গত চার বছর ধরে আমি একটি ঐতিহাসিক উপন্যাস লিখছি, যার প্রেক্ষাপট ১৯০১ সালের তৃতীয় প্লেগ মহামারি। বুবোনিক প্লেগের এই সংক্রমণে এশিয়ায় লাখ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়, যদিও ইউরোপে মৃত্যুর হার তত বেশি ছিল না।
‘নাইটস অব প্লেগ’ নামের আমার এই উপন্যাসের বিষয় সম্পর্কে যারা জানেন, আমার সেই আত্মীয়-পরিজন, সম্পাদক এবং সাংবাদিক বন্ধুরা গত দুই মাস ধরেই বৈশ্বিক মহামারি নিয়ে আমাকে প্রশ্নের বন্যায় ভাসিয়ে দিচ্ছেন। বর্তমান করোনাভাইরাস মহামারির সাথে ঐতিহাসিক প্লেগ আর কলেরা মহামারির ঘটনাগুলোর মিল নিয়েই তারা সবচেয়ে বেশি কৌতুহলী।
মানুষ এবং সাহিত্যের ইতিহাসে সবগুলো মহামারিরই একটি বিষয়ে মিল রয়েছে, এটা ভাইরাস বা জীবাণুঘটিত মিল নয়, মিলটা হলো প্রতিটি মহামারির সময়ই মানুষ শুরুতে একইরকম প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। মহামারির শুরুতে সব সময়েই মানুষের প্রথম প্রতিক্রিয়া ছিল অস্বীকৃতি। স্থানীয় এবং জাতীয় সরকারগুলো সব সময়েই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে দেরি করেছে, তথ্য বিকৃত করেছে, প্রকৃত সংখ্যা কৌশলে বদলে দিয়ে মহামারির অস্তিত্বই অস্বীকার করেছে।
‘এ জার্নাল অফ দ্যা প্লেগ ইয়ার’কে বলা যেতে পারে সংক্রামক ব্যাধি এবং মানুষের আচরণ নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যকর্ম। এর শুরুর পাতাগুলোতে ড্যানিয়েল ড্যুফো বলেছেন, ১৬৬৪ সালের প্লেগের সময়ে লন্ডনের কিছু কিছু এলাকার স্থানীয় কর্তৃপক্ষ মৃতের প্রকৃত সংখ্যা কমিয়ে দেখাতে মৃত্যুর কারণ হিসেবে অন্য সব অসুখের নাম লিখে নিবন্ধন করেছিল।
প্লেগের সংক্রমণ নিয়ে সবচেয়ে বাস্তবধর্মী উপন্যাস বোধ হয় ১৮২৭ সালে প্রকাশিত ইতালীয় লেখক আলেসান্দ্রো মানজোনির ‘দ্যা বিট্রোথড’ (বাগ্দত্তা)। এতে মানজোনি মিলানে ১৬৩০ সালের প্লেগের সময় সরকারের প্রতিক্রিয়া আর তার কারণে তৈরি হওয়া জনরোষের বর্ণনা দিয়েছেন। এই জনরোষকে সমর্থনও করেছেন মানজোনি। মহামারির সুস্পষ্ট প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও মিলানের গভর্নর রোগ সংক্রমণের ঝুঁকি উপেক্ষা করেছেন, এমনকি স্থানীয় এক রাজপুত্রের জন্মদিনের অনুষ্ঠান পর্যন্ত বাতিল করেননি। মানজোনি দেখিয়েছেন, যথেষ্ট বাধা-নিষেধ আরোপ করা হয়নি বলেই দ্রুত ছড়িয়েছে প্লেগ। নিষেধাজ্ঞার প্রয়োগ ছিল শিথিল, মানুষ সেগুলো আমলেও নেয়নি।
প্লেগ কিংবা অন্য সব সংক্রামক ব্যাধি নিয়ে যেসব সাহিত্য রচনা হয়েছে, এর বড় অংশ জুড়েই জনগণের ক্ষোভের কারণ হিসেবে ক্ষমতায় যারা আছে তাদের দায়িত্বহীনতা, অযোগ্যতা, এবং স্বার্থপরতাকেই দেখানো হয়েছে। তবে দ্যুফো এবং কামুর মতো সেরা লেখকরা কিন্তু জনরোষের পেছনে এসব রাজনৈতিক কারণের বাইরেও আরও কিছুর ইঙ্গিত দিয়েছেন পাঠককে। আর তা মানুষের প্রকৃত অবস্থা এবং তার অস্তিত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত।
দ্যুফোর উপন্যাস আমাদের দেখিয়েছে, মানুষের এই তীব্র ক্ষোভ, এই অন্তহীন অভিযোগের পেছনে আসলে নিয়তির প্রতিই ক্ষোভ রয়েছে। সেই অলৌকিক শক্তির প্রতি ক্ষোভ, যা মানুষের এই দুর্ভোগ, এত মৃত্যু প্রত্যক্ষ করেও নীরব রয়েছে, হয়তো বা সমর্থনই দিচ্ছে। আর রয়েছে সেই সব ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি ক্ষোভ, যারা এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় কি করতে হবে তা নিশ্চিত করে বলতেই পারছে না।
বৈশ্বিক মহামারির মুখে মানুষের আরেকটি চিরন্তন এবং আপাতদৃষ্টিতে স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিক্রিয়া হলো গুজব সৃষ্টি, মিথ্যা তথ্য ছড়ানো। আগের মহামারিগুলোতে গুজব মূলত ছড়িয়েছে ভুল তথ্য থেকে, পুরো চিত্রটা বুঝতে পারার অক্ষমতা থেকে। দ্যুফো এবং মানজোনি দুজনের বর্ণনাতেই পাওয়া যায়, মহামারির সময় মানুষ রাস্তায় দেখা হলে একদিকে যেমন পরস্পরের থেকে দূরত্ব বজায় রেখেছে, ঠিক তেমনি যার যার এলাকার খোঁজ খবরও নিয়েছে, যাতে রোগের বৃহত্তর চিত্রটার একটা আন্দাজ পাওয়া যায়। শুধুমাত্র এই বৃহত্তর চিত্রটা দেখতে পেলেই তারা মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষার আশা করতে পারে, নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধান পেতে পারে। রেডিও, টেলিভিশন, সংবাদপত্র আর ইন্টারনেট ছাড়া সেই বিশ্বের অধিকাংশ মানুষই ছিল অশিক্ষিত, মহামারির বিপদ কোথায়, কতটা আর কেমন- তা আঁচ করতে নিজেদের কল্পনাশক্তি ছাড়া তাদের আর কিছুই ছিল না। এই কল্পনাশক্তির ওপর নির্ভরতার কারণে মানুষের ব্যক্তিগত ভয় একটি নিজস্ব ভাষা পেয়েছে। এটিই আবার মহামারিকে দিয়েছে এক কাব্যিক রূপ, যা একই সঙ্গে স্থানীয়, আধ্যাত্মিক এবং পৌরাণিক।
প্লেগের সময় সবচেয়ে বেশি যে গুজব ছড়িয়েছে তা হলো- কে এই প্লেগ নিয়ে এসেছে আর কোথা থেকে এটি এসেছে তা নিয়ে। মার্চের মাঝামাঝিতে যখন তুরস্কে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছিল, তখন ইস্তাম্বুলে আমি যেই এলাকায় থাকি সেই চিহানগিরে আমার ব্যাংক ম্যানেজার খুব বিজ্ঞের মতো বললেন, এটা হলো আমেরিকা এবং বাকি বিশ্বের প্রতি চীনের অর্থনৈতিক প্রতিশোধ। যেমনটা যে কোন মন্দ কিছুর ক্ষেত্রে হয়ে থাকে, প্লেগকেও সব সময় বাইরে থেকে আসা একটা কিছু হিসেবে দেখানো হয়। এটা আগে অন্য কোথাও আঘাত করেছে, সেখানে এটা নিয়ন্ত্রণের যথেষ্ট ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।
এথেন্সে প্লেগের প্রাদুর্ভাব সম্পর্কে বলতে গিয়ে যেমন থিউসিদিদিজ বলেছেন, সংক্রমণের শুরুটা হয়েছিল অনেক দূরে, ইথিওপিয়া আর মিশরে। রোগটা বিদেশি, বাইরে থেকে আসা, আর তা নিয়ে আসা হয়েছে কোন এক বিদ্বেষমূলক উদ্দেশ্যে। রোগের প্রকৃত বাহকের কথিত পরিচয় নিয়ে ছড়ানো গুজবই সবচেয়ে জনপ্রিয় আর সবচেয়ে বিস্তৃত।
‘দ্যা বিট্রোথড’ উপন্যাসে মানজোনি একটি অবয়বের বর্ণনা দিয়েছেন, মধ্যযুগে প্লেগের মহামারির সময় মানুষের কল্পনায় বারবারই এসেছে এই চরিত্রটি। প্রতিদিন এই দুষ্ট, পিশাচরূপী আকৃতিকে কোথাও না কোথাও দেখা গেছে বলে গুজব ছড়িয়েছে, রাতের অন্ধকারে সে প্লেগের জীবাণু ভরা তরল ছড়িয়েছে দরজার হাতলে, ঝরনার পানিতে। কিংবা হয়তো গির্জার মেঝেতে ক্লান্ত হয়ে বিশ্রাম নিতে বসা কোন বৃদ্ধের বিরুদ্ধে পাশ দিয়ে যাওয়া এক মহিলা অভিযোগ করে বসল, নিজের কোট মেঝেতে ঘষে জীবাণু ছড়ানোর। আর সঙ্গে সঙ্গেই তাকে গণপিটুনি দিতে লোক জড়ো হয়ে গেল। মহামারির সময়ে এই সব অপ্রত্যাশিত, নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া সহিংসতা, আতঙ্ক, জনশ্রুতি আর বিদ্রোহ রেনেসাঁসের আমল থেকেই দেখা গেছে।
রোমান সাম্রাজ্যে আ্যন্টোনাইন স্মলপক্স প্লেগের জন্য মার্কাস অরেলিয়াস খ্রিষ্টানদের দায়ী করেছিলেন, যে তারা রোমান দেবতাদের পূজা করেনি বলেই মহামারি দেখা দিয়েছে। অটোমান সাম্রাজ্য আর খ্রিষ্টান ইউরোপে প্লেগ ছড়িয়ে পড়লে, দুই ক্ষেত্রেই দায়ী করা হয় ইহুদিদের, অভিযোগ তোলা হয় কুয়োর পানিতে বিষ ছড়ানোর।
প্লেগ সম্পর্কিত ইতিহাস আর সাহিত্য ঘাঁটলে দেখা যায়, মানুষের দুর্ভোগ, মৃত্যুভয়, আধিবিদ্যক আতঙ্ক আর রোগাক্রান্তদের ভয়ংকর অভিজ্ঞতা যত তীব্র হয়, তাদের রাজনৈতিক অসন্তোষ আর ক্ষোভও তার সমানুপাতিক। প্রাচীন সেই প্লেগের সময় যেমন, তেমন এই করোনাভাইরাস সংক্রমণের সময়েও দেখা গেছে জাতীয়তা, ধর্মীয়, নৃতাত্ত্বিক এবং আঞ্চলিক পরিচয়ের উপর ভিত্তি করে যেসব গুজব ছড়িয়েছে সেগুলো মহামারির গতিপথের উপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রেখেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং গণমাধ্যমের ডানপন্থী প্রবণতা, মিথ্যে তথ্যকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে প্রচার করাটাও এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে।
কিন্তু এখন তো মহামারি সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্যের পাওয়ার ক্ষেত্রে সক্ষমতা অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি। সেকারণেই, বর্তমানে আমরা যে প্রচণ্ড আতঙ্ক বোধ করছি, যা একই সঙ্গে সংগতও বটে, তা অন্য যে কোন সময়ের চাইতে আলাদা। আমাদের এই আতঙ্কের উৎস যতটা না গুজব, তার চেয়েও বেশি নির্ভুল তথ্য। আমরা যখন চোখের সামনে আমাদের দেশ এবং গোটা বিশ্বের মানচিত্রে লাল বিন্দুগুলোর সংখ্যা দ্রুত বহুগুণে বাড়তে দেখি, আমরা অনুধাবন করি পালানোর মতো কোন স্থান আর অবশিষ্ট নেই। সবচেয়ে ভয়ংকর পরিস্থিতি আন্দাজ করার জন্য এখন আর আমাদের কল্পনার উপর নির্ভর করতে হয় না। ইতালির ছোট্ট শহর থেকে সেনাবাহিনীর ট্রাকে করে লাশের স্তূপ নিয়ে যাওয়া হচ্ছে পাশের সমাধিস্থলে, যেন নিজেদের শেষকৃত্য দেখার মতো করেই এমন ভিডিও দেখি আমরা।
তবে যে আতঙ্ক আমরা বোধ করছি এখন, তাতে কোন কল্পনার প্রলেপ নেই, নেই ব্যক্তির নিজস্বতা। প্রকাশ করে দিয়েছে পৃথিবীর সব মানুষ অপ্রত্যাশিতভাবেই একইরকম দুর্বল, একই মানবতার অংশ সবাই। ভয়, মৃত্যুচিন্তা আমাদের নিঃসঙ্গ করে। আবার একই সাথে, একই যন্ত্রণা আমরা সবাইই অনুভব করছি, এই বোধ সেই নিঃসঙ্গতা থেকে আমাদের টেনে বের করেও আনে।
কখন মাস্ক পরতে হবে, দোকান থেকে কিনে আনা জিনিসপত্র কিভাবে পরিষ্কার করা হবে, সেল্ফ কোয়ারেন্টিনে থাকতে হবে কি না, এসব বিষয় নিয়ে আমাদের মতোই উদ্বিগ্ন নিউ ইয়র্ক থেকে থাইল্যান্ডসহ গোটা বিশ্ব, এই তথ্য আমাদের বারবারই মনে করিয়ে দেয় যে আমরা একা নই। এটি একধরনের সংহতি সৃষ্টি করে। আমরা আর আতঙ্কে জবুথবু হয়ে থাকি না, বরং আমরা একটু নম্র হই, যা একটা পারস্পরিক বোঝাপড়া তৈরি করে।
যখন টেলিভিশনে দেখি, বিশ্বের নামকরা হাসপাতালগুলোর সামনে অসংখ্য মানুষ অপেক্ষা করছে, আমি বুঝতে পারি আমার মতোই আতঙ্ক অনুভব করছে গোটা মানবতা, আমার আর একা লাগে না। এই আতঙ্কের কারণে আমাকে আর ততটা লজ্জিত হতে হয় না। আমি বুঝতে পারি এই আতঙ্কই স্বাভাবিক।
প্লেগ আর মহামারি নিয়ে প্রচলিত সেই প্রবাদটা আমার মনে পড়ে, যারা আতঙ্কিত তারাই বেশি দিন বাঁচে। একসময় আমি বুঝতে পারি, আতঙ্ক আমার মধ্যে দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া তৈরি করে, হয়তো সবার মধ্যেই। কখনো এটা আমাকে নিজের মধ্যে গুটিয়ে দেয়, নীরবতা আর একাকিত্বের দিকে ঠেলে দেয়। আবার কখনো কখনো এটি আমাকে বিনয়ী হতে শিক্ষা দেয়, সংহতির শিক্ষা দেয়।
প্লেগ নিয়ে একটা উপন্যাস লেখার স্বপ্ন দেখি প্রায় ৩০ বছর আগে, আর সেই সময়েও আমার মূল লক্ষ্য ছিল মৃত্যুভয়। ১৫৬১ সালে উজির ঘিসেলিন দে বুসবেক, যিনি সুলতান সুলাইমানের শাসনামলে অটোমান সাম্রাজ্যে হ্যাপসবার্গ সাম্রাজ্যের দূত ছিলেন, প্লেগ থেকে বাঁচতে ইস্তাম্বুল থেকে ৬ ঘণ্টা দূরত্বে প্রিংকিপো দ্বীপে আশ্রয় নিয়েছিলেন। ইস্তাম্বুলের দক্ষিণ পূর্বাঞ্চলে মর্মর সাগরে প্রিন্সেস দ্বীপপুঞ্জের সবচেয়ে বড় দ্বীপ এটি। তিনি বলেন, ইস্তাম্বুলে কোয়ারেন্টিনের আইন যথেষ্ট কঠোর ছিল না এবং ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী হওয়ার কারণে তুর্কিরা অদৃষ্টবাদী। প্রায় দেড় শ বছর পরে, লন্ডনের প্লেগ নিয়ে লেখা উপন্যাসে বিজ্ঞ দ্যুফোও বলেন, তুর্কি আর মুসলমানেরা নিয়তিবাদের কথা বলে, তারা বিশ্বাস করে প্রতিটি মানুষের মৃত্যু পূর্বনির্ধারিত। প্লেগ নিয়ে আমার লেখা উপন্যাসটি ধর্মনিরপেক্ষতা এবং আধুনিকতার প্রেক্ষাপটে মুসলমানদের এই অদৃষ্টবাদ নিয়ে চিন্তায় সাহায্য করবে।
অদৃষ্টবাদী হোক বা না হোক, ঐতিহাসিকভাবে মহামারির সময় মুসলমানদের কোয়ারেন্টিনের নিয়ম মেনে চলতে বাধ্য করাটা খ্রিষ্টানদের তুলনায় কঠিনই ছিল। বিশেষ করে অটোমান সাম্রাজ্যে। কোয়ারেন্টিনের বিরুদ্ধে শহরের বিভিন্ন ধর্মের মানুষ আর দোকানিরা ব্যবসায়িক কারণে বিক্ষোভ করেছে, আর মুসলমানদের ক্ষেত্রে বেশির ভাগ সময়েই মেয়েদের পর্দা আর পারিবারিক গোপনীয়তার মতো ইস্যুগুলো সামনে এসেছে। উনিশ শতকের গোড়ায় মুসলিম সম্প্রদায় মুসলমান চিকিৎসকের দাবি তোলে, যখন এমনকি অটোমান সাম্রাজ্যেও বেশির ভাগ চিকিৎসকই ছিলেন খ্রিষ্টান। ১৮৫০ সালে, বাষ্পীয় ইঞ্জিনের নৌকায় ভ্রমণ যখন সহজলভ্য হয়ে ওঠে তখন মুসলমানদের পবিত্র ভূমি মক্কা আর মদিনায় যাওয়া হজযাত্রীরা হয়ে ওঠেন বিশ্বজুড়ে সংক্রামক রোগ ছড়ানোর প্রধানতম, সবচেয়ে বড় বাহক। বিংশ শতাব্দীতে এসে, মক্কা মদিনায় যাওয়া আসা করা হজযাত্রীদের নিয়ন্ত্রণে মিসরের আলেকজান্দ্রিয়ায় ব্রিটিশরা কোয়ারেন্টিনের জন্য বিশ্বের সবচেয়ে বড় কার্যালয় প্রতিষ্ঠা করে। এই ঐতিহাসিক ঘটনাগুলোই মুসলমানদের অদৃষ্টবাদী হিসেবে স্টিরিওটাইপ করে তুলতে সাহায্য করেছে। সেই সাথে এমন ধারণা প্রতিষ্ঠিত করেছে যে, সকল রকম সংক্রামক রোগের উৎস হলো মুসলমান কিংবা এশিয়ার অন্যান্য মানুষ, আর তারাই এর একমাত্র বাহক। ফিওদর দস্তোয়ভস্কির ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্টের শেষে, উপন্যাসের নায়ক রাসকোলনিকভ যখন প্লেগের দুঃস্বপ্ন দেখে, তখন তিনিও একই সাহিত্যিক ঐতিহ্যের মধ্যে থেকেই বলেন। সে স্বপ্নে দেখে গোটা পৃথিবীতে এক আশ্চর্যরকম ভয়ংকর প্লেগ দেখা দিয়েছে, এশিয়ার গভীর থেকে যা ইউরোপে এসেছে।
১৭ এবং ১৮ শতকের মানচিত্রে, অটোমান সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক সীমানা ছিল দানিউব নদী, যেখানে পশ্চিমা বিশ্বের বাইরের জগতের শুরু। কিন্তু দুই বিশ্বের সাংস্কৃতিক বা নৃতাত্ত্বিক সীমানা নির্ধারিত হয় এই প্লেগ দিয়ে, এই বিষয়টি দিয়ে যে দানিউবের পূর্বে রোগ সংক্রমণের ঝুঁকি অনেক বেশি। এই সবকিছুই পূর্ব আর এশীয় সংস্কৃতিতে অদৃষ্টবাদ আরোপকে প্রতিষ্ঠিত করে। শুধু তা-ই নয়, প্লেগ এবং অন্য সব মড়ক সব সময় পূর্বের অন্ধকার কুলুঙ্গি থেকেই আসে এ রকম পূর্বধারণাকেও প্রতিষ্ঠিত করে।
অসংখ্য স্থানীয় ঐতিহাসিক বর্ণনা থেকে আমরা এমন চিত্রই পাই যে, এমনকি বড় বড় বৈশ্বিক মহামারির সময়েও ইস্তাম্বুলের মসজিদে জানাজা হয়েছে, শোকার্ত মানুষ একে অন্যকে সান্ত্বনা দিতে এসেছে। কোথা থেকে রোগের উৎপত্তি হয়েছে কিংবা কি করে তা ছড়াচ্ছে এর চেয়েও তারা বেশি চিন্তিত ছিল পরবর্তী জানাজা কীভাবে আয়োজন করবে সেটা নিয়ে। অথচ, চলমান এই করোনাভাইরাস মহামারির সময়ে তুরস্ক সরকারকে ধর্মনিরপেক্ষ অবস্থান নিতে দেখা গেছে। যারা এই রোগে মারা গেছে তাদের জানাজা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে, শুক্রবার মসজিদ বন্ধ রাখার মতো দ্ব্যর্থক সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যেদিন সপ্তাহের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নামাজ আদায়ের জন্য অসংখ্য লোক মসজিদে জড়ো হয়। তুর্কিরা এসব সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেনি।
আমাদের আতঙ্ক যত বড়ই হোক, এটি কিন্তু অনেক বিচক্ষণ এবং ধৈর্যশীল আচরণ। এই বিপর্যয় আমাদের হৃদয়ে যে বিনয়, যে সংহতির জন্ম দিয়েছে তা ধারণ করতে হবে, লালন করতে হবে। একমাত্র তাহলেই মহামারি শেষে আমরা আগের চেয়ে সুন্দর একটি বিশ্ব পেতে পারি।
প্রকাশিতব্য উপন্যাস ‘নাইটস অব প্লেগ’ নিয়ে নিউ ইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত নোবেল বিজয়ী সাহিত্যিক ওরহান পামুকের প্রবন্ধ। ভাষান্তর: মোহাম্মাদ সাঈদ জুবেরী চিশতী।
