আলবেয়ার কামু তার বিখ্যাত ‘দি প্লেগ’ উপন্যাসে লিখেছিলেন ‘বারবার মানুষকে খুব অবাক করে দিয়ে হঠাৎ উপস্থিত হয় যুদ্ধ আর মহামারী’। যুদ্ধের কারণ গোপন বা অপ্রকাশ্য নয়, একেবারে প্রকাশ্য ও স্পষ্ট। সামনে দেখা যায় রাজনৈতিক ও সামরিক কারণ। আর একটু গভীরে তাকালেই দেখতে পাওয়া যায় অধিকাংশ যুদ্ধেরই মূল বিষয়টা অর্থনৈতিক। কেবল দুই বিশ্বযুদ্ধ নয়, অধিকাংশ যুদ্ধ ও যুদ্ধচেষ্টার পেছনে রয়েছে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক স্বার্থ; দখলদারিত্বের মধ্য দিয়ে বাজার সম্প্রসারণ; পুঁজির মুনাফার নতুন ক্ষেত্রের বিস্তৃতি। এই যুদ্ধের প্রতিপক্ষ খুবই স্পষ্ট, খুবই নির্দিষ্ট।
মহামারীর বিষয়টি এক রকম নয়। প্রতিপক্ষ অনেকটাই অদৃশ্য, ধরাছোঁয়ার বাইরে, অনেক অনুসন্ধান আর গবেষণার মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে জীবাণু আকারে সক্রিয় ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অণুজীবের সন্ধান করতে হয়। প্রথমদিকে এটা অমাবস্যার অন্ধকারে কালো বিড়াল খোঁজার মতো। মানুষ তার অস্তিত্বের জন্যই অনুসন্ধিৎসু মন নিয়ে নানা গবেষণা আর পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে মহামারীর উৎস এসব কালো বিড়াল খুঁজে বের করেছে। নানান নাম দিয়ে এসব জীবাণুর বিরুদ্ধে প্রতিষেধক, প্রতিরক্ষাব্যূহ তৈরি করেছে। উন্নয়ন, অগ্রগতি আর সভ্যতার নামে মানুষ যত এগিয়ে থাকার, বিকশিত হওয়ার ঘোষণা দিচ্ছে, ততই নির্দিষ্ট সময় পরপর তাদের নতুন নতুন মহামারী, জীবাণুশত্রুকে মোকাবিলা করতে হচ্ছে। একটার নিয়ন্ত্রণ বা বিনাশ না হতেই আরেকটা এসে হাজির হচ্ছে। এই নিরন্তর যুদ্ধ সভ্যতাকে থমকে দিচ্ছে, উন্নয়ন আর অগ্রগতিকে কখনো কখনো সাপ-লুডুর মতো ৯৯ থেকে ২০, ১০ বা শূন্যতে নামিয়ে আনছে। এসব মহামারী বা জীবাণু সংক্রমণ সমগ্র উন্নয়ন আর অগ্রগতির স্ব-বিরোধিতাকে প্রবলভাবে সামনে নিয়ে আসছে। এই করপোরেট সভ্যতার অভ্যন্তরীণ দুর্বলতাকে মারাত্মকভাবে তুলে ধরছে। যে প্রক্রিয়া-পদ্ধতিতে এই উন্নয়ন এখন তার আত্মবিনাশী চরিত্র-বৈশিষ্ট্য গুরুতরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হতে শুরু করেছে। প্রশ্ন উঠেছে এই উন্নয়নের নীতি, দর্শন আর কৌশল নিয়ে। হাজারো জিজ্ঞাসা তৈরি হয়েছে একালের মানুষের দৈনন্দিন জীবন, আচরণ, খাদ্যাভ্যাস প্রভৃতি নানা বিষয় নিয়ে।
করোনা মহামারী রাষ্ট্র ও সরকারের অগ্রাধিকারের গুরুত্বপূর্ণ ও জরুরি প্রশ্নসমূহকে বড় আকারে সামনে নিয়ে এসেছে। কথিত মুক্তবাজার অর্থনীতি বা নিছক মুনাফানির্ভর করপোরেট অর্থনীতি যে মহামারী বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে মানুষকে সুরক্ষা দিতে পারছে না, তার সামাজিক, অর্থনৈতিক, এমনকি জীবনের ওপর তার প্রাথমিক ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে পারছে না, এবার করোনা দুর্যোগে তা আবার প্রমাণিত হলো। কোনো কোনো রোগব্যাধি বা অসুস্থতার শ্রেণি পক্ষপাত বা শ্রেণি-সম্পৃক্ততার বিষয় নিয়ে নানা আলোচনা থাকলেও স্পষ্টতই করোনাভাইরাস, কভিড-১৯-এর মতো মহামারীগুলোর বিশেষ শ্রেণি পক্ষপাত দেখা যাচ্ছে না। করোনাভাইরাসকে রস করে ‘সাম্যবাদী ভাইরাস’ হিসেবেও আখ্যায়িত করা হচ্ছে। সব ধরনের নজরদারি, নিয়ন্ত্রণ ও সংরক্ষণবাদী নীতি-কৌশলকে কাঁচকলা দেখিয়ে করোনাভাইরাস আন্তঃমহাদেশীয় স্তরে সংক্রমণের বিস্তার ঘটিয়ে চলেছে। এই ভাইরাস জাতি, ধর্ম, বর্ণ, শ্রেণি, লিঙ্গ নির্বিশেষে সবাইকে সংক্রমিত করছে। যে কারণে এ ধরনের ভাইরাস সম্পর্কে কোনো রাষ্ট্র বা সরকারের নিস্পৃহ থাকার অবকাশ নেই। আশঙ্কা হচ্ছে পুরো উন্নয়ন-দর্শন, জীবনযাত্রা ও খাদ্যাভ্যাসের গুণগত রূপান্তর ব্যতিরেকে ভবিষ্যতে মাঝেমধ্যেই বিশ্বের দেশ ও অঞ্চল নির্বিশেষে মানুষকে এ ধরনের মহামারীর সম্মুখীন হতে হবে।
করোনা মহামারীর এবারকার এক গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা হচ্ছে গণস্বাস্থ্যব্যবস্থা যেখানে যত এগিয়ে বা স্বাস্থ্যব্যবস্থায় রাষ্ট্রের ভূমিকা যেখানে যত শক্তিশালী, তারা তত দ্রুত এই সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের মধ্যে এনে মানুষকে বাঁচাতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পেরেছে। এ কারণে চীন, ভিয়েতনাম ছাড়াও দক্ষিণ কোরিয়া ও জার্মানি সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে তুলনামূলক সাফল্য দেখাতে পেরেছে। করোনা মোকাবিলায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শোচনীয় অবস্থার একটি বড় কারণ বোধ করি এখানে নিহিত। খাদ্য, শিক্ষা, চিকিৎসার মতো সামাজিক নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রসমূহকে মুনাফার বাজারের ওপর ছেড়ে দিলে যে মহামারী বা প্রাকৃতিক বড় কোনো দুর্যোগে মানুষকে রক্ষা করা যায় না, করোনা মহামারী আবার তা প্রমাণ করেছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় আবার রাষ্ট্রকেই মিলিয়ন, বিলিয়ন বা ট্রিলিয়ন ডলারের জরুরি অর্থনৈতিক প্যাকেজ ঘোষণা করে যুদ্ধকালীন আয়োজনে নেমে পড়তে হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্প প্রশাসন বহুল আলোচিত ‘ওবামা হেলথ কেয়ার’ কর্মসূচি বাতিল করলেও বা আগামী মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট-দলীয় অন্যতম প্রার্থী বার্নি স্যান্ডার্সের ‘সবার জন্য স্বাস্থ্য’ সুরক্ষার দাবি সম্পর্কে নানা তির্যক মন্তব্য সত্ত্বেও এখন বাধ্য হয়ে ঘোরাপথে জরুরি চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য খাতে তাকে আরও বহু গুণ বরাদ্দ দিতে হচ্ছে। এই ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর অবস্থা আরও শোচনীয়। আবহাওয়া, এই অঞ্চলে মিউটেশনের মধ্য দিয়ে আসা করোনাভাইরাসের জিনগত পরিবর্তন, এসব অঞ্চলের মানুষের তুলনামূলক ইমিউনিটি ক্ষমতা প্রভৃতি কথিত কারণে করোনা মহামারী এখনো দক্ষিণ এশিয়ার এই অঞ্চলে ভয়ানক আকারে সংক্রমিত না হলেও সত্যি সত্যি যদি এখানে মারাত্মক রূপ নেয়, তাকে প্রতিরোধ বা নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা এতদাঞ্চলের রাষ্ট্র ও সরকারসমূহের নেই। বাংলাদেশসহ এই অঞ্চলের দেশগুলোতে গণস্বাস্থ্য সুরক্ষাব্যবস্থা বা কার্যকর স্বাস্থ্যগত নিরাপত্তা বলতে বাস্তবে কিছু নেই। করোনা সংক্রমণের মাত্র কদিনেই বাংলাদেশের স্বাস্থ্য-চিকিৎসাব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। প্রতিদিন তার বেহাল দশা দেখা যাচ্ছে। করোনা আতঙ্কের শুরুতেই অধিকাংশ বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার বন্ধ, ডাক্তার-নার্সরা অনুপস্থিত, সাধারণ বা জটিল রোগের নিয়মিত চিকিৎসাসেবাও একেবারে সীমিত হয়ে যাওয়ার মধ্যে এটা স্পষ্টতই বোঝা গেছে।
করোনার মতো মহামারী মোকাবিলায় আমাদের অবস্থা যে কত নাজুক ও ভঙ্গুর গত দু-তিন মাসে তা খুব খারাপভাবেই ধরা পড়েছে। মাথাপিছু ডাক্তারের সংখ্যার আর বাজেট বরাদ্দের দিক থেকে আমাদের অবস্থা শোচনীয়। মাথাপিছু ডাক্তারের সংখ্যা আর স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বরাদ্দের দিক থেকে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ সবচেয়ে পিছিয়ে। এখানে প্রতি এক হাজারজনের জন্য রয়েছে ০.৫ জন ডাক্তার, নেপালে এই সংখ্যা ০.৭, ভারতে ০.৮, পাকিস্তান এবং শ্রীলঙ্কায় ১.০ জন। আর বাংলাদেশের জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ গত অর্থবছরে ছিল ৬.৭২ শতাংশ; বর্তমান বাজেটে তা ৬.৫২ শতাংশ করা হয়েছে।
কয়েক সপ্তাহ ধরে গণমাধ্যম প্রতিদিন করোনা উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা প্রচার করছে। এই সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। কিন্তু পরীক্ষার ব্যবস্থা এখনো আশানুরূপ হারে এখনো বাড়াতে পারছে না রোগতত্ত্ববিষয়ক সরকারি সংস্থা আইইডিসিআর। এ কারণে দেশে প্রকৃত অর্থে করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা এবং করোনায় মৃত্যুর সংখ্যা নিয়েও জনমনে সরকারের ‘তথ্য গোপন করার’ বিষয়ে বড়সড় অভিযোগও রয়েছে। এই পরিস্থিতি বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের মতো দেশগুলো কীভাবে সামাল দেবে বা কীভাবে কত প্রাণের বিনিময়ে এই মহামারীর সংক্রমণ থেকে বেরিয়ে আসবে, তা এখনো অজানা। কিন্তু এটা স্পষ্ট, এখানে টেকসই, কার্যকর ও আধুনিক গণস্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা ছাড়া আমাদের কোনো গত্যন্তর নেই; দেশের ১৭ কোটি মানুষের প্রত্যেককে এই গণস্বাস্থ্য ও চিকিৎসাব্যবস্থার মধ্যে নিয়ে আসার কোনো বিকল্প নেই। এখনকার মুনাফাকেন্দ্রিক, বিশৃঙ্খল, জবাবদিহিহীন ও স্বেচ্ছাচারী প্রশাসনের ওপর চিকিৎসাব্যবস্থায় আস্থা ফেরারও কোনো অবকাশ নেই।
করোনা সংক্রমণের স্বাস্থ্যগত সংকট ইতিমধ্যে অর্থনৈতিক সংকটে পর্যবসিত হয়েছে। শ্রমজীবী-মেহনতি, দিনমজুর, বস্তিবাসীসহ দিন এনে দিন খেয়ে চলা দেশের এক-তৃতীয়াংশ মানুষ ইতিমধ্যে গুরুতর বিপর্যয়ের সম্মুখীন। এখন তাদের কাজ নেই, আয় নেই, খাদ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কেনার সামর্থ্য নেই। তাদের অধিকাংশেরই সঞ্চয় বলে কিছু নেই। তাদের বড় অংশেরই দুবেলা খাওয়ার সামর্থ্য নেই, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচি, ১০ টাকা দরে চাল বিক্রি বা ত্রাণ তৎপরতা থেকে এই মানুষদের ৬০-৭০ শতাংশ এখনো বঞ্চিত।
এই হতদরিদ্র বিশাল জনগোষ্ঠীর কাছে অনতিবিলম্বে বিশেষ ব্যবস্থায় খাদ্যসামগ্রী ও টাকা পৌঁছাতে না পারলে তাদের বেঁচে থাকা যেমন অনিশ্চিত হয়ে পড়বে, তেমনি করোনাভাইরাসের সামাজিক সংক্রমণ রোধে তাদের ঘরে ধরে রাখার প্রচেষ্টাও যে কোনো কাজে আসবে না, তা ইতিমধ্যেই প্রমাণ হয়েছে। সরকার থেকে নানাভাবে আশ্বস্ত করা হচ্ছে, দেশে কোনো খাদ্যসংকট নেই। কিন্তু এই খাদ্যের ওপর শ্রমজীবী-দিনমজুরদের যদি অধিকার না থাকে বা তাদের যদি খাদ্যসামগ্রী কেনার সামর্থ্য না থাকে, তাহলে দুর্ভিক্ষ অবস্থা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা একেবারে অমূলক নয়। করোনা সংক্রমণজনিত মহামারী অবস্থা দীর্ঘায়িত হলে এই আশঙ্কা বাড়তে থাকবে।
ভবিষ্যতেও বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অবকাশ আছে। তার জন্য প্রথম প্রয়োজন হচ্ছে সরকারের বিদ্যমান নীতি-দর্শন-চিন্তা ও অগ্রাধিকারের পরিবর্তন। বাংলাদেশ যদি এখন খাদ্যশস্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে থাকে (সরকার থেকে এ পর্যন্ত তাই বলা হচ্ছে), তাহলে সেই খাদ্য হয় বিনামূল্যে, না হলে একেবারে স্বল্পমূল্যে দেশের প্রতিটি শ্রমজীবী-দিনমজুর ও স্বল্প আয়ের মানুষের কাছে পৌঁছানো নিশ্চিত করা; শহর ও গ্রামাঞ্চলে এসব পরিবারের জন্য রেশনব্যবস্থা চালু করা এবং নিদেনপক্ষে আগামী ছয় মাস তা চালু রাখা। প্রবল রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে তার বাস্তবায়নও অসম্ভব নয়। এই ব্যাপারে রাজনৈতিক দল, স্থানীয় সরকার, জনপ্রতিনিধি, শ্রেণি-পেশার নেতা ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে সমন্বয় কমিটি এবং তাদের তত্ত্বাবধানে সব পর্যায়ে গণতদারকি কমিটি করা যেতে পারে। সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও এই ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। এই বিরাট কর্মযজ্ঞের সাফল্যের মধ্য দিয়ে আমরা যেমন করোনাসৃষ্ট সংকট কাটিয়ে উঠতে পারব, তেমনি দুর্যোগ মোকাবিলায় আমাদের ঐক্যবদ্ধ শক্তি ও সম্ভাবনার দ্বারও উন্মোচন করতে পারব।
লেখক
সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি
