করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়া দেশগুলো থেকে ফেরা ব্যক্তিদের বাড়িতে অবস্থান করার আহ্বান জানালেও অনেকে তা মানছেন না বলে জানিয়েছে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)। গতকাল শুক্রবার রাজধানীর মহাখালীতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সম্মেলন কক্ষে নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে আইইডিসিআর পরিচালক অধ্যাপক মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন, সেক্ষেত্রে সংক্রামক রোগ আইনে সরকার ‘কিছুটা শক্ত পদক্ষেপও’ নিতে পারে।
আইইডিসিআর পরিচালক আরও বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করেছিলাম আমাদের দিক থেকে যাতে কোনো ধরনের আতঙ্ক না ছড়ায়, বিদেশফেরতরা যেন সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন না হন। দেশে ফেরার পর তাদেরকে ১৪ দিন বাসায় অবস্থান করতে বলা হয়েছে। কিন্তু এখন আমরা খেয়াল করছি সরকারের এই সহানুভূতিশীল পদক্ষেপকে তারা সঠিকভাবে ব্যবহার করছেন না। এজন্য সংক্রামক ব্যাধি আইনে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ আছে। কিন্তু আমরা সেই আইন প্রয়োগ করতে চাই না। সবাই মিলে এ পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে চাই।’
আইইডিসিআর জানায়, সংক্রামক রোগ (প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল) আইনে সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে সরকারি দায়িত্ব পালনে বাধা দিলে বা নির্দেশনা না মানলে সর্বোচ্চ তিন মাসের জেল ও ৫০ হাজার টাকা শাস্তির বিধান রয়েছে। আর মিথ্যা বা ভুল তথ্য দিলে সর্বোচ্চ ২ মাসের কারাদণ্ড বা ২৫ হাজার টাকা অর্থদণ্ড হতে পারে।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, দেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত তিনজনের মধ্যে একজন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন। আরেকজন সুস্থ হলেও তার বাড়ির আরও কিছু মানুষ কোয়ারেন্টাইনে থাকায় এবং তার পরিবারের আরেকজন হাসপাতালে থাকায় তাকে এখনো হাসপাতালেই রাখা হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন অনুযায়ী, আক্রান্ত ব্যক্তির পরপর দুবার পরীক্ষার ফল নেগেটিভ এলে তার শরীরে করোনাভাইরাস নেই ধরে নেওয়া হয় এবং তাদের হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়া যায়। আর তৃতীয় একজনের শরীরে এখনো ভাইরাসের সংক্রমণ রয়ে গেছে।
অধ্যাপক মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন, বর্তমানে বিভিন্ন হাসপাতালে আটজনকে ‘আইসোলেশনে’ রাখা হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় আরও ২৪ জনের নমুনা তারা পরীক্ষা করেছেন। সব মিলিয়ে নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে মোট ১৮৭ জনের। তবে ওই তিনজন বাদে নতুন করে কারও শরীরে করোনাভাইরাসের উপস্থিতি মেলেনি।
আইইডিসিআরের নির্দেশনা : বিদেশফেরত কারও মধ্যে করোনাভাইরাসের উপসর্গ পাওয়া গেলে আইইডিসিআরে সরাসরি না গিয়ে হটলাইনে যোগাযোগের আহ্বান জানান মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা। তিনি বলেন, ‘এভাবে যাতায়াতের কারণে রোগটি অন্যের শরীরে সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। হটলাইনে ফোন করলে আইইডিসিআরের কর্মীরা বাড়ি গিয়ে নমুনা নিয়ে আসবেন। কারণ আপনাদের কারও মধ্যে যদি সত্যিই এ ভাইরাসের উপস্থিতি থাকে তাহলে সেটা কিন্তু এখানে আসা অন্য আরেকজনের শরীরে সংক্রমিত হতে পারে। শুধু আইইডিসিআরে আসা লোকজন আক্রান্ত হবে এমন নয়। আপনারা যে গণপরিবহন ব্যবহার করেন, আপনাদের সঙ্গে যিনি আসেন, প্রত্যেকেরই ঝুঁকি তৈরি হয়।’
মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত বাংলাদেশিদের উদ্দেশে আইইডিসিআর পরিচালক বলেন, ‘সৌদি আরবে যাওয়ার জন্য কোনো স্বাস্থ্য সনদের প্রয়োজন নেই। সৌদি দূতাবাস জানিয়েছে, যারা সৌদি আরবে যাবেন তারা যেন সরাসরি ফ্লাইটে যান। ট্রানজিট আছে এমন ফ্লাইটে না যান। মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশ থেকে আশ্বস্ত করা হয়েছে, ওয়ার্ক পারমিট ও ভিসার মেয়াদ বাড়াবে। তাই আমাদের যেসব শ্রমিক মধ্যপ্রাচ্যে কাজ করেন তাদের আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই।’
গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, ‘সৌদি আরব যেতে চাওয়া কিছুসংখ্যক বাংলাদেশি শ্রমিক বাহরাইন থেকে ফেরত এসেছেন। মূলত বাহরাইন থেকে সৌদি আরবে ফ্লাইট চলাচল বন্ধ থাকায় তাদের ফিরে আসতে হয়।’
আইইডিসিআর জানায়, দেশের বাইরে সিঙ্গাপুরে পাঁচজন এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইতালিতে এর আগে দুজন বাংলাদেশির মধ্যে করোনাভাইরাস ধরা পড়েছিল। তাদের মধ্যে সিঙ্গাপুরের চারজন ইতিমধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন। একজনের অবস্থা সংকটাপন্ন, তার অবস্থার তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি।
৩৩৩-এ ডায়াল করলেই মিলবে আইইডিসিআরের সব হটলাইন নম্বর : আইইডিসিআর পরিচালক মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় আইইডিসিআরের হটলাইনে ৪ হাজার ৩২৯টি কল এসেছে। তার মধ্যে করোনা সম্পর্কিত তথ্য জানার জন্য কল এসেছে ৪ হাজার ২১২টি। তবে এখনো অনেকের অভিযোগ তারা হটলাইনে সংযোগ পান না। এ কারণে আরও ৫টি নম্বর সংযুক্ত করা হয়। এখন থেকে ৩৩৩-এ ডায়াল করলেই সবগুলো হটলাইনে প্রবেশ করা যাবে। তিনি জানান, প্রথম দিকে মাত্র চারটি হটলাইন নম্বর ছিল। পরে আরও ৮টি ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের স্বাস্থ্য বাতায়ন ১৬২৬৩-সহ ১৩টি নম্বরে করোনা সম্পর্কিত পরামর্শ দেওয়া হয়। এরপরও চাহিদা থাকায় আরও ৫টি নতুন নম্বর যুক্ত করা হয়। তবে এখন থেকে ৩৩৩ নম্বরে ফোন করলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে হটলাইনের নম্বরগুলোতে প্রবেশ করা যাবে।
ভারতে কোয়ারেন্টাইনে থাকা ২৩ বাংলাদেশি ফিরছেন আজ : ভারতের নয়াদিল্লিতে ১৪ দিন কোয়ারেন্টাইনে থাকার পর স্বাস্থ্য ছাড়পত্র নিয়ে আজ শনিবার দেশে ফিরবেন ২৩ বাংলাদেশি। বাংলাদেশ সরকারের আর্থিক সহায়তায় আজ বিকেলে ইনডিগো এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে ঢাকার উদ্দেশে নয়াদিল্লি ছাড়বেন তারা। গত ২৭ ফেব্রুয়ারি ভারতের বিমানবাহিনীর একটি বিশেষ বিমানে বেশ কয়েকজন ভারতীয় নাগরিকের সঙ্গে করোনাভাইরাসের উৎপত্তিস্থল চীনের উহান থেকে তাদের সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল।
গত বৃহস্পতিবার ওই বাংলাদেশিদের প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়েছে। তারা কেউই করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হননি। ২৩ জনের ওই দলে থাকা এক শিক্ষার্থী গত বৃহস্পতিবার ফোনে বার্তা সংস্থা ইউএনবিকে বলেন, ‘আমরা শুক্রবার (গতকাল) স্বাস্থ্য ছাড়পত্র পাব, শনিবার (আজ) ঢাকায় ফিরতে পারব বলে আশা করছি।’
৮টি পরিবার ও ৫ শিশুসহ ৭৬ ভারতীয় নাগরিক এবং অন্যান্য দেশের ৩৬ জন নাগরিককে ফিরিয়ে আনার পর প্রথমে বিমানবন্দরে পর্যবেক্ষণ করা হয়। বিদেশিদের মধ্যে ২৩ জন বাংলাদেশ, ৬ জন চীন, মিয়ানমার ও মালদ্বীপের ২ জন করে এবং মাদাগাস্কার, দক্ষিণ আফ্রিকা ও যুক্তরাষ্ট্রের একজন করে নাগরিক ছিলেন।
এর আগে গত ১ ফেব্রুয়ারি চীন থেকে ৩১২ জন নাগরিককে ফিরিয়ে আনে বাংলাদেশ সরকার। বাকি বাংলাদেশিদের ফেরত আসার ক্ষেত্রে নিবন্ধন করা হয়।
করোনা শনাক্তকরণের সঙ্গে চিকিৎসার সম্পর্ক নেই : স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেছেন, করোনাভাইরাস শনাক্তকরণের সঙ্গে চিকিৎসার কোনো সম্পর্ক নেই। নমুনা পরীক্ষায় নিশ্চিত না হয়েও এ রোগটির লক্ষণ ও উপসর্গ দেখে চিকিৎসা শুরু করা সম্ভব। গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সম্মেলন কক্ষে গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে আলাপকালে এ কথা বলেন তিনি।
ডা. আজাদ বলেন, ‘বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বিভিন্ন গণমাধ্যম এবং টেলিভিশন টকশোতে বলা হচ্ছে, ঢাকার বাইরে করোনাভাইরাস টেস্টিং ফ্যাসিলিটি নেই। তারা বলতে চাইছে, এটার খুব দরকার আছে, আসলে এটার কোনো দরকার নেই।’
দেশে যে তিনজনের শরীরে করোনার উপস্থিতি পাওয়া গেছে তাদেরকে ‘করোনা রোগী’ বলতে রাজি নন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডিজি। তিনি বলেন, ‘তাদের শরীরে ভাইরাসের সংক্রমণ হয়েছিল। প্রথম দিন তাদের শরীরে একটু বেশি জ্বর ছিল। পরের দিনেই তারা সুস্থ হয়ে ওঠেন। ফলে কারও শরীরে যদি করোনার সংক্রমণ থাকে এবং রোগের লক্ষণও থাকে তাকে পরীক্ষার মাধ্যমে ভাইরাস নিশ্চিত করার দরকার নেই। অধিক সতর্কতা হিসেবে আমরা পরীক্ষা করি। দেশে কতজন আক্রান্ত হয়েছে তা জানতে পরীক্ষা চলছে। রোগতত্ত্ববিদরা লক্ষণ ও উপসর্গ দেখেও চিকিৎসা শুরু করতে পারেন।’
ডা. আজাদ বলেন, ‘আমরা সারা দেশে এমন নেটওয়ার্ক তৈরি করেছি, সন্দেহভাজন রোগী সম্পর্কে জানতে পারলে নিজেরা গিয়ে পরীক্ষার জন্য নমুনা সংগ্রহণ করতে পারব। পরীক্ষা করার পর রোগীকে তা জানিয়ে দেব। পরীক্ষা নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই।’
ভ্রমণে বিধিনিষেধ আরোপের এখতিয়ার সরকারের : বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) বাংলাদেশের প্রতিনিধি ডা. বর্ধন জাং রানা বলেছেন, ফ্লাইটে ভ্রমণ বাতিলের সিদ্ধান্তের এখতিয়ার বাংলাদেশ সরকারের। যখন সরকার মনে করবে করোনাভাইরাস সংক্রমণ রোধে ভ্রমণ বাতিল করা প্রয়োজন, তখন উদ্ভূত পরিস্থিতিতে এ ঘোষণা দিতে পারে। তবে এই মুহূর্তে বাংলাদেশের ফ্লাইট বাতিলের কোনো প্রয়োজন আছে বলে তিনি মনে করেন না। গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে করোনাভাইরাস পরিস্থিতি নিয়ে ব্রিফিং শেষে এক প্রশ্নের জবাবে এ সব কথা বলেন তিনি।
ডা. বর্ধন বলেন, ‘সদস্যভুক্ত সব দেশকে ইন্টারন্যাশনাল হেলথ রেগুলেশনস (আইএইচআর) অনুসারে কী কারণে ভ্রমণ বাতিল করা হলো বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে তা বিস্তারিত জানাতে হবে। বর্তমান করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে যেসব দেশ ভ্রমণে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে তাদের সবাইকে যুক্তিসঙ্গত কারণ লিখে জানাতে হচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘যারা ফ্লাইটে ভ্রমণ করছে তারা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ওয়েবসাইটে গিয়ে ভ্রমণ তথ্য পড়ে দেখতে পারেন। তাতে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সুবিধা হবে।’
