করোনাভাইরাসে আক্রান্ত সন্দেহে মাজেদা বেগমকে (৫০) গভীর রাতে জঙ্গলে ফেলে পালিয়ে যায় স্বামী-সন্তান ও স্বজনরা। ‘বাঁচাও বাঁচাও’ বলে চিৎকার করতে থাকেন তিনি। মুহূর্তের মধ্যে জঙ্গলটি লাগোয়া জনবসতিতে ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক। কেউ ওই নারীর কাছে যেতেও সাহস পাচ্ছিলেন না। পরে এলাকাবাসী স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানকে বিষয়টি জানায়। এরপর উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ওই নারীকে উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য অ্যাম্বুলেন্সে ঢাকায় পাঠানো হয়। গত সোমবার রাতে এমনই ঘটনা ঘটেছে টাঙ্গাইলের সখীপুরের গজারিয়া ইউনিয়নের ইছাদিঘি গ্রামে।
মাজেদা বেগমের বাড়ি শেরপুরের নালিতাবাড়ী। তার স্বামী-সন্তান গাজীপুরের সালনায় পোশাক কারখানায় কাজ করেন। স্বামী-সন্তান ও স্বজনরা করোনা সন্দেহে রাতে তাকে জঙ্গলে ফেলে রেখে সকালে বাড়ি নেবে বলে আশ্বাস দিয়ে পালিয়ে যায়। যদিও শেষ পর্যন্ত নমুনা পরীক্ষার ফলাফলে মাজেদা বেগম করোনাভাইরাসে আক্রান্ত নন বলে প্রতিবেদন এসেছে। তিনি বর্তমানে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন।
গজারিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুল মানড়বান মিঞা এবং স্থানীয় ইউপি সদস্য আবুল কালাম আজাদ দেশ রূপান্তরকে জানান, জঙ্গলে অপরিচিত নারীর চেঁচামেচির শব্দ শুনে এলাকাবাসী বিষয়টি তাদের জানালে তারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সখীপুর থানার ওসিকে বিষয়টি অবগত করেন।
জানতে চাইলে সখীপুরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আসমাউল হুসনা লিজা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সোমবার রাত ১টার দিকে পুলিশ সদস্য ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসারসহ আমি ঘটনাস্থলে গিয়ে ওই নারীর পরিচয় জানি। ওই নারীর বাড়ি শেরপুর জেলার নালিতাবাড়ী। তার স্বামী-সন্তান গাজীপুরের সালনায় পোশাক কারখানায় কাজ করেন। তার স্বামী-সন্তান ও স্বজনরা রাতের প্রমাংশের কোনো একসময় করোনা সন্দেহে তাকে ইছাদিঘি এলাকায় একটি বনের ভেতর ফেলে পালিয়ে যায়। তার মধ্যে করোনার উপসর্গ থাকায় রাত ২টার দিকে ঢাকায় পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়।’
মাজেদা বেগমকে উদ্ধারের সময় উপস্থিত ছিলেন সখীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. শাহীনুর আলম। তার বরাত দিয়ে সখীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আবদুস সোবহান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ওই নারীর জ্বর , শ্বাসকষ্ট ও গলা ব্যথা ছিল। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত সন্দেহে রাতেই তাকে অ্যাম্বুলেন্সে ঢাকায় পাঠানো হয়। পরে মঙ্গলবার ভোর ৪টার দিকে তাকে কুয়েত-মৈত্রী হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে তাকে ভর্তি না করায় পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়।’
ঢামেকের একজন কর্মকর্তা গতকাল সন্ধ্যায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জ¦র, সর্দি ও কাশি নিয়ে মাজেদা বেগম বর্তমানে আমাদের হাসপাতালের নতুন ভবনের মেডিসিন ওয়ার্ডে ভর্তি আছেন। তার করোনা পরীক্ষার ফলাফল নেগেটিভ এসেছে। তবে তার আরও কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে। কিন্তু তার দেখভালের জন্য এখন পর্যন্ত কোনো আত্মীয়-স্বজন হাসপাতালে আসেনি।’
মাজেদা বেগম এক ছেলে, দুই মেয়ে ও জামাতাকে নিয়ে গাজীপুরের সালনায় একটি ভাড়া বাসায় থাকতেন। সন্তানরা পোশাক কারখানায় চাকরি করেন। আর সবার জন্য রানড়বার দায়িত্ব ছিল মাজেদার ওপর। কয়েক দিন আগে তার জ্বর, সর্দি ও কাশি শুরু হলে আশপাশের বাসার লোকজন তাদের তাড়িয়ে দেয়। ওই অবস্থায় সোমবার মাকে সঙ্গে নিয়ে একটি পিকআপ ভাড়া করে নালিতাবাড়ীর উদ্দেশে রওনা হয় সন্তানরা। পথে সখীপুরের জঙ্গলে মাকে ফেলে রেখে তারা পালিয়ে যায়।
