মাগুরায়ও নানা অপকর্ম কুড়িগ্রামের আরডিসি নাজিমের

আপডেট : ২০ মার্চ ২০২০, ০৬:২৪ এএম

কুড়িগ্রামে সাংবাদিক আরিফুল ইসলাম রিগ্যানকে গভীর রাতে বাড়ির দরজা ভেঙে তুলে নিয়ে নির্যাতনকারী জ্যেষ্ঠ সহকারী কমিশনার নাজিম উদ্দিন ২০১৮ সালের অক্টোবর থেকে ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলায় কর্মরত ছিলেন। সেখানে সহকারী কমিশনার (ভূমি) পদে থাকাকালে সেবাপ্রার্থী সাধারণ মানুষের সঙ্গে অসদাচরণ, মারধর, বাড়িঘর ভাঙচুর এবং নানা অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। বিশেষ করে ব্যক্তিমালিকানার জমিকে খাস দেখিয়ে সরকারি বরাদ্দের নামে তিনি হাতিয়ে নিয়েছেন বিপুল অঙ্কের টাকা। এ অভিযোগে তার বিরুদ্ধে চলছে বিভাগীয় মামলা।

মহম্মদপুর সদরের ওষুধ ব্যবসায়ী বাদশা ফকির দেশ রূপান্তরের কাছে অভিযোগ করেন, ২০১৮ সালে তাদের পৈতৃক জমির কিছু অংশ সরকারের নামে রেকর্ড হয়। এ সময় নাজিম উদ্দিনের সঙ্গেযোগাযোগ করলে কোনো মামলা ছাড়াই বিষয়টি সমাধানের জন্য ৩ লাখ টাকা ঘুষ নেন তিনি। পরে রেকর্ড সংশোধন না করে টালবাহানা করতে থাকেন। উপায়ান্তর না দেখে ঘুষের টাকা ফেরত চাইলে বাদশা ফকিরের ওপর সন্ত্রাসী হামলা ও গুলি করে হত্যার হুমকি দেন নাজিম। তখন জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে মহম্মদপুর থানায় জিডি ও টাকা ফেরত পেতে আদালতে মামলা করেন বাদশা ফকির। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে নাজিম দলবল নিয়ে রাতে বাড়িতে গিয়ে বাদশার স্ত্রীকে মারধর করেন। শুধু তাই নয়, স্ত্রীর অবৈধ গর্ভপাতের মিথ্যা অভিযোগে বাদশা ফকিরকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে এক বছরের কারাদ- ও ২ লাখ টাকা জরিমানা করেন। এ রায়ে বিনা অপরাধে ২ মাস ৩ দিন হাজত খেটেছেন তিনি।

বাদশা ফকির বলেন, ‘নাজিম উদ্দিনের মতো খারাপ ব্যবহার ও ঘুষখোর কর্মকর্তা মহম্মদপুরবাসী আগে কখনো দেখেনি। এ ধরনের কর্মকর্তা কোনো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকলে যেকোনো সময় রাষ্ট্রের বড় ধরনের ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে।’

মহম্মদপুরের রাজাপুর গ্রামের হোটেল ব্যবসায়ী অজয় সাহা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার নামে নাজিম উদ্দিন আমার দোকানে এসে ফার্নিচার ভাঙচুর করেন। এ সময় তিনি অশালীন ভাষায় গালি দেন।’ ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে নাজিম উদ্দিন মহম্মদপুরের বিভিন্ন এলাকায় ব্যক্তিমালিকানার দোকানঘর খাস দাবি করে ভাঙচুর করেন। এ সময় একাধিক ব্যবসায়ী তার হাতে লাঞ্ছিত ও মারধরের শিকার হন। পরে ব্যবসায়ীদের তোপের মুখে তিনি পিছু হটেন। তখন মহম্মদপুরের নহাটা বাজারের ব্যবসায়ীরা তার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ সমাবেশ, ঝাঁটা মিছিল ও সংবাদ সম্মেলন করেন।

মহম্মদপুর উপজেলার জোকা গ্রামের সৈয়দ ছদরুদ্দীন জানান, ২০১৮ সালের শেষদিকে তিনি ৬ লাখ টাকা দিয়ে উপজেলা সদরের আলেক শাহ ফকির গংয়ের কাছ থেকে (মহম্মদপুর এসএ ৫৮ নং খতিয়ান) সাড়ে ১২ শতক জমি কেনেন। কিন্তু জমি রেজিস্ট্রি করতে গেলে বাধে বিপত্তি। তৎকালীন এসি (ল্যান্ড) নাজিম উদ্দিন মৌখিকভাবে মালিকানা দাবি করে সাব-রেজিস্ট্রারকে জমি রেজিস্ট্রি করতে নিষেধ করেন। এরপর তাকে দেখা করতে বললে তিনি অফিসে গিয়ে নাজিম উদ্দিনের সঙ্গে দেখা করেন। এ সময় খাজনাসহ সরকারি বিভিন্ন খাত দেখিয়ে তার কাছে ২ লাখ টাকা দাবি করেন নাজিম। ছদরুদ্দীন সরল বিশ্বাসে দেড় লাখ টাকা দিয়ে পুনরায় জমি রেজিস্ট্রির উদ্যোগ নেন। এতে নাজিম উদ্দিন তার ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে জমি বিক্রেতাকে জমিতে যেতে নিষেধ করেন। একই সঙ্গে তিনি (ছদরুদ্দীন) জাল মুক্তিযোদ্ধা সনদের ব্যবসা করেন এমন মিথ্যা অভিযোগে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে সাজা দিতে তাকে ধরতে দলবল নিয়ে তার বাড়িতে হাজির হন নাজিম। না পেয়ে দরজা ভেঙে ঘরে ঢুকে আসবাবপত্র ভাঙচুর করেন।

ছদরুদ্দীন বলেন, ‘এ সময় তিনি (নাজিম) আমার স্ত্রীকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেন। রাজাকারপুত্র নাজিম ঘুষের টাকা দিয়ে যশোরের মনিরামপুর উপজেলা সদরে ও কাশিপুরে নিজ গ্রামে প্রাসাদসম বাড়ি বানিয়েছেন।’

নাজিম উদ্দিনের বিরুদ্ধে অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে মাগুরার জেলা প্রশাসক ড. আশরাফুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিভিন্ন অভিযোগে মহম্মদপুর উপজেলার সাবেক সহকারী কমিশনার (ভূমি) নাজিম উদ্দিনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা ও তদন্ত চলছে।’

অভিযোগ সম্পর্কে মোবাইল ফোনে জানতে চাইলে নাজিম উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মহম্মদপুরে কর্মরত থাকাকালে আমি যা কিছু করেছি সরকারি নিয়মানুযায়ী বৈধভাবে করেছি। সরকারি খাসজমি ব্যক্তিগত দখল থেকে মুক্ত করতে গিয়ে এবং অবৈধ সুযোগ-সুবিধা দিতে না পারায় অনেকের সঙ্গে বিরোধ হয়েছে। সুযোগ পেয়ে তারাই আমার বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ আনছে।’ যশোরে নাজিমের আলিশান বাড়ি, টাকার উৎস নিয়ে প্রশ্ন : কুড়িগ্রামে সাংবাদিক আরিফুলকে নির্যাতনে অভিযুক্ত নাজিম উদ্দিনের বাবার বাড়ি যশোরের মনিরামপুরের দুর্বাডাঙ্গা গ্রামে। তবে তার বাবা প্রয়াত নিছার উদ্দিন একই উপজেলার কাশিপুর গ্রামে শ্বশুরালয়ে ঘরজামাই থাকতেন। যে কারণে কাশিপুরে নানাবাড়িতে বড় হন নাজিম। তার বাবা নিছার উদ্দিন অসুস্থ হয়ে মারা গেছেন বছর তিনেক আগে।

কাশিপুরে নাজিম উদ্দিনের বাড়িতে গিয়ে তার প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। প্রতিবেশীরা জানান, নিছার উদ্দিন অনেক কষ্ট করে এমনকি ইটভাটায় কাজ করে ছেলেকে মানুষ করেছেন। মা মাজেদা বেগমও বাবার বাড়িতে স্বামী-সন্তানদের নিয়ে অনেক কষ্টে সংসার চালিয়েছেন। এমনকি ছেলে নাজিমকে লেখাপড়া করাতে গিয়ে তিনি অন্যের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ পর্যন্ত করেছেন।

এলাকাবাসী জানায়, এক ভাই ও এক বোনের মধ্যে বড় নাজিম কাশিপুরে নানাবাড়িতে থেকে মনিরামপুর সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ে লেখাপড়া করেন। ২০০৪ সালে সেখান থেকে এসএসসি পাস করেন। ছোটবেলা থেকেই তিনি খুব বদমেজাজি আর একরোখা প্রকৃতির ছিলেন। গ্রামে কারও সঙ্গে তেমন একটা মিশতেন না। ২০০৬ সালে মনিরামপুর সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ভর্তি হন। লেখাপড়া শেষ করে কিছুদিন এক্সিম ব্যাংকে চাকরি করেন নাজিম। পরে ২০১৪ সালে ৩৩তম বিসিএস পরীক্ষায় অংশ নিয়ে প্রথমবারেই উত্তীর্ণ হয়ে তিনি নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হন।

এলাকাবাসীর ভাষ্য, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হওয়ার পর থেকেই নাজিম এলাকার কাউকে পাত্তা দিতেন না। কারণে-অকারণে মানুষকে ভয় দেখান। তার ক্ষমতার দাপটে ভয়ে সবাই তটস্থ থাকেন। যে কারণে কেউ নাম প্রকাশ করে নাজিমের সম্পর্কে এ প্রতিবেদকের কাছে কথা বলতে রাজি হচ্ছিলেন না। তবে নাম প্রকাশ করা হবে না বলে আশস্ত করা হলে কয়েকজন নাজিমের সম্পর্কে তথ্য দিতে রাজি হন।

স্থানীয় ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা দাবি করেন, নাজিমের পরিবার আওয়ামী লীগ সমর্থক। তবে সাংবাদিক আরিফুলকে নির্যাতন করে তিনি অন্যায় করেছেন বলে মন্তব্য করেন।

কুড়িগ্রামে সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনায় নাজিমের নাম আলোচনায় আসার পর মনিরামপুরে সাধারণ মানুষের মুখে মুখে এখন ঘুরছে দরিদ্র পরিবারের সন্তান হওয়া সত্ত্বেও অল্পদিনে তার অর্থবিত্তের মালিক হওয়ার বিষয়টি।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নাজিম উদ্দিন ২০১৪ সালে সরকারি চাকরিতে যোগ দেওয়ার তিন-চার মাস পর একই উপজেলার হোগলাডাঙা গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আবদুর রাজ্জাকের মেয়ে সাবিনা সুলতানাকে বিয়ে করেন। আবদুর রাজ্জাক মনিরামপুর শহরের ভগবানপাড়ায় তার নিজের বাড়িতে থাকেন। যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী তার এক ভায়রার সঙ্গে শ্বশুরবাড়ির পাশেই সাড়ে ১৪ লাখ টাকায় কেনা আট শতক জমির ওপরে বিশাল চারতলা বাড়ি নির্মাণ করছেন নাজিম। এছাড়া কাশিপুরে নানার দেওয়া পাঁচ শতক জমির ওপর তিন কক্ষবিশিষ্ট একটি একতলা বাড়ি রয়েছে তার। মাত্র ছয় বছরের চাকরিজীবনে নাজিম কীভাবে এত টাকার মালিক হলেন তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে এলাকাবাসীর মনে। তারা নাজিমের সম্পদের উৎস খতিয়ে দেখতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

নাজিমের নির্মাণাধীন চারতলা বাড়ির ঠিকাদার আতিয়ার রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘২০১৮ সালে হোগলাডাঙা গ্রামের মোসলেম নামে এক লোকের কাছ থেকে সাড়ে ১৪ লাখ টাকায় আট শতক জমি কেনেন নাজিম উদ্দিন ও তার ভায়রা। সেখানে প্রতি ফ্লোরে তিন ইউনিটের চারতলা বাড়ির কাজ চলছে। প্রতি তলা ২ হাজার ৯০০ বর্গফুটের। ১১ মাস আগে কাজ শুরু হয়েছে। বাড়ির শ্রমিক ঠিকাদার আমি। এখন পর্যন্ত অন্তত ৫০ লাখ টাকা খরচ হয়ে গেছে। বাড়িটির কাজ শেষ করতে সবমিলে কমপক্ষে ১ কোটি ২০ লাখ টাকা লাগবে।’

কাশিপুরে নাজিম উদ্দিনের বাড়িতে গিয়ে কথা হয় তার মা মাজেদা বেগমের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘বউমার কাছে শুনিছি, নাজিমের চাকরির স্থানে কী একটা সমস্যা হয়েছে। বিস্তারিত জানি না।’ পরে কুড়িগ্রামে সাংবাদিককে নির্যাতনের বিষয়টি শুনে তিনি বলেন, ‘এটা নাজিম ঠিক করেনি। বাড়ি আসলি আমি তাকে বোঝাব।’

অন্যদিকে নাজিমের স্ত্রী সাবিনা সুলতানা বলেন, ‘গত রবিবার মনিরামপুর বাজারে গিয়ে ঘটনাটি জানতে পারি। নাজিমকে কল করে মোবাইল বন্ধ পাচ্ছিলাম। এরপর নতুন একটা নম্বরে নাজিম কল করেছে। সে বলেছে, একটু ঝামেলা হয়েছে। কোনো সমস্য না। আল্লাহর কাছে দোয়া করতে।’

মনিরামপুর বাজারে নাজিমের বাড়ি করার বিষয়ে জানতে চাইলে সাবিনা বলেন, ‘বাড়ির জমিটা আমাদের দুই বোনকে আব্বা দিয়েছেন। সেখানে আমরা দুই বোন মিলে বাড়ি করছি। আমি একটা ব্যাংক লোন নেওয়ার চেষ্টা করছি। এখন খরচ আমার সেই বোন দিচ্ছেন।’

এর আগে কক্সবাজারে থাকাবস্থায় নাজিমের বিরুদ্ধে এক বৃদ্ধকে মারধরের অভিযোগ ওঠে। কুড়িগ্রামের ঘটনার পর কক্সবাজারের সেই ভিডিও ফেইসবুকে ভাইরাল হয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত