নির্বাচন কমিশনের অনমনীয়তা কেন

আপডেট : ২৩ মার্চ ২০২০, ১২:২৫ এএম

সারা বিশ্ব যখন করোনাভাইরাস মহামারীতে বিপর্যস্ত এবং বাংলাদেশেও এর সংক্রমণ ঘটছে, ঠিক এরকম একটি মহাদুর্যোগময় পরিস্থিতিতে নির্বাচন কমিশন (ইসি) ঢাকা-১০, গাইবান্ধা-৩ এবং বাগেরহাট-৪ আসনে উপনির্বাচন করল।  এরকম একটি সংকটময় পরিস্থিতিতে এ নির্বাচনগুলো আয়োজন করার পেছনে ইসির অনমনীয় অবস্থান কতটুকু যৌক্তিক, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে।

ঢাকা-১০ আসনের উপনির্বাচনের বেসরকারি ফলে জানা গেছে, ভোট পড়েছে ৫.২৮ শতাংশ, যা এ যাবৎকালের সর্বনিম্ন। ভোটে আওয়ামী লীগের প্রার্থী শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন নৌকা প্রতীকে ১৫ হাজার ৯৯৫ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির প্রার্থী শেখ রবিউল আলম ধানের শীষ প্রতীকে পেয়েছেন ৮১৭ ভোট।  ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে শেখ ফজলে নূর তাপস পদত্যাগ করায় ঢাকা-১০ আসনটি শূন্য হয়। রাজধানীর ধানমন্ডি, নিউ মার্কেট, কলাবাগান, শের-ই বাংলা ও লালবাগ থানা এলাকা নিয়ে গঠিত এ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন ছয়জন প্রার্থী। এ আসনে ভোটার তিন লাখ ২১ হাজার ২৭৫ জন। আর ভোটকেন্দ্র ১১৭টি ও ভোটকক্ষ ৭৭৬টি। 

এই নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার সময় অবস্থা দুর্যোগময় ছিল না।  করোনাভাইরাসে তখন কেউ মারা যাননি। বাংলাদেশে এর প্রাদুর্ভাবও ঘটেনি। কিন্তু অভূতপূর্ব এই সংক্রমণ ব্যাধি গত চার সপ্তাহে গোটা বিশ্ব ল-ভ- করে দিয়েছে। বাংলাদেশেও আক্রান্ত হয়েছে অনেকে। ইতিমধ্যে দেশে এ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে দুজনের মৃত্যু ঘটেছে। বিদেশ থেকে আসা সব মানুষকে বাধ্যতামূলক দুই সপ্তাহের জন্য স্বেচ্ছাবন্দি থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। পর্যটন কেন্দ্র এবং হোটেলগুলো ফাঁকা হয়ে গেছে। বিমান, নৌ ও ট্রেন-বাসে যাত্রীসংখ্যা মারাত্মকভাবে কমে গেছে। শপিং মলগুলো বন্ধ হওয়ার উপক্রম।  এককথায়, জনজীবন হয়ে পড়েছে স্থবির। অনেক করপোরেট অফিস কর্মীদের বাসায় বসে অনলাইনে কাজ করার পরামর্শ দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা গণজমায়েত ও গণসমাবেশ এড়ানোর কথা বলছেন। নানা মহল থেকে দাবি ওঠার পরও এই অবস্থায় নির্বাচন কমিশন কেন ভোটের ব্যাপারে অনমনীয় থাকল, তা বোধগম্য নয়। অবশ্য ইসি ২৯ মার্চ অনুষ্ঠেয় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, বগুড়া-১ ও যশোর-৬ সহ সব নির্বাচন পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত স্থগিত করেছে।

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইইডিসিআর বলেছিল, ইভিএমের মাধ্যমে ভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকি আছে। তারপরও ইভিএম পদ্ধতিতে নির্বাচন কমিশন ঢাকা-১০ আসনের উপনির্বাচন করতেও পিছপা হয়নি। যেখানে লোক সমাগম মানা, নাগরিকদের ঘরে থাকতে অনুরোধ করা হচ্ছে সেখানে এমন মনোভাব সত্যিই বেদনাদায়ক। শুধু স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরির জন্যই নয়, উপস্থিতির বিচারেও এ নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। গণতন্ত্র হলো জনগণের সম্মতির শাসন। একটি সুষ্ঠু, অবাধ, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের এই সম্মতি প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু মাত্র ৫ শতাংশ ভোটে জনগণের সে সম্মতি এলেই প্রতিষ্ঠিত হয় কি না, সে প্রশ্ন থেকেই যায়। আমাদের সংবিধানের ১১৮ অনুচ্ছেদে নির্বাচন কমিশনকে স্বাধীন বলা হয়েছে। এই স্বাধীনতা দেওয়ার উদ্দেশ্য হলো সুষ্ঠু, অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে সুসংহত করা। তাদের দায়িত্ব জনগণের সম্মতির বিষয়টি যথাযথভাবে নিশ্চিত করা এবং জনগণ যাতে উপস্থিত হতে পারে নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য তেমন সময় বেছে নেওয়া।

সারা বিশ্বেই করোনাভাইরাসের কারণে বিশেষ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।  অনেক দেশেই চলছে লকডাউন এবং যেকোনো ধরনের জনাসমাগম নিষিদ্ধ ঘোষিত হচ্ছে। ইংল্যান্ডের স্থানীয় ও মেয়র নির্বাচন আগামী এক বছরের জন্য এই নির্বাচন স্থগিত করা হয়েছে। শ্রীলঙ্কার জাতীয় নির্বাচনও স্থগিত করা হয়েছে। স্পেনের স্থানীয় নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। নির্বাচন কমিশন এ দৃষ্টান্ত অনুসরণ করতে পারত।

এ নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন মানুষের জীবনের ঝুঁকি সৃষ্টি করতেও কুণ্ঠাবোধ করেনি।  গাইবান্ধার সাদুল্লাপুরে ভোটের পরদিন লকডাউন আরও বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে। একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে এ ধরনের একটি জনস্বার্থ পরিপন্থী প্রচেষ্টা আশা করা যায় না। কমিশনের পক্ষ থেকে অজুহাত তোলা হয়েছে, তারা সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতায় ভোটের আয়োজন করেছেন। সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা থাকবেই। কিন্তু জনস্বার্থে বা জননিরাপত্তায় সেই সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতাকে এড়িয়ে যাওয়া যাবে না, এমন নয়। যখন শুধু দেশ নয় পুরো বিশ্ব বিপর্যস্ত, তখন রাষ্ট্রকে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা এই মুহূর্তে মান্য করতেই হবে, এমন নয়। কারণ প্রজাতন্ত্রের সব আইন তো জনগণের জন্যই। তাই জনস্বার্থের বিষয়টি বিবেচনা রেখেই নির্বাচন কমিশনসহ সব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের যে কোনো পদক্ষেপই বাঞ্ছনীয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত