বেসরকারি চাকরিজীবী জাহাঙ্গীর আলম। রাজধানীর একটি বিস্কুট কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধি। বেতন সাকুল্যে ২০ হাজার টাকা। তাও নিয়মিত হয় না। এ টাকায় স্ত্রী-সন্তান নিয়ে থাকেন ভাড়া বাসায়। করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের প্রেক্ষাপটে দেশজুড়ে অঘোষিত লকডাউনে নিম্নবিত্তরা সরকারিবেসরকারি সাহায্য-সহযোগিতা পেলেও জাহাঙ্গীর আলমের মতো মধ্যবিত্তদের বড় একটি অংশ হয়ে পড়েছে অসহায়। স্বাভাবিক কাজকর্ম বন্ধ থাকায় তাদের আয়-রোজগার নেই। প্রয়োজনীয় নিত্যপণ্য কিনতে না পারলেও সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্নের ভয়ে কারও কাছে সাহায্য চাইতেও পারছেন না। জাহাঙ্গীর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দুই বছর আগে যে বেতন পেতাম এখনো তাই পাই। কিন্তু এ সময় জিনিসপত্রের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। বাড়িভাড়া বেড়েছে। নুন আনতে পান্তা ফুরানোর সংসার। আমি কার কাছে হাত পাতব? সরকার দেয় ব্যবসায়ীদের। বড়লোকরা দেয় দুস্থদের। মাঝখানে আমাদের মরণ।’ আরও খারাপ অবস্থা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতক শেষ করে দুই বছর আগে ব্যবসা শুরু করা রুবাইয়াৎ মীর শহীদের।
দিনাজপুরে বুটিক হাউজের পাশাপাশি ঢাকার ধানমণ্ডিতে রেস্তোরাঁ ও অনলাইনভিত্তিক পরিবহন সেবা উবারে একটি গাড়ি চলে তার। প্রতি মাসে আয় হতো ৬০-৭০ হাজার টাকা। গত ৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্তের পর ব্যবসায় মন্দাভাব শুরু হয়। এর কয়েক দিন পর নিজ উদ্যোগে বন্ধ করে দেন রেস্তোরাঁ, বুটিক হাউজ ও উবার সেবা। চলতি মাসে ব্যবসা থেকে কোনো আয় না হলেও ব্যয়ের খাতা বন্ধ হয়নি রুবাইয়াতের। দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, ‘পরিবারের ব্যয় আমাকে বহন করতে হয়। ব্যবসা ছাড়া অন্য ইনকাম নেই। কর্মীদের ছুটি দিয়েছি কিন্তু বেতন দিতে হবে। ড্রাইভারকে চালাতে হচ্ছে। দোকান ভাড়া, বাড়িভাড়া, গ্যাস-বিদ্যুৎসহ পূর্বের মাসের চেয়ে এ মাসে খরচ আরও বেড়েছে।
ঋণ যে করব সে উপায়ও নেই, করোনার আতঙ্কে মানুষ পাওনা টাকাও পরিশোধ করছে না।’ নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে আরেক মধ্যবিত্ত স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক পশ্রাসনিক কমর্কর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এপি্েরলর বেতন পাওয়া না পাওয়া নিয়ে প্রায় সবার অনিশ্চয়তা আছে। একই অবস্থা হতে পারে মে মাসেও। এ মাসে আবার রমজান। তখন জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যায়। অর্থাৎ মধ্যবিত্তের ওপর দিয়ে বড় ঝড়টাই বয়ে যাবে। সরকার যা সহযোগিতা দেয় সেগুলোতে বড় ব্যবসায়ীরা ছাড়া কেউ উপকতৃ হয় না। আর দরির্দরা কিছু ত্রাণ পায়। কি ‘মধ্যবিত্ত কী করে চলবে সে চিন্তা রাষ্ট করে না।’ বাংলাদেশে মধ্যবিত্তের সীকতৃ কোনো সংজ্ঞা নেই।
তবে এ বিষয়ে কয়েকটি উন্নয়ন সংস্থার কিছু গাইডলাইন রয়েছে। ২০০৫ সালে বাংলাদেশের অথর্নীতি নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ওই বছরের ক্রয়ক্ষমতার ভিত্তিতে দৈনিক ২ থেকে ২০ ডলার পযর্šÍ যারা খরচ করতে পারে, তাদের মধ্যবিত্ত হিসেবে ধরেছে। যদিও আন্তর্জাতিকভাবে সীকতৃ সংজ্ঞা অনযুায়ী দৈনিক ২ থেকে ১৩ ডলার খরচ করার সক্ষমতা রাখেন তাদের মধ্যবিত্ত বলা হয়। বৈশিক মহামারী করোনাভাইরাসের থাবা বাংলাদেশে গেড়ে বসায় এই মধ্যবিত্তদের অবস্থাও ক্রমে খারাপ হচ্ছে। তরুণ উদ্যোক্তা, মাঝারি ও ক্ষদু ব্যবসায়ী, সরকারিবেসরকারি চাকুের, দোকানদারসহ বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত মধ্যবিত্ত হিসেবে পরিচিতরা করোনাভাইরাসের অন্যতম শিকারে পরিণত হতে চলেছেন। তারা বলছেন, যেকোনো দুের্যাগকালীন পরিস্থিতিতে সরকারি সহায়তা পান উচ্চবিত্ত ও নিম্নবত্তরা। মাঝখানে মধ্যবিত্তদের জন্য কোনো প্রণাদনা নেই। অথচ দব্র্যমল্যূ, বাড়ি-দোকান ভাড়ার ঊধ্বর্গতি, জাতীয় বাজেটে পণ্যের দাম বৃিদ্ধ, সরকারি পরিষেবা গ্যাস, পানি, বিদ্যুৎ, পরিবহনসহ বাড়তি দামের পধ্রান চাপ যায় এই মধ্যবিত্তের ওপর দিয়ে।
২০১৯ সালে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) করা এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ২০১৮ সালে মানুেষর দৈনন্দিন ব্যয় ১০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। বিপরীতে আয় বেড়েছে মাত্র ৪ থেকে ৬ শতাংশ। অর্থাৎ আয় ও ব্যয়ের মধ্যকার ব্যবধান বেড়েছে গড়ে ৬ শতাংশ। সতুরাং ব্যয় বৃিদ্ধর সব সচূকে আগে থেকেই বাড়তি চাপের শিকার হয়ে আছে মধ্যবিত্ত শে্রণ। নতনু করে করোনাভাইরাস আঘাত হানায় এ সংকট আরও গভীর হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভনর্র ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নিম্নবিত্ত মানুেষর মতো মধ্যবিত্তদের সরাসরি সহায়তা দেওয়া কঠিন। করোনায় সবাই ক্ষতিগস্থ হবে। সে বিবেচনায় মধ্যবিত্তদের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক ফ্রি ফিন্যান্সিয়াল ব্যবস্থা করতে পারে। পেশা ভাগ করে সপ্ল সুেদ ঋণ ও বীমার ব্যবস্থা করতে হবে। এছাড়া বেসরকারি সংস্থাগুলোকেও উদ্যোগ নিতে হবে। আমাদের দেশের কোম্পানি নিয়মিত মাসিক বেতন দেয় না।
কি ‘দুের্যাগকালীন সময়ে অন্য দেশের কোম্পানিগুলো আগাম কয়েক মাসের বেতন দেয়। এজন্য সরকারি চাপ লাগবে। সব সময় পরিফট করতে হবে এমন ধারণা সঠিক নয়। ব্যবসা ধ্বংস হয়ে যাওয়ার চেয়ে জিরো পরিফট হলে তো সমস্যা নেই।’ খোঁজ নিয়ে জানা যায়, করোনাভাইরাস সষ্টৃ পরিস্থিতিতে মানবিক কারণে বাসাভাড়া মওকফু অথবা পরে নেওয়ার দাবি উঠলেও ঢাকার বস্তির মালিকরা এরই মধ্যে ভাড়ার জন্য চাপ সৃিষ্ট করেছেন। ১০ তারিখের মধ্যে ভাড়া পরিশোধ করার জন্য মৌখিক নোটিসও দিয়েছেন অধিকাংশ বস্তির মালিক। একই অবস্থা মধ্যবিত্তদেরও। অধিকাংশ বেসরকারি চাকরিজীবী বেতন না পাওয়ার অনিশ্চয়তায় পড়লেও বাড়িভাড়া, নৈমিত্তিক খরচের চাপে রয়েছেন। ছোট ব্যবসায়ীরা দোকান ভাড়া ও কমর্চারীদের বেতন পরিশোধ নিয়ে বিপাকে আছেন।
