়ে আলোচনা করেন রফিকুর রশীদ, সালমা বাণী, মতিন্দ্র মানখিন ও নওশাদ জামিল।    

নতুন বই

বাংলা একাডেমির জনসংযোগ উপবিভাগের তথ্য অনুযায়ী বৃহস্পতিবার মেলায় নতুন বই এসেছে ১৫৫টি। এর মধ্যে পাঞ্জেরী এনেছে তাপস রায়ের ‘রসিক নজরুল’, বর্ষাদুপুর এনেছে সৈয়দ শামসুল হকের ‘সীমান্তের সিংহাসন’, ভাষাচিত্র এনেছে তুষার আব্দুল্লাহর ‘তারুণ্য টি টুয়েন্টি নয় টেস্ট’, চর্চা গ্রন্থপ্রকাশ এনেছে হেলাল হাফিজের ‘এক জনমের জন্মজখম’, অনিন্দ্য প্রকাশ এনেছে আহমদ রফিকের ‘পাক-ভারত সমাচার ও বিবিধ প্রসঙ্গ’ প্রভৃতি।     

আজ শুক্রবার বইমেলার আয়োজন

আজ গ্রন্থমেলার ২৭তম দিন। মেলা চলবে বেলা ১১টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত। ১১টা থেকে ১টা পর্যন্ত থাকবে শিশুপ্রহর। বিকেল ৪টায় অনুষ্ঠিত হবে আবুল কাসেম রচিত বঙ্গবন্ধুর অর্থনৈতিক উন্নয়নদর্শন : জাতীয়করণনীতি এবং প্রথম পঞ্চমবার্ষিক পরিকল্পনা শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ পাঠ করবেন অসীম সাহা। আলোচনায় অংশ নেবেন এম এম আকাশ ও নাসিমা আনিস। সভাপতিত্ব করবেন আতিউর রহমান।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত