রাজধানীর খিলগাঁও দক্ষিণ গোড়ানে একটি ভবনের চতুর্থ তলার ফ্ল্যাট থেকে দুই শিশুর গলাকাটা লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। গতকাল শনিবার সকালে জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন পেয়ে খিলগাঁও থানার পুলিশ লাশ দুটি উদ্ধার করে। এ সময় বাসা থেকে দগ্ধ অবস্থায় শিশুদের মা আকতারুন্নেছা পপীকে (৩৫) উদ্ধার করে শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়। তার শরীরের ১৮ শতাংশ দগ্ধ হয়েছে বলে জানিয়েছেন ইনস্টিটিউটের সমন্বয়ক ডা. সামন্ত লাল সেন।
শিশু দুটির মধ্যে জান্নাত (১১) ন্যাশনাল আইডিয়াল স্কুলের চতুর্থ শ্রেণি ও আলভি (৮) একই স্কুলের প্রথম শ্রেণিতে পড়ত। বিকেলে লাশের ময়নাতদন্ত শেষে ঢামেক ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ডা. মো. সোহেল মাহমুদ জানান, গলায় ধারাল অস্ত্রের আঘাতের কারণেই শিশু দুটির মৃত্যু হয়েছে। পরে তাদের শরীরে আগুন দেওয়া হয়েছে। বড় মেয়ের শরীর বেশি দগ্ধ।
ফ্ল্যাট থেকে একটি সুইসাইড নোট উদ্ধার করা হয়েছে। নোট ও পপীর স্বামী মোজাম্মেল হক বিপ্লবের বক্তব্য বিশ্লেষণ করে পুলিশের ধারণা, আর্থিক অনটন থেকে দাম্পত্য কলহের জেরে দুই মেয়েকে হত্যার পর নিজে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন পপী।
ডিএমপির খিলগাঁও জোনের এডিসি নুরুল আমিন জানান, বাসায় উভয় পিঠে পপীর লেখা এক পৃষ্ঠার একটি চিরকুট পাওয়া গেছে। সেখানে সংসারে আর্থিক অনটন ও স্বামীর সঙ্গে কলহের তথ্য রয়েছে। পরে ঘটনাস্থল থেকে সিআইডির ক্রাইম সিন টিম আলামত সংগ্রহ করেছে।
খিলগাঁও থানার ওসি মশিউর রহমান দেশ রূপান্তরকে জানান, দুই সন্তান ও স্বামীকে নিয়ে ৩৯৭ নম্বর দক্ষিণ গোড়ানের মোল্লা ভবনের চারতলায় ভাড়া থাকতেন পপী। স্বামী মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলার বাড়িখাল গ্রামে ব্যবসা সূত্রে সেখানেই অবস্থান করতেন। মাঝেমধ্যে ঢাকার বাসায় আসতেন। গত শুক্রবার রাতে মুঠোফোনে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া হয়। এরই জের ধরে পপী দুই মেয়েকে গলা কেটে হত্যা করেন। পরে নিজেও শরীরে আগুন দেন।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন পপী দেশ রূপান্তরকে জানান, স্বামী তাদের দেখাশোনা করত না। টাকা-পয়সা চাইলেও ঠিকমতো দিত না। শ্রীনগরে ভাইয়ের সঙ্গে ইলেকট্রিকের ব্যবসা করে। সব হিসাব তার ভাই রাখে, সে কোনো হিসাব রাখে না। আইডিয়ালের ছাত্রী দুই মেয়ের খরচ লাগে। এসব বিষয়ে স্বামী কোনো মাথাব্যথা নেই। টাকা চাইলে বকাবকি করত। দুই সপ্তাহ আগে ৪০ দিনের চিল্লায় যায়, এই সময়ে কোনো যোগাযোগ করেনি। এ নিয়ে কথা বলতে গেলে তালাক দিয়ে অনত্র বিয়ে করার হুমকি দেয়। তিনি আরও জানান, বাচ্চাদের পড়াশোনার কথা বললে, তাদের শ্রীনগরে নিয়ে মাদ্রাসায় ভর্তির কথা বলে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি সবশেষ ঢাকার বাসায় আসে মোজাম্মেল। শুক্রবার আসতে চেয়েও আসেনি। মুঠোফোনে আসার কথা ও টাকা চাইলে খারাপ ব্যবহার করে। এ সময় বাচ্চাদের কেন হত্যা করলেন জানতে চাইলে পপী চুপ করে যান। কোনো জবাব দেননি।
খবর পেয়ে শ্রীনগর থেকে ঢাকার বাসায় ছুটে আসেন পপীর স্বামী। পরে তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য খিলগাঁও থানায় নেওয়া হয়। সেখানে দেশ রূপান্তরকে মোজাম্মেল বলেন, ‘শুক্রবার রাত ৯টার দিকে সবশেষ পপীর সঙ্গে আমার কথা হয়। ওইদিন আসতে চেয়েও কাজ থাকায় পারিনি। এ নিয়ে পপী ক্ষিপ্ত হয়ে এক পর্যায়ে ফোন রেখে দেয়।’ বিলাপ করতে করতে তিনি বলেন, ‘রাগ থাকলে পপী আমাকে খুন করতে পারত। সন্তানদের কেন খুন করল? ব্যবসার অবস্থা ভালো না, দেনা হয়ে গেছে। এজন্য ওদের সব চাহিদা পূরণ করতে পারতাম না। এখনো এ মাসের ঘরভাড়া ১০ হাজার টাকা দিতে পারিনি। তবুও শুক্রবার বিকাশে দেড় হাজার টাকা দিয়েছি। স্ত্রী-সন্তানদের গ্রামে নিয়ে যেতে চাওয়ায় পপী আমার ওপর বেশি ক্ষিপ্ত ছিল।’ তিনি আরও বলেন, ‘১৪ বছরের সংসার আমাদের। পপির মাথায় কিছুটা সমস্যা ছিল, অল্পতে রেগে যেত। গ্রামের বাড়িতে এখন পর্যন্ত মাত্র এক বছর থেকেছে। আমার মায়ের সঙ্গে তার বনিবনা নেই। এজন্য বাবার বাড়ি থাকত। বছর দুই আগে আমার ছোট শ্যালক বিয়ে করলে আলাদা বাসা নিতে চায় সে। আর্থিক দুরবস্থার কথা বললেও জোরাজুরি করে। পরে বাসাভাড়া ও বাচ্চাদের পড়ার খরচ টাকা দিতে চাই। সে রাজি হয়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে এটা-ওটা আবদার করত। এ নিয়ে প্রায়ই কলহ হতো।’
পপীর বাবা আবু তালেব বলেন, ‘প্রতি শুক্রবার জামাই মুন্সীগঞ্জ থেকে খিলগাঁওয়ের বাসায় আসে, শনিবার চলে যায়। তাদের মধ্যে কলহ ছিল। কিন্তু ঘটনার রাতে কী হয়েছে, আমি জানি না। নাতনিদের নিয়ে আজ (গতকাল) পপীর আমাদের গোড়ান হাজি মসজিদ এলাকার বাসায় এসে নাশতা করার কথা ছিল। না আসায় ফোন দিলেও রিসিভ হয়নি। পরে বাসায় এসে ডাকতে থাকি। এ সময় পাশের বাসার ভাড়াটিয়া জানান- রাতে পপীর ফ্ল্যাট থেকে কান্নাকাটির শব্দ পেয়েছেন তারা। দরজায় ধাক্কা দিতে থাকলে, এক পর্যায়ে পপী গায়ে কম্বল পেঁচিয়ে দরজা খুলে বলে- বাবা, আমি আমার বাচ্চা দুইটাকে মেরে ফেলেছি। এরপর সে কান্নায় ভেঙে পড়ে।’
গতকাল দুপুরে মোল্লা ভবনে গিয়ে পপীর ফ্ল্যাটে তালা ঝুলতে দেখা যায়। পুলিশ ও প্রতিবেশীরা জানান, ওই পরিবারের লোকজন অন্যদের সঙ্গে তেমন মেলামেশা করত না। পপী পর্দা করে মেয়েদের স্কুলে আনা-নেওয়া করতেন। প্রায়ই মেয়েদের তিনি মারধর করতেন, বাইরে থেকেও বোঝা যেত। এ সময় ভবনের মালিক নুরুন্নাহার বেগম বলেন, ‘আট মাস আগে ফ্ল্যাটটি ভাড়া নিয়ে স্বামী-স্ত্রী একসঙ্গে ওঠেন। পরে স্বামীকে দেখতে পেতাম না। শনিবার সকালে পপীর বাবা উচ্চৈঃস্বরে ডাকাডাকি করলে, আমরাও এসে বাসার ভেতরে শিশু দুটির লাশ দেখতে পাই। পরে পপীর বাবাই ৯৯৯-এ কল করেন।’
