প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ নিজেদের নামে চালাচ্ছেন অনেক এমপি

আপডেট : ০৬ মে ২০২০, ০৫:২৭ এএম

করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে দরিদ্র, অসহায় মানুষদের পাশে দাঁড়ানোর অংশ হিসেবে সারা দেশে সরকারিভাবে ত্রাণের চাল পাঠাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অভিযোগ উঠেছে, সেই চালের কমপক্ষে ২০ ভাগ থেকে সর্বোচ্চ ৪০ ভাগ পর্যন্ত নিয়ে যাচ্ছেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের অর্ধেকের বেশি সংসদ সদস্য। সেই ত্রাণ আবার নিজের নামে বিলিয়ে দিচ্ছেন ‘কাছের লোকদের’ মাঝে। অবশ্য অনেক সংসদ সদস্য করোনাভাইরাস দুর্যোগে পাঠানো এ ত্রাণে কোনোভাবেই ভাগ বসাতে রাজি নন। তারা এটাকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপহার হিসেবেই দেখছেন; চাইছেন সঠিকভাবে বণ্টন হোক।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আওয়ামী লীগের অর্ধেকের বেশি সংসদ সদস্য জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের (ইউএনও) আগে থেকেই ত্রাণের চাল থেকে তাদের ‘নির্ধারিত ভাগ’ রেখে দেওয়ার জন্য বলে থাকেন। সে অনুযায়ী সরকারি কর্মকর্তারা ‘তাদের ভাগ’  রেখে দিয়ে বাকি ত্রাণের চাল স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বয়ে উপজেলা চেয়ারম্যান, ইউনিয়ন চেয়ারম্যানদের মাধ্যমে দরিদ্রদের মাঝে বিতরণ করেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অন্তত ১০ জেলার ডিসি দেশ রূপান্তরকে এসব তথ্য জানিয়ে বলেন, বেশিরভাগ জেলায়ই সংসদ সদস্য প্রধানমন্ত্রীর পাঠানো এ ত্রাণ থেকে ভাগ নিয়ে থাকেন। এটা এক ধরনের নিয়মে পরিণত হয়েছে। তারা বলেন, কোনো কাগজপত্রের মাধ্যমে নয়, মৌখিকভাবে সংসদ সদস্যরা এ ত্রাণের ভাগ নিয়ে থাকেন। নির্দিষ্ট পরিমাণ একটা ভাগ চলে যাওয়ার ফলে শতভাগ ত্রাণ বিতরণ করা যায় না। গাইবান্ধা, লালমনিরহাট, বগুড়া, রাজশাহী, টাঙ্গাইল, নাটোর, সিরাজগঞ্জ, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নরসিংদী, চাঁদপুর, লক্ষ্মীপুর, ফেনীসহ অনেক জেলায় স্থানীয় সংসদ সদস্যরা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পাঠানো ত্রাণ থেকে একটা অংশ নিয়ে রাখছেন। অবশ্য এসব জেলার কোনো কোনো সাংসদ ভাগ নেওয়ার পক্ষে নন।

এ প্রসঙ্গে গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার এক ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের স্থানীয় সংসদ সদস্য প্রধানমন্ত্রীর পাঠানো ত্রাণ থেকে প্রতিবারই ২০ ভাগ উঠিয়ে নিয়ে যান। ফলে আমরা পুরো ত্রাণ হাতে পাই না।’ তিনি বলেন, ‘আমরা ডিসি, ইউএনওকে এ ব্যাপারে আপত্তি জানিয়েছি। কিন্তু তারা আমাদের সেই আপত্তি রাখতে পারেন না।’ ওই জেলার নাম প্রকাশ অনিচ্ছুক স্থানীয় প্রশাসনের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে এর সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, ‘এখানে ভাগ চাইলে আমাদের কিছু করার থাকে না। সেই ভাগ রেখে দিতে হয়।’

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে গাইবান্ধা জেলায় দায়িত্বপ্রাপ্ত সচিব নুর উর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অন্য জেলায় এ ধরনের ঘটনা রয়েছে কি না আমি জানি না। তবে আমার দায়িত্বপ্রাপ্ত জেলায় সংসদ সদস্যের ভাগ নেওয়ার কথা আমার জানা নাই।’

ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদরের এক স্থানীয় জনপ্রতিনিধি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যেকোনো ত্রাণ এলেই স্থানীয় সংসদ সদস্যের একটি নির্দিষ্ট ভাগ রেখে দিতে হয়। এটা নিয়ে আমাদের তেমন আপত্তিও থাকে না। কিন্তু করোনাকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দরিদ্রদের জন্য যে উপহার পাঠান সেটা যেন পুরোটাই আমরা বিতরণের সুযোগ পাই। এ ত্রাণ ভাগাভাগি না হলেই ভালো হতো।’

এ প্রসঙ্গে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার একজন সংসদ সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঘটনা সত্য। সংসদ সদস্যরা একটা নির্দিষ্ট ভাগ নিয়ে যান।’ তিনি বলেন, ‘আমাকে ডিসি ফোন দিয়ে বলে সবাই ভাগ নিয়ে যায় আপনারটা কী করব? আমি ডিসিকে বলে দিয়েছি আমার ভাগ লাগবে না। আমি চাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এ উপহার সুষ্ঠুভাবে বণ্টন হোক, তাতেই আমি খুশি।’

যাদের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর পাঠানো ত্রাণের ভাগ নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে তাদের নাম প্রকাশ না করে দেশ রূপান্তরের পক্ষ থেকে তাদের কয়েকজনকে ফোন দিয়ে সত্যতা জানতে চাওয়া হয়। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এক সংসদ সদস্য বলেন, ‘এখান থেকে একটি অংশ নিই। তবে সেটা আমরা বিতরণ করি। ঘরে রেখে দিই না। একটা অংশ আমরা নিয়ে রাখি এজন্য যে, তালিকার বাইরেও আমাদের কিছু লোক থাকে তাদের হাতেও আমাদের কিছু জিনিস তুলে দিতে হয়।’

কুমিল্লার এক সংসদ সদস্য বলেন, ‘আমাদের দলীয় কিছু লোক থাকে, আত্মীয়-স্বজন থাকে তাদের হাতেও কিছু সাহায্য সহায়তা আমাদের তুলে দিতে হয়। এজন্য আমরা একটা অংশ নিই।’ তিনি বলেন, ‘এর পরিমাণ একেবারেই কম। সেই ভাগও তো আমরা বিতরণ করি।’

এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রামের অঞ্চলের এক সংসদ সদস্য বলেন, ‘কিছু সংসদ সদস্যের ব্যক্তিগত উদ্যোগে কিছু ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম দেখা যায়। প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ থেকে ভাগ নেওয়া ত্রাণই ব্যক্তিগত ত্রাণ হয়ে যায়। আসলে এসব ত্রাণ নেওয়া হলেও খারাপ উদ্দেশ্যে নেওয়া হয় না। ওখান থেকে ভাগ নেওয়া ত্রাণ আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশীর কাছে বিতরণ করা হয়।’ তিনি বলেন, ‘তবে এ ত্রাণ তখন আর প্রধানমন্ত্রীর উপহার হিসেবে বিতরণ হয় না, সংসদ সদস্যদের ব্যক্তিগত উদ্যোগে দেওয়া হয় এ প্রচার পেয়ে থাকে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত