দেশে করোনাভাইরাস ছড়াতে শুরু করার সময় থেকেই নানা কারণে বিভিন্ন দেশ থেকে ফেরা প্রবাসী শ্রমিকরা বারবার আলোচনায় এসেছেন। যথাযথ স্বাস্থ্য পরীক্ষা ছাড়াই বিপুলসংখ্যক প্রবাসীর দেশে প্রবেশ করা এবং দেশে ফিরে নিয়ম মেনে দুই সপ্তাহের হোম কোয়ারেন্টাইন না মানা নিয়ে শুরুর দিকে অনেক সমালোচনাও হয়েছে। এমনকি দেশে ফেরা প্রায় ৪০ হাজার প্রবাসীকে নিজ ঠিকানায় খুঁজে না পাওয়া নিয়েও প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে সংবাদমাধ্যমে। এসব আলোচনার তুলনায় দেশে ফেরা প্রবাসী শ্রমিকদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা এবং প্রবাসে দেশের শ্রমবাজার ধরে রাখা নিয়ে আলোচনা তেমন একটা সামনে আসেনি। এখন করোনা মহামারীতে বিশ্বব্যাপী বদলে যাওয়া অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে দেশে ফেরা এবং বিদেশে অবস্থানরত উভয় দলের প্রবাসী শ্রমিকদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষার প্রশ্ন খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এ বিষয়ে তাই বিশদ পর্যালোচনা এবং বিশেষ উদ্যোগ জরুরি।
অর্থনীতির বিশ্লেষকরা বলছেন, করোনার কারণে যে বৈশ্বিক মন্দার আশঙ্কা করা হচ্ছে তাতে দুনিয়াজুড়ে বিপুলসংখ্যক অভিবাসী শ্রমিক কাজ হারাতে পারেন। বৈদেশিক জনশক্তি রপ্তানিকারকদের সংগঠন বায়রার মতে, বাংলাদেশের প্রবাসী শ্রমিকদের সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ। এদের একটি বড় অংশই চুক্তিভিত্তিক কাজ করে। এ ছাড়া আরও কয়েক লাখ শ্রমিকের যাদের বৈধ কাগজপত্র নেই। তারা দৈনিক ভিত্তিতে কাজ করেন। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে প্রায় ৫০ লাখ প্রবাসী কাজ করেন। গত বছরও বিদেশে যাওয়া কর্মীদের মধ্যে প্রায় ৯০ শতাংশ গেছেন মধ্যপ্রাচ্যে। মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে সবচেয়ে বেশি প্রবাসী থাকে মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, মালদ্বীপ ও ইতালিতে। সব কটি দেশই করোনাভাইরাসে উপদ্রুত। সবাই গৃহবন্দি হয়ে আছে। ছোট আকারের বিভিন্ন ব্যবসার সঙ্গে যারা জড়িত, তারা পুঁজি হারানোর শঙ্কায় আছেন। আর এই লকডাউন পরিস্থিতিতে নির্দিষ্ট বেতনের বাইরে চুক্তিভিত্তিক ও দৈনিক মজুরিতে কাজ করা প্রবাসী শ্রমিকরা সবচেয়ে বেশি দুর্দশায় পড়েছেন। সব মিলিয়ে সামনে বড় ধরনের সংকটে পড়ার শঙ্কায় আছেন তারা। একই সঙ্গে বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন দেশে ফেরা প্রবাসীদের কথাও। করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার পর সরকারি পরিসংখ্যান অনুসারেই বিভিন্ন দেশ থেকে ফিরে এসেছেন সোয়া ৬ লাখের বেশি প্রবাসী শ্রমিক। তারা কবে কর্মক্ষেত্রে ফিরে যেতে পারবেন কিংবা সবাই আদৌ ফিরতে পারবেন কি না সেটাও অনিশ্চিত।
বিদ্যমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের তরফ থেকে বেশকিছু উদ্যোগের কথা শোনা গেলেও প্রবাসী শ্রমিকদের সুরক্ষায় এখনো কোনো স্পষ্ট রূপরেখা দেখা যাচ্ছে না। কদিন আগে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্রাথমিকভাবে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তহবিল থেকে ২০০ কোটি টাকার একটি বিশেষ তহবিল করা হয়েছে প্রবাসীদের সহায়তায়। এই তহবিল থেকে প্রবাসীদের সর্বোচ্চ চার শতাংশ সুদে দুই থেকে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ দেওয়া হবে। এক থেকে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ নিতে কোনো জামানত লাগবে না বলেও প্রস্তাব রেখেছে মন্ত্রণালয়। কিন্তু এই তহবিল যেমন পর্যাপ্ত নয় তেমনি এই ঋণ কীভাবে এবং কবে থেকে বিতরণ করা হবে সেটিও স্পষ্টভাবে জানায়নি মন্ত্রণালয়। অন্যদিকে, এখনো বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত প্রবাসীদের সহযোগিতার জন্য দূতাবাসগুলো কাজ করছে বলে জানা গেছে। মধ্যপ্রাচ্যের কিছু দেশে আটকেপড়া দুস্থ প্রবাসীদের জরুরি খাদ্য সহায়তারও খবর পাওয়া গেছে। কিন্তু প্রবাসে বাংলাদেশি কর্মীদের সুরক্ষার জন্য সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক তৎপরতা আরও বাড়ানো জরুরি। এক্ষেত্রে ইসলামি সহযোগিতা সংস্থা-ওআইসির পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বিশেষ সভায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আবদুল মোমেন যে অনুরোধ জানিয়েছেন তা উল্লেখযোগ্য। অভিবাসী শ্রমিক, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য এবং ওআইসিভুক্ত দেশে যেসব শ্রমিক কাজ করেন তাদের চাকরি বজায় রাখার নিশ্চয়তা দিতে সদস্যরাষ্ট্রগুলোকে অনুরোধ করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
দীর্ঘদিন ধরে দেশের অর্থনীতির চাকা ঘোরাতে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে যাচ্ছে। আজ বিশ্বজনীন করোনা মহামারীর এই সংকটকালে দেশে-বিদেশে অবস্থানরত প্রবাসীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার বিষয়টি অবশ্যই অগ্রাধিকার দাবি করে। তাই দেশে ফেরা অভিবাসী শ্রমিকদের যেমন সহায়তা দেওয়ার উপায় খুঁজতে হবে, তেমনি প্রবাসে শ্রমবাজার ধরে রাখা এবং ভবিষ্যতের জন্য নতুন শ্রমবাজার খোঁজার কাজেও মনোযোগ দিতে হবে। যারা দেশে ফিরে এসেছেন তাদের, প্রবাসীদের পাঠানো অর্থে প্রতিষ্ঠিত ‘প্রবাসী কল্যাণ ফান্ড’ থেকে এককালীন নগদ সহায়তা দেওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে তাদের নিবন্ধিত করে ডেটাবেইস করতে হবে। নিবন্ধিতদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে দ্রুত কর্মস্থলে যেতে সাহায্য করতে হবে। সে সময় তাদের এককালীন ভ্রমণ-সহায়তা দেওয়া যায়। আর সরকার যে স্বল্পমেয়াদি ঋণ সুবিধা দেওয়ার কথা বলছে তা আরও বাড়ানো প্রয়োজন।
