নিষিদ্ধ ঘোষিত জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) সদস্যরা তাবলিগের বেশে সক্রিয় হয়ে উঠছেন বলে তথ্য মিলেছে। তারা তাবলিগের কথা বলে প্রথমে বাড়ি ছাড়েন। তারপর বিভিন্ন মসজিদে অবস্থান নিয়ে সেখান থেকে সুবিধাজনক জায়গায় ‘হিজরত’ করে দলীয় কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেন। গতকাল মঙ্গলবার ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমের (সিটিটিসি) একাধিক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে এসব তথ্য জানিয়েছেন। তারা জানান, গত সোমবার সন্ধ্যার দিকে রাজধানীর কাকরাইল থেকে জেএমবির ১৭ সদস্যকে আটকের পর জিজ্ঞাসাবাদে এসব তথ্য জানতে পেরেছেন। পরে ওই জেএমবি সদস্যদের বিরুদ্ধে রমনা থানায় মামলা দিয়ে গতকাল মঙ্গলবার আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়।
সিটিটিসির কর্মকর্তারা জানান, সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে অন্তত ২৪ জন নিখোঁজ হন। যাদের অধিকাংশ তাবলিগের কথা বলে বাড়ি ছেড়েছেন। কিন্তু পরিবারেরে সঙ্গে আর যোগাযোগ করেননি। দেশের বিভিন্ন এলাকার মসজিদে মসজিদে অবস্থান নিয়ে তারা তাদের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছেন। তাদের কেউ কেউ ইমাম মাহদীর সৈনিক হওয়ার জন্য সৌদি আরবে হিজরত করেছেন। আবার কেউ কেউ হিজরতের চেষ্টায় রয়েছেন। এরই মধ্যে গত সোমবার রাজধানীর কাকরাইল এলাকা থেকে জেএমবির ১৭ সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়। যারা সবাই সৌদি আরবে অবস্থানকারী বিতর্কিত বক্তা সৈয়দ মুশতাক মুহাম্মদ আরমান খানের আহ্বানে সাড়া দিয়ে ভারত হয়ে সৌদি আরবে যাওয়ার পরিকল্পনা করছিলেন। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন হায়দার আলী (৪৪), মাহমুদুল হাসান ওরফে মাসুম, জামিরুল ইসলাম (২৪), বিল্লাল হোসেন (৩৮), শেখ আরাফাত ওরফে জনি (৪৮), ইমরুল হাসান ওরফে ইমন (২৫), সাইফুল ইসলাম (২৫), মোজাম্মেল হক (৩৩), শাহজালাল(৩৪), আক্তারুজ্জামান (৩০), মাহমুদুল হাসান ওরফে সাব্বির (২৩), আবিদ উল মাহমুদ ওরফে আবিদ (২২), সোহাইল সরদার (৩৩), ওবায়দুল ইসলাম ওরফে সুমন (৩০), মাহমুদ হাসান ওরফে শরীফ (১৮), মাজেদুল ইসলাম ওরফে মুকুল (২৮) ও সোহাগ হাসান (২০)।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমের (সিটিটিসি) উপকমিশনার (ডিসি-সিটি) সাইফুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সৌদি আরবে অবস্থানকারী বাংলাদেশি নাগরিক ও বিতর্কিত বক্তা সৈয়দ মুশতাক মুহাম্মদ আরমান খানের সঙ্গে জেএমবির সম্পর্কের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কাকরাইল এলাকা থেকে জেএমবির ১৭ জনকে গ্রেপ্তারের ঘটনায় যে মামলা হয়েছে, সেই মামলার রেফারেন্স দিয়ে আবারও সৌদি সরকারকে অবহিত করার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।’
সিটিটিসির একাধিক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, সম্প্রতি রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে অন্তত ২৪ জন ব্যক্তি তাবলিগে যাওয়ার কথা বলে বাসা থেকে বের হয়ে আর ফিরে যাননি। এমনকি পরিবারের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখছেন না। তাদের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করে বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।
সিটিটিসি কর্মকর্তাদের ধারণা, তাবলিগ কর্মীর বেশ ধরে বাড়ির বাইরে বের হয়ে যারা নিখোঁজ রয়েছেন, তাদের অধিকাংশই জঙ্গি কর্মকাণ্ডে যুক্ত রয়েছেন। এছাড়া তাদের অনেকেই সৌদি আরবে হিজরতের চেষ্টায় রয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে কাউন্টার টেররিজম বিভাগের উপকমিশনার সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘এটি তাদের (জঙ্গিদের) উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের একটি কৌশল। এর বাইরে আরও বিভিন্ন কৌশলে তারা তাদের কর্মকাণ্ড পরিচালনার চেষ্টা করে থাকে।’
সিটিটিসির অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এডিসি) তৌহিদুল ইসলাম (ইথুন) জানান, সোমবার গ্রেপ্তারকৃত সবাই জেএমবির সদস্য। সৌদি আরবে গিয়ে ইমাম মাহদীর সাক্ষাতের আশায় তারা প্রায় এক মাস আগে বাড়ি ছেড়েছেন। তাবলিগের কর্মীবেশে বিভিন্ন জেলার সীমান্ত এলাকা দিয়ে ভারতে গিয়ে সেখান থেকে সৌদি আরবে হিজরতের পরিকল্পনা ছিল তাদের। কিন্তু তার আগেই সোমবার সন্ধ্যা সোয়া ৭টার দিকে কাকরাইল মসজিদের বিপরীত পাশে পাবলিক হেলথ্ কার্যালয়ের সামনে থেকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ সময় তাদের হেফাজত থেকে বিভিন্ন ধরনের ১৯টি মোবাইল ফোন, ২ লাখ ৩৪ হাজার টাকা ও ৯২২ আমেরিকান ডলার জব্দ করা হয়।
এডিসি তৌহিদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জনৈক ইঞ্জিনিয়ার সৈয়দ মুশতাক মুহাম্মদ আরমানের আহ্বানে সাড়া দিয়ে তারা হিজরতের নামে দেশ থেকে পালানোর চেষ্টা করছিলেন। আপাতত তাদের কারাগারে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হবে। তারপর দেশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে পরবর্তী সময়ে তাদের হেফাজতে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করার পরিকল্পনা রয়েছে।’
তিনি আরও জানান, মুশতাক মুহাম্মদ আরমান বাংলাদেশ থেকে ২০১৭ সালে সৌদি আরবে যান এবং অদ্যাবধি সেখানে অবস্থান করছেন। তিনি জিহাদের পক্ষে ইমাম মাহাদীর সৈনিক হিসেবে বিভিন্ন বক্তব্য এবং গাজওয়াতুল হিন্দ নামক স্থানে মুসলিমদের পক্ষে জিহাদ করার আহ্বান জানিয়ে অডিও-ভিডিও প্রকাশ করেন। সোমবার গ্রেপ্তার ১৭ জন মুশতাকের বক্তব্যে উদ্বুদ্ধ হয়ে তার সঙ্গে যোগাযোগ করে ইমাম মাহাদীর সৈনিক হিসেবে যুদ্ধের প্রস্তুতিস্বরূপ সৌদি আরব যাওয়ার চেষ্টা করেন। গ্রেপ্তারকৃতরা জানান, তারা পলাতক রবিউল সৈয়দ মুশতাক বিন আরমানের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন এবং গত মার্চ মাসের মাঝামাঝি সময় তারা পরস্পর যোগাযোগ করে হিজরতের সিদ্ধান্ত নেন। তাবলিগ-জামাতের আড়ালে সাতক্ষীরা বা বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে ভারত-কাশ্মীর সীমান্ত হয়ে সৌদি আরব পৌঁছানোর পরিকল্পনা ছিল তাদের। তাদের বলা হয়েছিল করোনার দুর্যোগে আকাশ থেকে এক ধরনের গজব নেমে আসবে এবং সমস্ত কিছু ধোঁয়াচ্ছন্ন হয়ে যাবে। তখন সীমান্তে কোনো পাহারা থাকবে না, এই সময় তারা যেন চলে আসেন। এই বিশ্বাস নিয়ে গত ১৮ মার্চ তারা প্রথমে সাতক্ষীরা ও পরে যশোর সীমান্তের কাছে বিভিন্ন মসজিদে অবস্থান করেন ভারতে যাওয়ার জন্য। তাদের আরও জানানো হয়েছিল, আগামী চল্লিশ দিন সূর্য উঠবে না, আকাশ ধোঁয়ায় ছেয়ে যাবে, কাফিররা সবাই মারা যাবে, ইমানদারদের শুধু হালকা কাশি হবে। ইমাম মাহাদির আগমন এই রমজানে সমাগত, তাই তারা যেভাবে পারে সেভাবে যেন আসার চেষ্টা করে। তারা সাতক্ষীরা ও যশোর সীমান্ত দিয়ে পার হতে না পেরে ঢাকা হয়ে সিলেট সীমান্ত দিয়ে ভারতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন এবং সে মোতাবেক তারা ঢাকায় আসেন।
এডিসি তৌহিদ বলেন, ‘সৈয়দ মুশতাক মুহাম্মদের প্ররোচনায় এবং তার সঙ্গে যোগাযোগ করে ইতিমধ্যে ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪ ছাত্র গত জানুয়ারিতে ওমরা পালনের উদ্দেশ্যে সৌদি গমন করে আর ফিরে আসেননি। এছাড়াও বিভিন্ন সময় সাদ, কাউসার, শরীফ, তোফাজ্জল, গিয়াসউদ্দিন, আলী আজম ও রাশেদ নামে আরও ৭ জন ইমাম মাহাদীর সৈনিক হিসেবে যোগদানের উদ্দেশ্যে সৌদি আরব হিজরত করেছেন বলে গ্রেপ্তারকৃতরা জানিয়েছেন।’
