পৃথিবীর বেশির ভাগ মুসলমানরা আজ থেকে রমজান মাস পালন শুরু করবেন। রমজান মূলত আলাদা একটা জীবনযাত্রা। সংযম ও মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চর্চা। একটা ঘোর। ঘনঘোর। এই ঘোরে পৃথিবীর বেশ কিছু দেশের ব্যবসায়ীরা দ্রব্যমূল্যের দাম কমিয়ে দেয়। জীবনযাত্রা সহজ রাখতে সাহায্য করে। কিন্তু বাংলাদেশে এর প্রেক্ষাপট সব সময় ভিন্ন। বেশির ভাগ মানুষ মুসলিম হলেও এই দেশে রমজান এলেই নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বেড়ে যায়। শ্রমিকেরা বেতন না পেয়ে রাস্তায় নামেন।
তবে নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ এড়াতে এবার অন্যরকম রমজানের দেখা মিলছে; এটুকু নিশ্চিত। এবার প্রায় সব মুসলমান কঠোর বিধিনিষেধের মধ্য দিয়ে রোজা পালন করবেন। এ রকম রমজান এর আগে কখনো দেখা যায়নি। রোজায় পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মসজিদে ইফতার করার চল আছে। নানা শ্রেণি পেশার মানুষ সেখানে এক হন। এবারই প্রথম দৃশ্যটা দেখা যাবে না। ইফতার খেতে আত্মীয়-স্বজনরা বাসায় আসবে না। তারাবির নামাজ পড়তে বাচ্চারা মসজিদে ভিড় করবে না।

এর মধ্যে রমজান উপলক্ষে বেশ কিছু সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে সৌদি আরব। পবিত্র নগরী মক্কা-মদিনার মসজিদুল হারাম এবং মসজিদে নববীতে তারাবি নামাজের অনুমতি দিয়েছে। তবে সাধারণ নামাজিরা এতে অংশ নিতে পারবে না। শুধু ইমাম, মুয়াজ্জিন, স্টাফ ও নির্ধারিত ব্যক্তিরা নামাজে অংশ নেবেন। দুই মসজিদের জেনারেল প্রেসিডেন্সি জানিয়েছে, এবার ২০ রাকাতের পরিবর্তে ১০ রাকাত করে তারাবির নামাজ আদায় করা হবে। শুধু তাই নয়—দুই মসজিদে ইতিকাফও স্থগিত করেছেন তারা। তবে পুরো দেশের মসজিদে নিয়মিত জামাত ও তারাবি বন্ধ থাকবে।
করোনাভাইরাসের কারণে সৌদি আরবের বিভিন্ন শহরে কারফিউ জারি করা হয়েছে। রমজানে সাধারণ মানুষের কেনাকাটার ব্যাপার থাকে—সে জন্য কারফিউ কিছুটা শিথিল করা হয়েছে। তবে অন্য মুসলিম দেশগুলো বিধি-নিষেধে ছাড় দিচ্ছে না। ইরানে জনগণকে জামাতে নামাজ না পড়ার কথা বলেছেন দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি। ইন্দোনেশিয়ায় ঈদে নাগরিকদের বাড়ি ফেরায় নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে। সবার আগে দেশটি সিদ্ধান্ত নেয় রোজার সব ধরনের কর্মকাণ্ডে ঘরে পালন করার। এর মধ্যে সৌদি আরবের গ্র্যান্ড মুফতি ঈদের নামাজও বাড়িতে পড়ার কথা বলেছেন।

মুসলিম বিশ্বে জেরুজালেমের আল আকসা মসজিদ অন্যরকম গুরুত্ব বহন করে। এবার এই মসজিদে পাঁচ ওয়াক্ত আজান দেওয়া হবে। কিন্তু নামাজ পড়ার সুযোগ থাকবে না। ব্যতিক্রম শুধু একটা দেশ—পাকিস্তান। তারা তারাবি নামাজের অনুমোদন দিয়েছে। তবে শর্ত রেখেছে, নামাজিদের একজনের সঙ্গে আরেকজনের ছয় ফুট দূরত্ব রাখতে হবে। এ নিয়ে দেশটিতে মুখোমুখি আলেম সমাজ ও চিকিৎসকেরা।সেখানকার শীর্ষস্থানীয় চিকিৎসকেরা এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছেন। তাদের আশঙ্কা রমজানে সবাই মসজিদে সমবেত হলে করোনাভাইরাসের বিস্তার এতটাই বেড়ে যেতে পারে, যেটা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়বে।
বাংলাদেশেও তারাবির অনুমতি দেয়া হয়েছে। তবে এতে অংশ নিতে পারবে ১২ জন মুসল্লি, যাতে থাকবেন ইমাম-মুয়াজ্জিন-মসজিদকর্মীরাও। নিয়মিত জামাত ও জুমা তো এরচেয়ে কম সংখ্যক মানুষ নিয়ে হয়ে আসছে বেশ কিছু দিন ধরে। তারাবিতে মুসল্লির সংখ্যাটা বাড়ল।
ঈদের জামাত নিয়ে এখনও সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি। তবে এটুকু নিশ্চিতভাবে বলা যায়, তথ্যপ্রযুক্তি ধর্মচর্চার বেশ কিছু দুয়ার খুলে দিয়েছে। যুক্তরাজ্যে মসজিদগুলো নামাজ, খুতবা লাইভ স্ট্রিমিং করবে। বাংলাদেশেও এই কথা বলেছেন অনেকে। সব মিলিয়ে এবারের রমজান তার পরিচিত জৌলুস হারাচ্ছে ঠিকই।

রোজাতে সহমর্মিতা, সৌহার্দ্য ও বন্ধুত্বের যে নিদর্শন দেখা যায় তাতে ভালোভাবেই করোনার ছাপ পড়বে। রোজাতে বাংলাদেশের বহুল আলোচিত ইফতার সংস্কৃতি। ইফতারের সময় পরিবার, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, চেনা-অচেনা মানুষের সঙ্গে দেখা হওয়া, একসঙ্গে রোজা ভাঙা— সেটিতে ছেদ পড়বে। তারাবির নামাজের পর কমবয়সী ছেলেদের পাড়া-মহল্লায় ঘুরাঘুরিও থাকবে না। ভার্চুয়ালি সেসবই সেরে নেবেন সবাই। খাবারের ছবিতে ছবিতে ভরে যাওয়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইফতার পার্টির আমেজ দেখা যাবে। তবে এতে ঝামেলায় পড়বে অসহায় মানুষেরা, ইফতারের সময় ঘরে ঘরে গিয়ে খাবার সংগ্রহ করতে পারবে না। মসজিদে গণইফতারও বন্ধ হয়ে যাবে। এমনিতে অনেক মানুষ করোনা সংকটে খাদ্য অভাবে ভুগছেন। রোজাতে সেটি আরও প্রকট হয়ে উঠতে পারে।
দেশে অনেক মানুষ না খেয়ে থাকলেও এমন অনেককে দেখা যাবে ঈদের পোশাক নিয়ে বেশ উত্তেজিত। সাধারণ ছুটির বাড়তে থাকলে মার্কেটগুলোর তালা খুলবে না ঈদের আগ পর্যন্ত। দেখা যাবে ঈদের নামাজ ঘরে পড়ার সিদ্ধান্ত আসলেও অনেক মানুষ ঈদের পোশাক সংগ্রহে ব্যস্ত হয়ে পড়বেন। রোজার শুরু থেকেই কোনো কোনো সাইট অনলাইনে পোশাকের মেলা বসিয়ে দিতে পারে। সব মিলিয়ে প্রথমবারের মতো একটি ভার্চুয়াল রমজান এগিয়ে আসছে আমাদের দিকে।
