নানা কারণে চলতি অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বাস্তবায়নে গতি আনা যায়নি। এবার করোনাভাইরাসের কারণে পিছিয়ে যাচ্ছে বেশ কিছু মেগা প্রকল্পের কাজ। এই প্রেক্ষাপটকে সামনে রেখে অর্থবছরের মাঝপথে এসে এডিপি সংশোধন করে বরাদ্দ কমানো হচ্ছে। আজ বৃহস্পতিবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) সভায় সংশোধিত এডিপি অনুমোদন পাওয়ার কথা রয়েছে। রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে এ সভায় প্রধানমন্ত্রী ও একনেক চেয়ারপারসন শেখ হাসিনা সভাপতিত্ব করবেন।
পরিকল্পনা কমিশনের খসড়া প্রস্তাবনা অনুসারে সংশোধিত এডিপি আকার ধরা হয়েছে ১ লাখ ৯২ হাজার ৯২১ কোটি টাকা। যদিও বছরের শুরুতে রেকর্ড বরাদ্দের এডিপি বাস্তবায়নের লক্ষ্য ধরা হয়েছিল। কিন্তু খরচ করতে না পারার আশঙ্কায় এখন এডিপি কাটছাঁট করতে যাচ্ছে সরকার। তবে নতুন ও মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে যেন কোনো সমস্যা না হয়, এজন্য বিশেষ তহবিল রাখা হচ্ছে।
পরিকল্পনা কমিশন থেকে পাওয়া তথ্য বলছে, গত বছর ১৯ মে এনইসি ২ লাখ ২ হাজার ৭২১ কোটি টাকার এডিপি অনুমোদন দেয় সরকার। যার মধ্যে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে জোগান দেওয়া হয়েছিল ১ লাখ ৩০ হাজার ৯২১ কোটি টাকা। বাকি ৭১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল বিশ্বব্যাংক, এডিবি, আইডিবিসহ বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগীর কাছ থেকে পাওয়া ঋণে। অর্থবছরের ৯ মাস পর এখন এডিপি থেকে কমানো হচ্ছে ৯ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। এই ৯ হাজার ৮০০ কোটি টাকা পুরোটাই বৈদেশিক ঋণ। রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে বছরের শুরুতে যা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল, তা-ই থাকছে। ফলে সংশোধিত এডিপির আকার দাঁড়াচ্ছে ১ লাখ ৯২ হাজার ৯২১ কোটি টাকা। এর মধ্যে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে থাকছে ১ লাখ ৩০ হাজার ৯২১ কোটি টাকা। আর বৈদেশিক ঋণ থেকে দেওয়া হচ্ছে ৬২ হাজার কোটি টাকা। এডিপি থেকে কমছে ৪.৮৩ শতাংশ টাকা।
পরিকল্পনা কমিশন জানায়, উন্নয়নে যেন কোনো অর্থ সংকট না হয় তার জন্য আলাদা বিশেষ তহবিল রাখা হবে। এ অর্থ দিয়ে মেগা প্রকল্প ছাড়াও সংশোধিত এডিপি অনুমোদন হওয়ার পর যেসব নতুন প্রকল্প একনেক সভায় অনুমোদন পাবে, সেসব প্রকল্পে টাকা বরাদ্দ দেওয়ার জন্য বিশেষ উন্নয়ন সহায়তা তহবিলে ৭৫৯ কোটি টাকা রাখা হয়েছে। পরিকল্পনামন্ত্রীর অনুমোদন নিয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী কোন প্রকল্পে কত টাকা লাগবে, তা বরাদ্দ দেওয়া হবে। এ ছাড়া স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের আওতায় উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ, পৌরসভা, সিটি করপোরেশন ও ইউনিয়ন পরিষদÑ এই পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নের জন্য চলতি অর্থবছরের সংশোধিত এডিপিতে ২ হাজার কোটি টাকা রাখা হচ্ছে।
ফলে বছর শেষে এডিপির আকার আর ২ লাখ কোটি টাকা থাকছে না। বিগত বছরগুলোর ধারাবাহিকতায় চলতি বছরও উন্নয়ন সহযোগীদের টাকা খরচ করতে না পেরে ফেরত দিচ্ছে মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো। যদিও যথারীতি রাষ্ট্রীয় কোষাগারের টাকা খরচে বেশ তৎপর সবাই। ফলে আগের বছরগুলোর মতো এ বছরও উন্নয়ন সহযোগীদের ঋণ কাটছাঁট করে এডিপি সংশোধন করা হচ্ছে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় থেকে এসব তথ্য মিলেছে।
এ প্রসঙ্গে পরিকল্পনা বিভাগের সচিব মো. নূরুল আমিন বলেন, সংশোধিত এডিপির খসড়া প্রস্তুত করা হয়েছে বাস্তবায়নকারী সংস্থা ও বিভাগগুলোর সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে। উন্নয়নে অর্থের কোনো সংকট নেই, কিন্তু ব্যয় করতে পারছে না বলে ফেরত এসেছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, করোনাভাইরাসের কারণে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রভাব পড়েছে। এ সংক্রান্ত বিষয়ে এনইসি সভায় প্রধানমন্ত্রী বিশেষ নির্দেশনা দিতে পারেন। সে অনুসারে কাজ চলবে।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, সংশোধিত এডিপিতে সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ থাকছে পরিবহন খাতে। পদ্মা সেতুসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো নির্মাণে সংশোধিত এডিপিতে পরিবহন খাতে বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে ৩৭ হাজার ৮৪০ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের ২৩ শতাংশ। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে বিদ্যুৎ খাতে ২৩ হাজার ২২৫ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের ১৪ শতাংশ। তৃতীয় সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে ভৌত অবকাঠামো বিভাগে ২০ হাজার ৩৭৭ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের ১২ শতাংশ। শিক্ষার প্রসার ও গুণগত মান বাড়াতে শিক্ষা খাতে চতুর্থ সর্বোচ্চ বরাদ্দ থাকছে ১৫ হাজার ৪৬৯ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের ৯ শতাংশ। মূল এডিপিতে প্রকল্পের সংখ্যা ১ হাজার ৬০০ থাকলেও সংশোধিত এডিপিতে প্রকল্পের সংখ্যা বেড়ে ১ হাজার ৯০০-তে উন্নীত হচ্ছে।
এদিকে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) হালনাগাদ তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) এডিপিতে মোট খরচ হয়েছে ৭০ হাজার ৭৭২ কোটি টাকা, যা মোট এডিপির ৩৯ শতাংশ। শতভাগ এডিপি বাস্তবায়ন করতে বাকি চার মাসে মন্ত্রণালয়গুলোকে খরচ করতে হবে আরও ১ লাখ ৩১ হাজার ৯৪৯ কোটি টাকা। এই টাকা খরচ করতে না পারার আশঙ্কায় ৯ হাজার ৮০০ কোটি টাকা ফেরত দেওয়া হচ্ছে।
