বিশ্বব্যাপী মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাসের প্রকোপ বাড়তে থাকায় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) নির্বাচন এবং বগুড়া-১ ও যশোর-৩ সংসদীয় আসনে উপনির্বাচন স্থগিতের সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।
গতকাল শনিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন কমিশন ভবনে ইসির জ্যেষ্ঠ সচিব মো. আলমগীর এ সিদ্ধান্তের কথা জানান। এর আগে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নুরুল হুদার সভাপতিত্বে কমিশন সভায় এ সিদ্ধান্ত হয়।
বিভিন্ন মহলের দাবি উপেক্ষা করে করোনাভাইরাসের ঝুঁকির মধ্যেই গতকাল ঢাকা-১০, গাইবান্ধা-৩ ও বাগেরহাট-৪ আসনে উপনির্বাচন করে ইসি। এসব নির্বাচনের ভোটগ্রহণ চলার মধ্যে অন্য তিনটি নির্বাচন স্থগিতের ঘোষণা দেয় ইসি। বাংলাদেশে করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগী ধরা পড়ার পরপরই এসব নির্বাচন স্থগিতের দাবি উঠেছিল। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছিল, ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) ভোটগ্রহণের ক্ষেত্রে সংক্রমণের ঝুঁকি আছে। তবে এসব দাবি ও শঙ্কা উপেক্ষা করেই তিনটি সংসদীয় আসনে ভোটগ্রহণে অটল থাকে ইসি।
ইসি সচিব মো. আলমগীর বলেন, ‘আগামী ২৯ মার্চ চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচন, বগুড়া-১ ও যশোর-৬ আসনের উপনির্বাচন রয়েছে। এ ছাড়া কিছু সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন পদে উপনির্বাচন, পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদের সাধারণ বা উপনির্বাচন আছে। সব নির্বাচন আমরা স্থগিত করছি।’ তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে করোনাভাইরাস খুবই সীমিত পর্যায়ে রয়েছে। মহামারী আকারে এখনো ছড়ায়নি। আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। তবে এটা নিয়ে আতঙ্কের কিছু নেই। তবুও নির্বাচন কমিশন সবার স্বাস্থ্যের কথা চিন্তা করে সব নির্বাচন স্থগিত ঘোষণা করেছে। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সব ধরনের নির্বাচন বন্ধ থাকবে। স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে যখন করোনা ঝুঁকিমুক্ত বলা হবে, তখন নির্বাচন কমিশন পরবর্তী সময়ে নির্বাচনের তারিখ নির্ধারণ করবে।’
সাংবিধানিক বিধিবিধানের প্রসঙ্গ টেনে ইসি সচিব বলেন, ‘সংসদ নির্বাচনের ক্ষেত্রে দিন-ক্ষণের বাধ্যবাধকতা আছে। একটি আসন শূন্য হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করতে হয়। সিটি করপোরেশনগুলোর ক্ষেত্রে ১৮০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করতে হয়। আর স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতে এ ধরনের বাধ্যবাধকতা নেই। এ ছাড়া যদি দৈব-দুর্বিপাক হয়, সেক্ষেত্রে আরও ৯০ দিন পর নির্বাচন করার ক্ষমতা দেওয়া আছে প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে। দুই ৯০ দিন যোগ করলে হয় ১৮০ দিন বা ৬ মাস। এতদিন পর্যন্ত করোনাভাইরাস আতঙ্ক হয়ে থাকবে বলে আমি মনে করি না। সবার প্রচেষ্টায় স্বাস্থ্য সচেতনতার মাধ্যমে এবং সারা বিশ্ব যেভাবে করোনা নিয়ে কাজ করছে, এটা হয়তো অল্প সময়ের মধ্যে নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে। আশা করি, নির্বাচন কমিশন সংবিধানের যে সময় আছে, তার মধ্যে সংসদীয় নির্বাচনগুলো করতে পারবে।’
গতকাল অনুষ্ঠিত তিন সংসদীয় আসনের উপনির্বাচন প্রসঙ্গে ইসি সচিব বলেন, ‘এই নির্বাচনের প্রায় সব কাজ সম্পন্ন হয়ে গিয়েছিল। পিছিয়ে আসার কোনো সুযোগ ছিল না। যেটুকু স্বাস্থ্যঝুঁকি ছিল, সেটার জন্য বলা হয়েছিল। স্যানিটাইজার দেওয়া হয়েছে। আমি নিজে বেশ কয়েকটি কেন্দ্র পরিদর্শন করে দেখেছি। যে বিষয়টি আমি সবচেয়ে বেশি দেখেছি, কে ভোট দিতে এসেছেন, কে আসেননি, সেটার চেয়েও যথাযথভাবে হ্যান্ড স্যানিটাইজার দেওয়া হয়েছে কি না, সেটার দিকে।’
মানুষের চাপে নির্বাচন স্থগিত করছেন কি না এমন প্রশ্নের জবাবে সচিব বলেন, ‘কারও চাপে আমরা স্থগিত করিনি। আজকে যেহেতু আরও একজন মারা গেছেন এবং অনেকে আক্রান্ত হয়েছেন, সেজন্য নির্বাচন স্থগিত করা হয়েছে।’ অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হলো কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অংশগ্রহণমূলক বলতে কী বোঝানো হয় জানি না। যারা প্রার্থী তারা যদি অংশগ্রহণ করেন তাহলেই অংশগ্রহণমূলক। ভোটাররা ভোট দিতে যাবেন কি না, সেটা ভোটারদের বিষয়। ভোটারদের বাধ্য করা যাবে না। কোনো আইনেও নেই, বিধানেও নেই। ভোটার তার স্বাধীন ইচ্ছায়, স্বেচ্ছায় ভোট দিতে যাবেন। পৃথিবীর অনেক দেশের সংবিধানে আছে যে, এই পরিমাণ ভোট না পড়লে আবার ভোটগ্রহণ করতে হবে। তবে আমাদের সংবিধানে কোথাও বলা নেই যে, এত শতাংশ ভোট না পড়লে নতুন করে ভোট নিতে হবে। অতএব একটি ভোটও যদি হয়, তাহলে আমরা বলব এটি অংশগ্রহণমূলক হয়েছে।’
ঢাকায় দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত মাত্র ৫ শতাংশ ভোট পড়েছে। এটা নির্বাচন কমিশনের জন্য বিব্রতকর কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন মোটেই বিব্রত নয়। কারণ, এ ঘটনার জন্য নির্বাচন কমিশন দায়ী না। ইসির দায়িত্ব যেটুকু সেটুকু সঠিকভাবে পালন করেছে কি না, সেটা দেখতে হবে।’ যেহেতু ঢাকা-১০ আসনে মাত্র ৫ শতাংশ ভোট পড়েছে সুতরাং একজন প্রার্থী মাত্র ১ থেকে ২ শতাংশ ভোটে কীভাবে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হতে পারেন এমন প্রশ্নে সচিব বলেন, ‘যেহেতু সংবিধানে নিষেধ নেই। সংবিধানে আছে, যিনি বেশি ভোট পাবেন, তিনি নির্বাচিত হবেন। কিন্তু কত শতাংশ ভোট পেলে নির্বাচিত হবেন, এ ধরনের আইন আমাদের দেশে নেই। এ ধরনের আইন করার ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনের কাছে নেই। সংসদ সদস্যরা চাইলে করতে পারবেন।’
অন্য কমিশনের আমলে ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ ভোট পড়েছে। এ কমিশনের আমলে সেটা অনেক কমে গেছে। ইভিএম হলে সেটা আরও কমে যাচ্ছে। এটা কমিশনের প্রতি অনাস্থা কি নাÑ জানতে চাইলে ইসি সচিব বলেন, ‘মোটেই না, এটা কমিশনের সাথে সম্পর্কিত নয়। ইভিএমে ভোট দিলে যেহেতু জাল ভোট দেওয়ার সুযোগ নেই, সেজন্য ভোট কমে যায়।’
জাল ভোট ঠেকাতে পারছেন না কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আপনাকে ধরতে হবে। জাল ভোট ধরে যদি কমিশনের কাছে অভিযোগ না করেন বা না ধরিয়ে দেন, জাল হয়েছে কি না, কীভাবে বুঝব। কারণ, প্রিসাইডিং কর্মকর্তা তো সবাইকে চেনেন না।’
