রাজধানীর বেইলি রোডে অফিসার্স ক্লাবে বসেছে জাতীয় পাটমেলা। গত শুক্রবার শুরু হওয়া চার দিনব্যাপী এই মেলায় এসেছেন বহুমুখী ও নতুন উদ্ভাবনী বিভিন্ন পণ্যের উদ্যোক্তারা। তবে তেমন একটা সাড়া মিলছে না। মেলা নিয়ে তেমন প্রচার না থাকা, উন্মুক্ত স্থানে মেলা না হওয়া ও একই সময়ে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে এসএমই পণ্যমেলা থাকায় এই অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করছেন উদ্যোক্তারা। তারা বলছেন, উদ্ভাবিত পণ্য প্রদর্শনে আন্তর্জাতিক মানের মেলা না হওয়ায় বিশ্বে বাজার পেতে ব্যর্থ হচ্ছেন তারা। এছাড়া পাটপণ্য উৎপাদনে ব্যাংকঋণ প্রদানে অনীহায় বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এই খাত।
এই মেলার দ্বিতীয় দিন ছিল গতকাল শনিবার। মেলা প্রাঙ্গণ ঘুরে দেখা যায়, পাট পাতার চা, পাটের তৈরি পোশাক, পাটখড়ি পুড়িয়ে তৈরি প্রসাধনী, ব্যাগ, জুতা, অঙ্গসজ্জার সামগ্রীসহ নানা পণ্য নিয়ে হাজির হয়েছেন উদ্যোক্তারা। তবে উদ্যোক্তার সংখ্যার চেয়ে দর্শনার্থী কম। যে কয়েকজন দর্শনার্থী এসেছেন তাদের বড় একটি অংশ কেবল ঘোরাঘুরি করেই সময় পার করেছেন। আবার মেলায় স্টল বরাদ্দ নিয়েও অনেকে পণ্য প্রদর্শন করেননি।
উদ্যোক্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, যেসব উদ্যোক্তা জুট ডাইভার্সিফিকেশন প্রমোশন সেন্টারের (জেডিপিসি) সদস্য তাদের বেশিরভাগই ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা (এসএমই) ফাউন্ডেশনেরও সদস্য। আগের বছরগুলোতে জেডিপিসি ও এসএমই ফাউন্ডেশন পৃথক সময়ে মেলা আয়োজন করেছে। কিন্তু এ বছর তাদের মধ্যে সমন্বয় হয়নি। আর উদ্যোক্তাদের সঙ্গে আলোচনা ছাড়াই মেলার আয়োজন করেছে। ফলে একই সময়ে তাদের মেলা বসেছে। এতে অনেক উদ্যোক্তা পাটমেলায় অংশ না নিয়ে এসএমই মেলায় অংশ নিয়েছে। দর্শনার্থীরাও পাটমেলায় না এসে এসএমই মেলায় যাচ্ছেন। এ কারণেই জমছে না পাটমেলা।
মেলায় ঘুরতে এসেছিলেন পাটপণ্য রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তুলিকার স্বত্বাধিকারী ইসরাত জাহান। তিনি বলেন, ‘আমিসহ আরও অনেকে এসএমই মেলায় স্টল নিয়েছি। আর আমাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা ছাড়াই জেডিপিসি মেলার আয়োজন করেছে। এজন্য এ বছর পাটমেলায় স্টল নিতে পারিনি।’
পাট খাতের উদ্যেক্তারা জানান, বর্তমানে তাদের প্রধান তিন সমস্যা। এগুলো হলো যথাযথ প্রশিক্ষণ না থাকা, ব্যাংকগুলোর ঋণ প্রদানে অনীহা ও উদ্ভাবিত পণ্য বিশ্ববাজারে পরিচিত করার কোনো মাধ্যম না থাকা। এছাড়া বেশিরভাগ দেশি ক্রেতা ছোট প্রতিষ্ঠানগুলোকে কাজ দিতে চায় না। এজন্য নতুন উদ্যোক্তারা কাজ পাওয়া নিয়ে শঙ্কায় থাকেন।
এবার মেলায় প্রথম এসেছে পাট পাতার গ্রিন চা। ২০১৬ সালে বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট এই চা উদ্ভাবন করে। গুয়ার্ছি অ্যাকুয়া অ্যাগ্রো টেক নামের একটি প্রতিষ্ঠান এটি রপ্তানি করে আসছে। দেশের বাজারে এই চা এখনো অপরিচিত। দেশে এর বাজার ধরতে মহিমা প্রোডাক্টস নামের একটি প্রতিষ্ঠান পাটমেলায় এই চা নিয়ে এসেছে। পানীয় হিসেবে এটি ব্যবহার হয়। পাশাপাশি বিভিন্ন রোগের দাওয়াই হিসেবেও কাজ করে। ৩৫টি ব্যাগ থাকে প্রতিটি প্যাকেটে, যার দাম ২০০ টাকা। স্টলকর্মী মির্জা লিপি বলেন, ‘বাজারে চলা অন্যান্য গ্রিন টি যেভাবে প্রস্তুত করা হয়, এই চা-ও সেভাবে প্রস্তুত হয়। মধু দিয়েও এই চা খাওয়া যায়। প্রথম দিন থেকেই সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। উৎপাদন খরচ কমাতে গবেষণা চলছে।’
মেলায় অংশ নেওয়া চারকল মালিক সমিতির স্টল এনেছে পাটখড়ি পুড়িয়ে তার কয়লা দিয়ে তৈরি বিভিন্ন প্রসাধানী। রপ্তানিতে এর সম্ভাবনা দেখছেন উদ্যোক্তারা। ২০১২ সালে চীনা বিজ্ঞানি ওয়াং কেই পাটখড়ি পুড়িয়ে বিভিন্ন পণ্য উদ্ভাবন করেন। এই খাতে বিনিয়োগ করেছেন ৪২ উদ্যোক্তা। অ্যাশল্যান্ড অ্যাগ্রিটেক বিডি লিমিটেডের স্বত্বাধিকারী সামিউল হাসান বলেন, এ পণ্য রপ্তানিতে ২০ শতাংশ প্রণোদনা দেয় সরকার। প্রতিটন পাটখড়ি কয়লা বিক্রি হয় ৮০০-৯০০ ডলার। তবে ব্যাংকগুলো এই খাতে ঋণ দেয় না। এক্ষেত্রে সরকারের নজর দেওয়া উচিত।
