চলমান ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব রেলসেতু নির্মাণ’ প্রকল্পের ব্যয় বেড়েছে ৭ হাজার কোটি টাকার বেশি। এতে ৯ হাজার ৭৩৪ কোটি টাকার মূল প্রকল্প ব্যয় দাঁড়িয়েছে ১৬ হাজার ৭৮০ কোটি টাকায়। একই সঙ্গে সেতু নির্মাণের সময়ও বাড়ানো হয়েছে দুই বছর। বাড়তি সময় ও ব্যয় নিয়ে প্রকল্পটির সংশোধনীসহ আটটি প্রকল্পের চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)।
গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত একনেক সভায় প্রকল্পগুলোর অনুমোদন দেওয়া হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী ও একনেক চেয়ারপারসন শেখ হাসিনা।
সভা শেষে প্রকল্পগুলোর বিভিন্ন দিক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে তুলে ধরেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান। এ সময় উপস্থিত ছিলেন পরিকল্পনা সচিব নুরুল আমিন, সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য (সিনিয়র সচিব) ড. শামসুল আলম, পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সদস্য সৌরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, ভৌত অবকাঠামো বিভাগের সদস্য শামীমা নার্গিস এবং কৃষি, পানিসম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগের সদস্য মো. জাকির হোসেন আকন্দ।
পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, একনেক সভায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব রেলসেতু নির্মাণ প্রকল্পের সংশোধনীসহ ৮ প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৬টি নতুন এবং দুটি সংশোধিত প্রকল্প। নতুন ৬ প্রকল্পের খরচ হবে ৩ হাজার ৩৮০ কোটি ৪০ লাখ টাকা। এছাড়া সংশোধিত দুটি প্রকল্পে ব্যয় বেড়েছে ৭ হাজার ৮৭ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। মোট অর্থায়নের মধ্যে শুধু একটি প্রকল্পে বৈদেশিক সহায়তা রয়েছে।
এম এ মান্নান বলেন, বঙ্গবন্ধু রেলসেতু নির্মাণে ব্যয় বাড়ছে ৭ হাজার ৪৬ কোটি টাকা। সেতুটির উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠান জাপান সরকারের উন্নয়ন সংস্থা (জাইকা) নতুন করে প্রকল্প পর্যালোচনা করে দেখেছে ব্যয় বাড়বে। এ কারণেই প্রকল্পের ব্যয় বাড়ানো হচ্ছে। বাড়তি ব্যয়ের ৪ হাজার ৪২৮ কোটি টাকা ঋণ দিতে সম্মত হয়েছে জাইকা।
তিনি বলেন, বর্তমান বঙ্গবন্ধু সেতু থেকে ৩০০ মিটার উজানে এই সেতু নির্মাণ করা হবে। ডুয়াল লাইন রেলসেতু হবে এটি। সেতুটি সিরাজগঞ্জসহ উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোকে চাঙ্গা করবে।
জানা গেছে, যমুনায় রেলসেতু নির্মাণ প্রকল্পের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। আধুনিক সব সুযোগ-সুবিধার সমন্বয়ে নির্মিত হবে রেলসেতুটি। ২০১৬ সালে প্রকল্পটি যখন জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদন হয়। তখন এর ব্যয় ধরা হয়েছিল ৯ হাজার ৭৩৪ কোটি ৭ লাখ টাকা। তখন জাইকার ঋণ ছিল ৭ হাজার ৭২৪ কোটি ৩২ লাখ টাকা। নানা কারণে প্রকল্পের মোট ব্যয় বেড়ে দাঁড়াচ্ছে ১৬ হাজার ৭৮০ কোটি টাকা। এখন জাইকার ঋণ দাঁড়াচ্ছে ১২ হাজার ১৪৯ কোটি ২০ লাখ টাকায়। শুরুতে ২০২৩ সালের ডিসেম্বর মেয়াদে বাস্তবায়নের সময় নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে এর অগ্রগতি মাত্র ৯ শতাংশ। ফলে প্রকল্পের মেয়াদ বেড়ে দাঁড়াচ্ছে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত।
নির্মাণকাজের মূল্য বৃদ্ধি, নতুন কাজ হিসেবে ভূমি অধিগ্রহণ, ভূমি ও অন্যান্য ফ্যাসিলিটি ভাড়ার সংস্থান, একটি জাদুঘর ও পরিদর্শন বাংলো নির্মাণ, ব্যাংক চার্জ বাড়ছে প্রকল্পে। এছাড়া সিগন্যালিং ও টেলিকমিউনিকেশন ওয়ার্কস এবং প্যাকেজ-৩-এর কাজের ব্যয় বাড়ার বিষয়ে জাইকাকে জানানো হয়েছে। তাই বাড়তি ঋণ দেবে জাইকা।
সংশোধিত প্রকল্পে ডিজাইন ও সুপারভিশন পরামর্শক খাতে সরকারি তহবিল থেকে ২১২ কোটি টাকাসহ মোট ৮১৭ কোটি ৮১ লাখ টাকা বাড়ছে। আবার সরকারি অর্থে ম্যানেজমেন্ট সাপোর্ট পরামর্শক বাবদ ৫২ কোটি টাকার সংস্থান রাখা হয়েছে। সংশোধিত প্রকল্প প্রস্তাবে জমি অধিগ্রহণ, জমি ব্যবহার ও আনুষঙ্গিক ব্যয় বাবদ মোট ৩৪৬ কোটি ৬৬ লাখ টাকার প্রস্তাব করা হয়েছে। এটি অনুমোদিত মূল প্রকল্প প্রস্তাবে ছিল না। একনেকে পাস হওয়া অপর সংশোধিত প্রকল্প ‘রাজশাহী বিসিক শিল্পনগরী-২’। প্রকল্পের খরচ ৪০ কোটি ৯৬ লাখ টাকা বেড়ে মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে ১৭২ কোটি ৭০ লাখ টাকায়।
একনেকে অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর মধ্যে ‘জরুরি পানি সরবরাহ’ প্রকল্পে খরচ ধরা হয়েছে ৭৩২ কোটি টাকা। ‘আমিন বাজার ল্যান্ডফিল সম্প্রসারণ ও আধুনিকীকরণ’ প্রকল্পে খরচ ধরা হয়েছে ৭৮৬ কোটি। ‘শেখপাড়া (ঝিনাইদহ)-শৈলকুপা লাঙ্গলবাঁধ-ওয়াপদা মোড় জেলা মহাসড়ক প্রশস্তকরণ ও মজবুতিকরণ’ প্রকল্পে খরচ ধরা হয়েছে ২৬৭ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। ‘পাবনা জেলার বেড়া উপজেলার মুন্সিগঞ্জ থেকে খানপুরা এবং কাজিরহাট থেকে রাজধরদিয়া পর্যন্ত যমুনা নদীর ডান তীর সংরক্ষণ’ প্রকল্পের খরচ ধরা হয়েছে ৪৩৩ কোটি টাকা। ‘কুড়িগ্রাম জেলার সদর, রাজারহাট ও ফুলবাড়ী উপজেলাধীন ধরলা নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণসহ বাম ও ডান তীর সংরক্ষণ’ প্রকল্পের খরচ ধরা হয়েছে ৫৯৫ কোটি টাকা। ‘পদ্মা নদীর ভাঙন থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার সদর উপজেলার চরবাগডাঙ্গা ও শাজাহানপুর এলাকা রক্ষা’ প্রকল্পের খরচ ধরা হয়েছে ৫৬৬ কোটি টাকা।
