ডিসেম্বর পর্যন্ত সুদ মওকুফ চান শিল্পোদ্যোক্তারা

আপডেট : ২৭ এপ্রিল ২০২০, ০৫:১১ এএম

দেশের ইস্পাত খাতের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান বিএসআরএম গ্রুপ। এই গ্রুপের দুই প্রতিষ্ঠান বিএসআরএম লিমিটেড ও বিএসআরএম স্টিলস লিমিটেড। বর্তমানে এ দুই কোম্পানির ব্যাংক ঋণ রয়েছে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা। প্রতি তিন মাসে ব্যাংক ঋণের সুদবাবদ প্রায় ১৩০ কোটি টাকা পরিশোধের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এ সময়ে কর্মীদের বেতনভাতা ও ঋণের সুদবাবদ প্রায় ২০০ কোটি টাকা ব্যয় হয় এ দুই কোম্পানির। কিন্তু করোনাভাইরাসের মহামারীর প্রভাবে উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়েছে। পণ্য বিক্রিও নেমে গেছে শূন্যের কোটায়। কোনো আয় না থাকলেও ঋণের সুদ ও কর্মীদের বেতনভাতা বহন করতে হচ্ছে কোম্পানিগুলোকে।

শুধু বিএসআরএম গ্রুপ নয়, এমন পরিস্থিতি দেশের অধিকাংশ শিল্প প্রতিষ্ঠানের। ইস্পাত শিল্প খাতের সংগঠন বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএসএমএ) জানিয়েছে, চলতি বছরের শুধু  মার্চ ও এপ্রিলে পুরো খাতটির ক্ষতির পরিমাণ ৩ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে সিমেন্ট খাতের ৯০ শতাংশ কোম্পানির উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। বিক্রিও প্রায় শূন্যের কোটায় নেমে এসেছে। ইতিমধ্যে তৈরি পোশাক শিল্পের প্রায় ৬০০ কোটি মার্কিন ডলারের রপ্তানি আদেশ স্থগিত বা বাতিল হয়ে গেছে। করোনাভাইরাসের কারণে শিল্প কারখানাগুলোর কোনো আয় না হলেও থেমে নেই ব্যয়ের খাত। কোনো উৎপাদন না হলেও শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতনভাতা চালিয়ে যেতে হচ্ছে। পণ্য বিক্রি না হলেও ব্যাংকঋণের সুদ চার্জ হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে ভয়াবহ বিপর্যয়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে দেশের শিল্প খাত।

যদিও করোনাভাইরাসের মহামারীর প্রভাবে সৃষ্ট সম্ভাব্য ক্ষতি মোকাবিলায় ইতিমধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে প্রায় এক লাখ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে। তবে এ প্রণোদনার প্রায় পুরোটাই ঋণনির্ভর। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো শিল্পসহ বিভিন্ন খাতে ঋণ দেবে। আর এ ঋণের সুদের একটি বড় অংশ ভর্তুকি হিসেবে দেবে সরকার। তবে শিল্প কারখানা ও ব্যবসা-বাণিজ্য যে ক্ষতির মুখে পড়েছে তাতে প্রণোদনার ঋণই যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা। করোনাভাইরাসে সৃষ্ট দুর্যোগ কাটিয়ে উঠতে আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত সব ধরনের ঋণের সুদ মওকুফ চান তারা। একই সঙ্গে করপোরেট কর হার কমানোর পাশাপাশি আমদানি-রপ্তানিতেও করছাড় চান তারা।

ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই সভাপতি শেখ ফজলে ফাহিম দেশ রপান্তরকে বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে ৩০ মে সময় পর্যন্ত কিস্তি পরিশোধ না করার সুবিধা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আমরা চাচ্ছি এটি সুদসহ ৯ মাস থেকে ১ বছরের জন্য যেন স্থগিত রাখা হয়। কারণ কোনো কলকারখানা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এখন খোলা নেই। কারও আর্থিক লেনদেনও হচ্ছে না। ফলে আমরা ব্যাংকের টাকা পরিশোধ তো দূরের কথা কোনো লেনদেনই করতে পারছি না। সম্ভবও না। তাই ব্যবসা-বাণিজ্যের স্বার্থে সুদসহ ঋণের কিস্তি স্থগিতের এ সুবিধা দিতেই হবে।

করোনাভাইরাসের প্রভাবে ব্যবসা-বাণিজ্যে কোনো আয় না থাকায় ইতিমধ্যেই সব ধরনের ঋণের কিস্তি প্রদানের ক্ষেত্রে ৩০ মে পর্যন্ত ছাড় দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। অর্থাৎ চলতি বছরের মার্চ থেকে মে পর্যন্ত ঋণের কিস্তি জমা না দিলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি অথবা প্রতিষ্ঠানের ঋণের শ্রেণিমানের কোনো পরিবর্তন হবে না। তবে পরবর্তী সময়ে বকেয়া কিস্তি পরিশোধের ক্ষেত্রে বাড়তি সুদ গুনতে হবে।

বাংলাদেশ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও সংসদ সদস্য আবদুস সালাম মুর্শেদী দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে যে প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে, তা ব্যবসায়ীদের জন্য সৌভাগ্যের। মনে আশার সঞ্চার হয়েছে। এছাড়া ছয় মাসের জন্য ব্যাংক ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে হবে না, এটাও স্বস্তির। কিন্তু এ স্বস্তিটা সাময়িক। কারণ এ সময়ে চক্রবৃদ্ধি সুদ হার কিন্তু থেমে নেই।

তিনি আরও বলেন, বিশ্ব এ ধরনের সমস্যায় আগে কখনো সম্মুখীন হয়নি। বাংলাদেশের অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এ অবস্থা থেকে ঘুরে দাঁড়াতেও সময় লাগবে। এমন পরিস্থিতিতে ব্যাংকগুলোর উচিত সুদের হারকে চক্রবৃদ্ধিতে হিসাব না করা। কারণ গ্রাহক বাঁচলে ব্যাংকও বাঁচবে। না হলে সবাইকে ভুগতে হবে।

করোনাভাইরাসের সৃষ্ট ক্ষতির কারণে দেশের জিডিপি ২ শতাংশে নেমে আসতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগীরা। কর্মহীন হয়ে পড়তে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষ। ইতিমধ্যেই প্রবাসী আয় ও রপ্তানিতে বিরূপ প্রভাব পড়েছে। দেশের রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৫ শতাংশ আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। অথচ করোনার কারণে এ খাতের অধিকাংশ কারখানাই বন্ধ। সরকারের কাছ থেকে বিশেষ ঋণ নিয়ে শ্রমিক-কর্মচারীদের মার্চ মাসের বেতন দিয়েছে বেশিরভাগ গার্মেন্ট কোম্পানি। রপ্তানি আদেশ বাতিল হওয়া ও শ্রমিকদের বেতন দিতে গিয়ে অনেক কারখানা বন্ধ ঘোষণা করতে হয়েছে।

তৈরি পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি ও বণিক সমিতি এফবিসিসিআইয়ের ভাইস প্রেসিডেন্ট সিদ্দিকুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ব্যাংকের কিস্তি পরিশোধে সময় দেওয়া হয়েছে। এটা ভালো। কিন্তু এ সময়কে আরও বাড়ানো প্রয়োজন। কারণ কতদিনে এ করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণে আসবে তা কেউ জানে না। এজন্য ব্যবসা-বাণিজ্যেও লেনদেন স্বাভাবিক হতে সময় লাগবে।

সিদ্দিকুর রহমান আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী তার ঘোষিত প্যাকেজে খাতভিত্তিক সহায়তার কথা বলেছেন। আমরা এখন এ প্যাকেজ কীভাবে সহজে বাস্তবায়ন করা যায়, তা নিয়ে কাজ করছি। এছাড়া কোন কোন খাত কী ধরনের সমস্যায় রয়েছে সেটা ক্লোজলি মনিটরিং করতে সরকারকে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। যেখানে যেখানে সমস্যা হবে বাজেটে সে বিষয়গুলোতে ফোকাস করে সমস্যা সমাধানে দিকনির্দেশনা থাকতে হবে। কারণ ব্যবসা-বাণিজ্য ঘুরে দাঁড়ালেই দেশের অর্থনীতি স্বাভাবিক হবে।

আবাসন ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব) জানিয়েছে, খাতটিতে প্রায় ৩৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান রয়েছে। এর বাইরে আরও কয়েক লাখ অস্থায়ী শ্রমিক রয়েছে খাতটিতে। করোনাভাইরাসের কারণে ফ্ল্যাট বিক্রি শূন্যের কোটায় নেমে এসেছে। এ সময় শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতনভাতা পরিশোধের পাশাপাশি ঋণের সুদ চার্জ হচ্ছে। আবাসন শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হলে অন্যান্য খাতেও এর মারাত্মক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাই এ খাতের ঋণের সুদ মওকুফ জরুরি বলে মনে করছেন আবাসন ব্যবসায়ীরা।

আবাসন ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিহ্যাবের সহসভাপতি লিয়াকত আলী ভূঁইয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমাদের এ শিল্পের সঙ্গে ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজের ২৫০টি প্রতিষ্ঠান জড়িত রয়েছে। ফলে এ শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হলে তারাও হুমকিতে পড়বে। এছাড়া আবাসন শিল্প একবার বেকায়দায় পড়লে উত্তরণে তিন থেকে চার বছর সময় লেগে যায়। এজন্য আমাদের উত্তরণের সুযোগ দিতেই হবে। তিনি বলেন, অনেক ব্যবসায়ী তাদের ব্যাংকঋণের কিস্তি পরিশোধের অবস্থায় নেই। এজন্য তাদের কমপক্ষে এক বছর সময় দিতে হবে। আবাসন ব্যবসায়ীদের বিদ্যমান ঋণের সুদ ডিসেম্বর ২০২০ পর্যন্ত মওকুফ এবং সহজ শর্তে পুনঃতফসিল করা খুবই জরুরি। এটা প্রধানমন্ত্রীর কাছে করা আবেদনেও বলেছি। এছাড়া বর্তমান পরিস্থিতিতে দীর্ঘমেয়াদি সংকট নিরসনে আবাসন শিল্পে ২০০৭-০৮ সালের ন্যায় হাউজিং রি-ফিন্যান্সিং স্কিম পুনঃপ্রচলন আবশ্যক বলেও জানানো হয়েছে।

নিট খাতের উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিকেএমইএর সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ হাতেম দেশ রূপান্তরকে বলেন, করোনার কারণে ব্যাংক ঋণের কিস্তি পরিশোধে সময় দেওয়া হলেও ঋণের সুদেও তো চক্রবৃদ্ধি চালু রয়েছে। এজন্য ছয় মাস পর যখন কিস্তির জন্য ব্যাংকগুলো চাপ দেবে, তখন ব্যবসায়ীদের কষ্ট কয়েকগুণ বেড়ে যাবে। এজন্য আমাদের দাবি হলো আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংক ঋণের সুদ মওকুফ করার ব্যবস্থা করতে হবে। এছাড়া ব্যাংক কিস্তি পরিশোধের যে সময় দেওয়া হয়েছে, তা আরও বাড়াতে হবে। আগামী এক বছরের আগে কোনোভাবেই ব্যবসা-বাণিজ্য স্বাভাবিক হবে না। এজন্য কিস্তি পরিশোধের সুযোগও ব্যবসা স্বাভাবিক না হওয়া সময় পর্যন্ত বাড়াতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কর্র্তৃক ঘোষণার পর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জারি করা নীতিমালা অনুসারে, শিল্পে ৩০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ থেকে উদ্যোক্তা সাড়ে ৪ শতাংশ সুদে ঋণ পাবেন ব্যাংক থেকে। ব্যাংক আরও সাড়ে ৪ শতাংশ সুদ ভর্তুকি হিসেবে পাবেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে। একজন উদ্যোক্তা তার মঞ্জুরিকৃত ওয়ার্কিং ক্যাপিটালের সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ প্যাকেজের আওতায় ঋণ পাবেন। আর সরকার সুদ ভর্তুকি দেবে এক বছর। এছাড়া কুটির, মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা অক্ষুণ্ণ রাখা এবং শিল্প কারখানায় নিয়োজিত জনবলকে কাজে বহাল রাখার প্রয়োজনে ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে স্বল্প সুদে চলতি মূলধন ঋণ সুবিধা প্রবর্তনের জন্য প্রধানমন্ত্রী ২০ হাজার কোটি টাকার আর্থিক সহায়তা প্যাকেজ ঘোষণা করেন। গ্রাহক পর্যায়ে সহনীয় সুদ বা মুনাফার হার কার্যকর করার লক্ষ্যে বর্তমানে চলমান সুদ হার ৯ শতাংশের মধ্যে সরকার ৫ শতাংশ সুদ ভর্তুকি হিসেবে দেবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত