গরু ও ছাগলের টিকা ক্রয়ে শতকোটি টাকা গচ্চার শঙ্কা

আপডেট : ২৯ এপ্রিল ২০২০, ০৫:৪৩ এএম

গরু ও ছাগলের টিকা ক্রয়ের দরপত্রে বড় ধরনের অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। এতে অকার্যকর টিকা সংগ্রহ করে সরকারের শত কোটি টাকা ক্ষতির আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, বড় অঙ্কের অর্থ আত্মসাতের লক্ষ্যে দরপত্রে অযৌক্তিক ও অপ্রয়োজনীয় শর্তজুড়ে একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়া হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ এসব টিকার জন্য অযৌক্তিক শর্ত বাদ দিয়ে নতুন করে দরপত্রের আহ্বানের দাবি জানান তারা। এ বিষয়ে প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়, দুর্নীতি দমন কমিশনসহ (দুদক) সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে বেশ কয়েকটি অভিযোগও জমা পড়েছে।

এসব অভিযোগ ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর থেকে প্রাপ্ত নথিপত্র থেকে জানা গেছে, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের অধীনে চার জেলায় (বরিশাল, ভোলা, সিরাজগঞ্জ ও মানিকগঞ্জ) ছাগলের প্লেগ বা পিপিআর (পেস্ট ডেস পেটিটস রুমিন্যান্টস) রোগ ও গরুর খুরা রোগ (এফএমডি) প্রতিরোধে পরীক্ষামূলকভাবে ৩৪৫ কোটি ২ লাখ ৯৯ হাজার টাকার একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয়েছে ৪ বছর। প্রকল্পের পরিচালক নিয়োগেও বড় ধরনের অনিয়ম করা হয়েছে। প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ উঠলে মন্ত্রণালয় থেকে অধিদপ্তরকে তদন্ত করার নির্দেশ দেয়। কিন্তু অধিদপ্তর রহস্যজনকভাবে ওই প্রকল্পের পরিচালককে দিয়েই নামমাত্র তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ায়। এ নিয়ে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারাও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকল্পের আওতায় যে এফএমডি ভ্যাকসিন ক্রয়ের দরপত্র ডাকা হয়েছে, সেই ভ্যাকসিন রোগ প্রতিরোধে কাজে আসবে না। ফলে এসব ভ্যাকসিনের জন্য বরাদ্দ করা ১৯৬ কোটি টাকার প্রায় পুরোটাই লুটেরাদের পকেটে যাবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযোগকারীদের একজন টেকনো ভ্যাকসিন লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী মো. মামুনুর রশীদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে ৯০ কোটি টাকা ব্যয়ে ১ কোটি ৩৭ লাখ ১৪ হাজার পিস এফএমডি ভ্যাকসিনে ক্রয়ের জন্য গত ১৪ জানুয়ারি যে টেন্ডার ডাকা হয়েছিল। তাতে আগ্রহী সবার অংশ নেওয়ার সুযোগ ছিল। কিন্তু গত ২২ ফেব্রুয়ারি অপ্রয়োজনীয় কিছু শর্ত সংযোজন করায় আগ্রহী অনেক প্রতিষ্ঠান সেখানে অংশ নিতে পারেনি। তাছাড়া তারা নতুন যেসব শর্ত দিয়েছে এসব শর্ত বাংলাদেশের আবহাওয়া ও রোগের ধরনের সঙ্গে কোনোভাবেই উপযোগী নয়।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাংলাদেশে গরুর খুরা রোগের যেসব ভ্যাকসিন ব্যবহার করা হয়, তার মধ্যে ৭০ শতাংশ আসে ভারত থেকে, ১৫ শতাংশ সরকারিভাবে উৎপাদন হয় এবং ১৫ শতাংশ অন্যান্য দেশ থেকে আমদানি করা হয়। রাশিয়া থেকে ‘অন ফার্মা’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান ৩ শতাংশ ভ্যাকসিন আমদানি করে। অভিযোগ উঠেছে, এই প্রকল্প পরিচালকের নেতৃত্বে একটি সিন্ডিকেট রাশিয়ার তৈরি বাংলাদেশের আবহাওয়ার অনুপযোগী ও অকার্যকর একটি ভ্যাকসিন আমদানির পাঁয়তারা করছে। তারা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের দিয়ে রাশিয়ার তৈরি এনএসপি ফ্রি (ননস্ট্রাকচারাল প্রটিন) ভ্যাকসিন আমদানির পক্ষে মত দিয়েছে। অথচ ভারতে বা বাংলাদেশে যে ভ্যাকসিন ব্যবহার হয় সেগুলো এনএসপি ফ্রি নয়। প্রকল্প পরিচালক গত ১৯ জানুয়ারি স্পেসিফিকেশন পরিবর্তন করে দরপত্রে এনএসপিফ্রিসহ কিছু শর্ত জুড় দেন। ফলে সরবরাহকারীরা এই দরপত্র অংশ নিতে পারেনি। সংশ্লিষ্টরা আরও জানান, রাশিয়ার ভ্যাকসিন আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ‘অন ফার্মা’ অভিজ্ঞতা না থাকায়, আর্থিকভাবে অসচ্ছল হওয়ায় জেনটেস ইন্টারন্যাশনাল লিমিডেট নামের একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়ে কাজ করার চেষ্টা করছে।

এফএনএফ নামের দেশীয় খুরা রোগের টিকা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী মোকলেসুর রহমান নিলু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গত বছরের ১১ জুলাই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ওষুধ প্রশাসন-১ শাখা থেকে জারি করা পত্রে বলা হয়েছে, খুরা রোগের ভ্যাকসিন যেহেতু স্থানীয়ভাবে ও বেসরকারি পর্যায়ে উৎপাদন করা হয়, উৎপাদন সক্ষমতা ও দেশের চাহিদা মেটাতে সক্ষম তাই খুরা রোগ ভ্যাকসিন স্থানীয়ভাবে ক্রয়ের জন্য মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরকে অনুরোধ করা হলো।’ এই প্রত্রের অনুলিপি প্রকল্প পরিচালক ও মন্ত্রণালয়কে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তিনি সেটা আমলে না নিয়ে রাশিয়া থেকে অকার্যকর টিকা আনছে।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরে একাধিক কর্মকর্তা জানান, খুরা রোগ নিয়ন্ত্রণ না করে এনএসপি ফ্রি ভ্যাকসিন দেওয়া হলে কোনো কাজ হবে না। এছাড়া রাশিয়ার আবহাওয়া ও বাংলাদেশের আবহাওয়া এক নয়। রাশিয়া এফএমডি ফ্রি হওয়ায় তারা এনএসপি ফ্রি ভ্যাকসিন তৈরি করছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ভারতের তৈরি ভ্যাকসিন বেশি কার্যকর। 

মন্ত্রণালয়ে জমা হওয়া অভিযোগে বলা হয়, দরপত্রের সঙ্গে ২৫টি ভ্যাকসিনের ভায়াল জমা দেওয়ার নিয়ম রয়েছে এবং সেই ভায়াল স্থানীয়ভাবে পরীক্ষা হওয়ার কথা। এজন্য প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের ঢাকা বিভাগের উপপরিচালক ও কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের একজন কর্মকর্তার সমন্বয়ে একটি টেকনিক্যাল কমিটি করা হয়। প্রায় দেড় মাস অতিবাহিত হলেও ওই কমিটির কাছে এখন পর্যন্ত নমুনা দেওয়া হয়নি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কমিটির সদস্য সচিব ডা. গোলাম আজম চৌধুরী টুলু দেশ গতকাল রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি শুনেছি নমুনা পিডির কাছে আছে। আমরা এখনো নমুনা পাইনি। তাই সেটা যাচাই করতে পরিনি।’

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় ও দুদকে দাখিল করা অভিযোগ থেকে জানা গেছে, এই প্রকল্পের পরিচালক নিয়োগে নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত ও অনঅভিজ্ঞ কর্মকর্তাকে গত বছরের ২ জুলাই নিয়োগ দেওয়া হয়। পিডি হিসেবে নিয়োগ পাওয়া ওই কর্মকর্তার নাম ডা. মো. এমদাদুল হক। বিধি অনুযায়ী প্রকল্পের মেয়াদ শেষে ন্যূনতম ৬ মাস চাকরি থাকবে এমন কর্মকর্তাকে প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ দিতে হয়। প্রকল্প মেয়াদ শেষ হবে ২০২৩ সালের জুন মাসে। আর ডা. এমদাদুল হক অবসরে যাবেন প্রকল্প মেয়াদ শেষ হওয়ার ১০ মাস আগে ২০২২ সালের আগস্টে। ফলে মাঝপথে প্রকল্প মুখ থুবড়ে পড়বে। আর নতুন প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ দিতে হবে।

শর্ত লঙ্ঘনসহ নানা অনিয়ম প্রসঙ্গে প্রকল্প পরিচালক ডা. মো. এমদাদুল হক বলেন, ‘মানসম্মত টিকা ক্রয়ের জন্য বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে দরপত্রে সংশোধনী দেওয়া হয়েছে। এখানে কোনো কোম্পানিকে রেসপন্সিভ বা নন-রেসপন্সিভ করার সুযোগ নেই। আমাদের উদ্দেশ্য হলো গবাদি পশু খুরা রোগ থেকে রক্ষা করা এবং খুরারোগ মুক্ত করা। কোনো কোম্পানিকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া বা কারও স্বার্থরক্ষা করা হয়নি। আর পিডি নিয়োগ সেটা সরকারের বিষয়। আমার কিছু করার নেই।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত