ঋণের সুদ নিয়ে দুশ্চিন্তা করবেন না : প্রধানমন্ত্রী

আপডেট : ২৮ এপ্রিল ২০২০, ০৫:০৭ এএম

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, করোনা পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে আগামী সেপ্টেম্বর পর্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকবে। তিনি গতকাল সোমবার সকালে করোনাভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধ ও সংকট মোকাবিলা সমন্বয়ে তার সরকারি বাসভবন গণভবন থেকে রাজশাহী বিভাগের আট জেলার কর্মকর্তাদের সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সে মতবিনিময়কালে এ ঘোষণা দেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা এখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলব না। বর্তমান করোনা পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে অন্তত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত স্কুল-কলেজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকবে। করোনা মহামারী যখন থামবে তখন আমরা খুলব।’

করোনাভাইরাসের প্রকোপ বাড়তে থাকায় গত ১৭ মার্চ দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়। এরপর ২৬ মার্চ থেকে সব অফিস-আদালত ও যানবাহন চলাচল বন্ধ ঘোষণা করে সবাইকে যার যার বাড়িতে থাকতে বলা হয়। ২৩ এপ্রিল সেই ‘সাধারণ ছুটির’ মেয়াদ ৫ মে পর্যন্ত বাড়িয়ে আদেশ জারি হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছুটিও একই সময় পর্যন্ত বাড়ানো হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান টানা বন্ধ থাকায় পাঠদানের ধারাবাহিকতা রাখতে ২৯ মার্চ থেকে সংসদ টিভিতে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত এবং গত ৭ এপ্রিল থেকে প্রাথমিক শ্রেণির ভার্চুয়াল শ্রেণি কার্যক্রম শুরু করা হয়।

ভিডিও কনফারেন্সে প্রধানমন্ত্রী জেলা প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, পুলিশ, র‌্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য, সিভিল সার্জন-চিকিৎসক নার্সসহ স্বাস্থ্যকর্মী, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, সশস্ত্র বাহিনীর প্রতিনিধি, মসজিদের ইমাম, শিক্ষকসহ বিভিন্ন পেশাজীবীর সঙ্গে মতবিনিময় করেন। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিবের নেতৃত্বে মহাখালীর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট বিভাগ-দপ্তর এবং আইইডিসিআরও ভিডিও কনফারেন্সে যুক্ত ছিল।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউস অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন। পিএমও সচিব তোফাজ্জেল হোসেনসহ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা গণভবন প্রান্তে উপস্থিত ছিলেন। বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ বেতার, বেসরকারি টিভি এবং রেডিও চ্যানেলে ভিডিও কনফারেন্স সরাসরি সম্প্রচার করা হয়। পাশাপাশি কয়েকটি ফেইসবুক পেজেও লাইভ স্ট্রিমিং যায়।

মসজিদে সীমিত আকারে নামাজ পড়ার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ায় ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘সবাইকে বলব ঘরে বসে আল্লাহর কাছে দোয়া করেন। রমজানে আল্লাহর কাছে দোয়া করেন, যাতে বাংলাদেশ এ দুর্যোগ থেকে মুক্তি পায়। সারা বিশ্বের মানুষ যেন মুক্তি পায়।’ তিনি বলেন, ‘এখন ফসল উঠছে। এরপর ফসল লাগাতে হবে। আস্তে আস্তে আমাদের সবকিছু উন্মুক্ত করতে হবে। সবাই নিজেকে সুরক্ষিত রেখে কাজ করবেন। সেটাই আমরা অনুরোধ করব।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘যারা করোনা রোগীদের দেখাশোনা করছেন তাদের প্রণোদনা দিয়েছি। যদি কেউ অসুস্থ হন তাদের বিনা পয়সায় চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছি। তাছাড়া আমরা ৫ থেকে ৫৫ লাখ টাকা পর্যন্ত সহায়তা দেব। এভাবে বিভিন্ন সহযোগিতার আশ্বাস আমরা দিয়েছি এবং সেটা করে যাচ্ছি।’

দেশের অন্যান্য বিভাগ ও জেলাগুলোর চেয়ে রাজশাহীর জেলাগুলোতে করোনাভাইরাস কম শনাক্ত হওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী। শেখ হাসিনা বলেন, ‘আপনারা সাবধান ও সতর্ক আছেন বলেই জেলাগুলো ভালো আছে। যে কজনই আছে আর যেন না ছড়াতে পারে সেজন্য আরও সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন তিনি।

সব জেলায় আইসিইউ খোলা হবে : দেশের সব জেলায় নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) ব্যবস্থা করা হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। নতুন করে আরও দুই হাজার ডাক্তার ও ছয় হাজার নার্স নিয়োগ দেওয়া হবে উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘ইতিমধ্যে বিসিএস পরীক্ষা দিয়ে যারা রয়ে গেছেন (উত্তীর্ণ কিন্তু সুপারিশপ্রাপ্ত নয়) তাদের থেকে আমরা নিচ্ছি। ছয় হাজার নার্সও আমরা নিয়োগ দেব। প্রক্রিয়া ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। আমি নিজেই মিটিং করে এটি সব ঠিকঠাক করে দিয়েছি। এদের করোনার বিষয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। বিদেশ থেকে লোক এনেও আমরা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করাব। প্রশিক্ষণ নিয়ে তারা চিকিৎসাসেবা দেবে। পর্যায়ক্রমে ৬৪ জেলাতে এটি করা হবে। যাতে কোনো জায়গায় মানুষের চিকিৎসার অসুবিধা না হয়।’

গরুর দুধ ত্রাণ হিসেবে দেওয়া যেতে পারে : যেসব এলাকায় ডেইরি খামার বেশি সেসব এলাকায় দুধ ত্রাণ হিসেবে দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। পাবনা জেলার কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি বলেন, ‘সিরাজগঞ্জ-পাবনা এসব এলাকার দুগ্ধ খামারিদের দিকে বিশেষ দৃষ্টি দিতে হবে। রিলিফ হিসেবে... এ দুধও আপনারা দিয়ে দিতে পারেন।’

ভিডিও কনফারেন্সের সূচনা বক্তব্যে দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা যায় সেরকম দুগ্ধজাত পণ্য উৎপাদনে গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘পোলট্রি ডেইরি যারা করছেন, এই যে দুধ আমি জানি যেহেতু দোকানপাট, হোটেল সব বন্ধ আপনারা অল্প টাকায় সাধারণ মানুষের কাছে বিক্রি করে দেন। সবাই খেতে থাকুক বা দুধ দিয়ে ঘি বা অন্যান্য যা যা দরকার তৈরি করে রাখুন যেটা বহুদিন টিকে থাকবে। ফেলে না দিয়ে কাজে লাগানো বা মানুষকে বিলিয়ে দিলেও তো কাজে লাগে। অনেকে দিচ্ছেন, সেজন্য ধন্যবাদ।’

ঋণের সুদ নিয়ে দুশ্চিন্তা করবেন না : ব্যবসা পরিচালনার জন্য ঋণের সুদ নিয়ে দুশ্চিন্তা করতে হবে না বলে ব্যবসায়ীদের আশ্বস্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘যারা ইতিমধ্যে ঋণ নিয়ে ব্যবসা করেছেন কিন্তু এ করোনাভাইরাসের কারণে এ কয় মাস সবকিছু বন্ধ থাকায় ঋণের সুদ বেড়ে গেছে, সেটার জন্য আপনারা চিন্তা করবেন না। কারণ সেই সুদ এখনই নেওয়ার কথা না।’

সুদ কতটুকু মাফ করা যায় বা কতটুকু নিয়মিত করা যায় এটি সরকারের বিবেচনায় আছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে বসব। কাজেই এ সুদগুলো যাতে স্থগিত থাকে, পরবর্তী সময়ে কতটুকু মাফ করা যায়, কতটুকু আপনারা নিয়মিত দিতে পারেন সেটা বিবেচনা করা হবে। কাজেই সেদিকে দুশ্চিন্তায় ভুগবেন না।’

বিভিন্ন সেক্টরে প্রণোদনা ঘোষণার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘একবারে ক্ষুদ্র ব্যবসা থেকে শুরু করে, যেমন মৎস্যচাষি থেকে শুরু করে পোলট্রি, ডেইরি ও কৃষিকাজ যারা করেন বা বিভিন্ন ধরনের ছোটখাটো ব্যবসা বা ক্ষুদ্র ব্যবসা যারা করেন, প্রত্যেকের কথা চিন্তাভাবনা করে এবং অন্যদিকে খেয়াল রেখে আমরা প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার কাছাকাছি প্রণোদনা ঘোষণা দিয়েছি এবং সেটা বিভিন্ন ভাগে ভাগে। যাদের ছোটখাটো ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মাত্র ২ শতাংশ সুদে আমরা টাকা দিয়ে দিচ্ছি। ব্যবসাগুলো যাতে চালু রাখতে পারেন সে বিষয়টি আমরা দেখব।’

করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব যেসব এলাকায় কম সেখানে ধীরে ধীরে লকডাউন শিথিল করার ইঙ্গিত দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এখানে সবচেয়ে বড় কথা মানুষকে বাঁচিয়ে রাখা। আমাদের জীবন-জীবিকার পথটা উন্মুক্ত রাখা। যেসব জায়গায় করোনাভাইরাস এখনো দেখা দেয়নি সেসব জায়গায় আমরা শিথিল করে দিচ্ছি। মানুষ যাতে স্বাভাবিক জীবনযাপনটা করতে পারে বা ব্যবসা-বাণিজ্য করতে পারে। সেদিকে আমরা দৃষ্টি দিচ্ছি।’

খাদ্য উৎপাদন বাড়ানোর তাগিদ দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আজকে বিশ্বব্যাপী কিন্তু অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দেবে। এমনকি আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো এটাও বলছে সারা বিশ্বব্যাপী দুর্ভিক্ষ মহামারী দেখা দিতে পারে।’

সরকারপ্রধান বলেন, ‘আমাদের মাটি অত্যন্ত উর্বর। আমাদের যাতে কোনো খাদ্যের অসুবিধা না হয় কাজেই যেখানে যে ফসলটা হবে, ধানকাটার পরপর সেখানে কোনো ফসলটা ফলাতে পারি। কেউ যেন এতটুকু জমিও ফেলে না রাখে। একখণ্ড জমিও যেন বাদ না যায়। তরিতরকারি, ফলমূল যা হোক সবকিছু যেন উৎপাদন করা হয়।’ তিনি বলেন, ‘বাড়ির আঙিনায় যেখানেই পারেন এগুলো আপনারা চাষ করবেন। যেন এ মহামারী দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে করোনা মহামারীর পর যে দুর্ভিক্ষ মহামারী সারা বিশ্বব্যাপী দেখা দেবে সেখান থেকে যেন আমাদের দেশকে আমরা বাঁচাতে পারি। তার জন্য প্রত্যেকে নিজেরা উদ্যোক্তা হয়ে উৎপাদন করুন। আরও ফসল ফলাতে হবে, আমরা নিজেরা যেমন খেতে পারব অন্য দেশে অভুক্ত মানুষ থাকলে তাদেরও সাহায্য করতে পারব। সেই মানসিকতা নিয়ে কাজ করবেন।’

ভিক্ষুক নাজিম বিশ্বে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন : করোনা তহবিলে ১০ হাজার টাকা দান করা ভিক্ষুক নাজিমউদ্দিন সারা বিশ্বে একটা দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, সারা বিশ্বে মহৎ দৃষ্টান্ত তিনি (ভিক্ষুক নাজিমউদ্দিন) সৃষ্টি করেছেন। এত বড় মানবিক গুণ, অনেক বিত্তশালীর মধ্যেও দেখা যায় না। তার কাছ থেকে অনেক কিছু শেখার আছে। শেখ হাসিনা বলেন, ‘আপনারা দেখেছেন যে একজন ফকির ভিক্ষে করে খায়, একটা সাধারণ মানুষ, একসময় কৃষিকাজ করতেন, অ্যাকসিডেন্ট করে পা ভেঙে যায়, তারপর আর কাজ করতে পারেননি। ভিক্ষে করে করে মাত্র ১০ হাজার টাকা জমা করেছিলেন তার থাকার ঘরটা ঠিক করবেন বলে। একটা ছেঁড়া কাপড় গায়ে। তার খাবারও ঠিকমতো নেই। কিন্তু তারপরও সে মানুষটা তার জমানো ১০টি হাজার টাকা তুলে দিয়েছেন করোনাভাইরাসে যারা ক্ষতিগ্রস্ত তাদের সাহায্যের জন্য। আমি মনে করি সারা বিশ্বে একটা মহৎ দৃষ্টান্ত তিনি সৃষ্টি করেছেন। এত বড় মানবিক গুণ, অনেক বিত্তশালীর মধ্যেও দেখা যায় না।’

অনেক বিত্তশালীর চাই চাই ভাবটা সবসময় থেকে যায় উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এই যে মহৎ উদারতা (তিনি) দেখালেন, বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে এ উদারতা এখনো আছে। কিন্তু সেটা আমরা পাই কাদের কাছে যারা নিঃস্ব তাদের কাছে। অনেক সময় দেখি অনেক বিত্তশালীরা হা-হুতাশ করে বেড়ায়। কিন্তু তাদের নাই নাই অভ্যাসটা যায় না। তাদের ওই চাই চাই ভাবটাই সবসময় থেকে যায়।’

এর আগে প্রধানমন্ত্রী করোনাভাইরাস পরিস্থিতি নিয়ে চার দফা ভিডিও কনফারেন্সে ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, সিলেট, বরিশাল এবং ময়মনসিংহ বিভাগের ৪৮টি জেলার সঙ্গে মতবিনিময় করেন। ভিডিও কনফারেন্সে প্রধানমন্ত্রী জনগণকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার আহ্বান জানানোর পাশাপাশি সংকট উত্তরণে বিভিন্ন প্রণোদনা প্যাকেজেরও ঘোষণা দেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত