করোনাভাইরাস সংক্রমণের প্রভাবে বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ঝুঁকিতে পড়বেএমন আশঙ্কা প্রকাশ করে বিএনপি এ সংকট মোকাবিলায় সরকারকে ৮৭ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তহবিল গঠনের দাবি জানিয়েছে। গতকাল শনিবার গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ২৭ দফা প্যাকেজ প্রস্তাবনায় এ অর্থ বরাদ্দের কথা তুলে ধরেন।
সংবাদ সম্মেলনে মির্জা ফখরুল বলেন, এমনিতেই দেশের অর্থব্যবস্থা ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। এখন যোগ হয়েছে করোনাভাইরাসের ছোবল। এই মহামারী থেকে বেরুতে হলে সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে হবে। পাশাপাশি গৃহবন্দি কর্মহীন দুস্থ জনগণের মুখে খাবার তুলে দিতে এগিয়ে আসার জন্য দেশের জনহিতৈষী ও বিত্তবানদের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবের কারণে দেশে সম্ভাব্য অর্থনৈতিক প্রভাব ও উত্তরণের কর্মপরিকল্পনা ঘোষণার এক দিন আগে বিএনপি সংবাদ সম্মেলন করে এই প্যাকেজ প্রস্তাবনা তুলে ধরেন। প্রধানমন্ত্রীর আজ রবিবার সকাল ১০টায় গণভবন থেকে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে এই কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করবেন।
সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘ইতিমধ্যে বাংলাদেশ করোনার তৃতীয় স্তরে পৌঁছেছে। অর্থাৎ করোনা এখন কমিউনিটি পর্যায়ে সংক্রমিত হওয়া শুরু হয়েছে। তাই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রদত্ত নীতিমালা অনুযায়ী সবাইকে আরও সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। জাতীয় ও বৈশ্বিক এই মহাদুর্যোগ মোকাবিলায় যেকোনো গঠনমূলক ও কল্যাণমুখী উদ্যোগে শামিল হতে বিএনপি প্রস্তুত রয়েছে। জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে মহান আল্লাহর অশেষ রহমতে আমরা এই মহাদুর্যোগ কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হব, ইনশা-আল্লাহ্।’
তিনি বলেন, ‘সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে সরকারের কাছে যে আর্থিক প্যাকেজ পেশ করা হয়েছে তার অধিকাংশ যুক্তিসংগত। দেশের এই ক্রান্তিকালে ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে সাংবাদিকদের আর্থিক ও অন্য দাবিগুলো সুবিবেচনা মির্জা ফখরুল বলেন, খাদ্য জোগান দিতে দুর্নীতি ও জটিলতা এড়ানোর লক্ষ্যে খাদ্যসামগ্রী না দিয়ে নগদ অর্থ প্রদানই শ্রেয়। স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তায় সামরিক বাহিনী অর্থ বিতরণ করবে। খাদ্য উৎপাদন যেন ব্যাহত না হয় সে দিকে সরকারকে নজর দিতে হবে। আগামী এক বছরের জন্য পোলট্রিসহ সব ধরনের কৃষিঋণের কিস্তি ও সুদ মওকুফ করতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান প্রদত্ত সব ক্ষুদ্রঋণের কিস্তি আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত মওকুফ করতে হবে।
বিএনপি মহাসচিব বলেন, করোনা মোকাবিলার সঙ্গে যারা যুক্ত সেসব ডাক্তার, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের জীবন ঝুঁকির বিবেচনায় জরুরি ভিত্তিতে তাদের স্বাস্থ্যবীমার ব্যবস্থা করতে হবে। আগামী তিন মাসের জন্য প্রতি চিকিৎসকদের জন্য ১ কোটি, নার্সদের জন্য ৭৫ লাখ ও স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য ৫০ লাখ টাকার বীমার বিপরীতে প্রিমিয়াম সরকার বহন করবে। চিকিৎসক, নার্স ও সংশ্লিষ্ট হাসপাতালে করোনা রোগীদের চিকিৎসার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসা সহকারীদের জরুরিভিত্তিতে দ্রুতগতিতে পিপিই, করোনা পরীক্ষার কিট ও আনুষঙ্গিক ওষুধ ও দ্রব্যাদি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। রাজধানী, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে করোনা রোগীদের জন্য পৃথক হাসপাতাল স্থাপন/চিহ্নিতকরণ, পৃথক কোয়ারেন্টাইন, আইসোলেশনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
বিএনপি মহাসচিব বলেন, প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসে বাংলাদেশে মৃত্যুর হার করোনাবিধ্বস্ত ইতালির তুলনায় অনেক বেশি। এদেশে করোনায় মৃত্যুর হার ১০.৪ শতাংশ। অথচ ইতালিতে মৃত্যুর হার ১০.২ শতাংশ। তিনি বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বারংবার তাগিদ সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ সর্বনিম্ন টেস্টিং দেশগুলোর অন্যতম। কোরিয়ায় প্রতি হাজারে যেখানে টেস্ট করেছে ছয়জন, সেখানে বাংলাদেশ প্রতি ১০ লাখে টেস্ট করেছে ছয়জন। এখন পর্যন্ত দেশে করোনা পরীক্ষা কিট নিতান্তই অপ্রতুল। হাসপাতালগুলো পিপিই ও পরীক্ষা কিটের অভাবে সর্দি, কাশি ও শ্বাসকষ্টে আক্রান্তদের চিকিৎসা করছে না। এককথায় সারা দেশে পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে যাতে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ না হয় সেদিকে যথাযথ খেয়াল রাখতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান বিএনপি মহাসচিব। এ সময় তিনি বলেন, করোনাভাইরাসের এই সংকট মুহূর্তে ডেঙ্গু দরজায় কড়া নাড়ছে। ইতিমধ্যে গত বছরের তুলনায় ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে বেশি ভর্তি হচ্ছে। শাটডাউনের কারণে এডিস মশা নিধন কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে পড়েছে।
