আমরা কি হার্ড ইমিউনিটির পথে হাঁটছি

আপডেট : ০৯ মে ২০২০, ১১:৪২ পিএম

করোনার কারণে আমাদের অবস্থা এখন শাখের করাতের মতো। ঘরে বসে থাকলে পেট চলে না। আবার বাইরে বের হলে করোনায় আক্রান্ত হওয়া, মরে যাওয়ার ভয়। জীবন বনাম জীবিকার দ্বন্দ্বে জেরবার অবস্থা। এ অবস্থায় সরকারও দিশাহীন। প্রায় দেড় মাস সবকিছু বন্ধ রাখার পর একটু একটু করে নিয়ন্ত্রণ শিথিল করা হচ্ছে। ‘সাধারণ ছুটি’র মেয়াদ ১৬ মে পর্যন্ত বাড়ানোর পাশাপাশি ১০ মে থেকে ‘সকাল ১০টা-বিকেল ৪টা’ পর্যন্ত শপিং মল ও দোকানপাট এবং দূরত্ব বিধি মানার শর্তে অফিস-আদালত ‘কাজ চলার মতো’ খোলা রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। গেল সপ্তাহে ধাপে ধাপে তৈরি পোশাক বা গার্মেন্টস কারখানাগুলো অল্প শ্রমিক নিয়ে খোলার কাজ শুরু হয়েছে। কিন্তু তাতে শ্রমিকদের ভিড় এড়ানো যায়নি। ১৮টি মন্ত্রণালয়ের অধীনে সরকারি দপ্তরগুলো খুলে দেওয়ার কয়েক দিন পরই ফের বন্ধ করে দিতে হয়েছে মানুষের লকডাউন ভাঙার বহর দেখে।

সরকার জীবনযাত্রা স্বাভাবিক করার প্রক্রিয়া শুরু করলেও সংক্রমণ কমার বিন্দুমাত্র লক্ষণ নেই। বরং তা পুরোদমে ছড়িয়ে চলেছে। প্রতিদিনই বাড়ছে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা। একদিকে সরকারি সিদ্ধান্তে প্রয়োজনের চেয়ে কম মানুষের করোনা-পরীক্ষা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে, আবার যথেষ্ট সুরক্ষা-কিটের অভাবে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে দিনরাত এক করে লড়াই চালিয়ে যাওয়া বাংলাদেশের ডাক্তার, স্বাস্থ্যকর্মী ও পুলিশের মধ্যে। সরকার লকডাউনের বদলে ‘সাধারণ ছুটি’র নাম দেওয়ারও সমালোচনা করছেন অনেকে। তাদের যুক্তি, মানুষের একটা বড় অংশ লকডাউনের গুরুত্ব না বুঝে ছুটির মেজাজে দিন কাটিয়েছেন। শতবার সতর্ক করা সত্ত্বেও রোজ আলু-পটোল কিনতে ঝুলি হাতে বাজারে বেরিয়েছেন। আড্ডা দিয়েছেন। সংক্রমিত হয়েছেন, সংক্রমিত করেছেন। এখন ঈদের ছুটিতে উন্মুক্ত চলাচলের কারণে তা মাত্রা ছাড়িয়ে বিপদ ডেকে আনতে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে।

আসলে জীবন বনাম জীবিকার এই দ্বন্দ্বে জেরবার মানুষকে পরিচালিত করার বিষয়ে সরকার স্থির কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারছে না। ‘হাল ভাঙা পাল ছেঁড়া’ নৌকার মাঝির মতো নানা ধরনের সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। এদিকে করোনা পরীক্ষা ও রোগীদের চিকিৎসায় অব্যবস্থাপনা দিন দিন বাড়ছে। পরীক্ষার আওতা বাড়ানোয় মনোযোগ নেই। রোগীদের চিকিৎসাসেবার ব্যাপারে তেমন কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ছে না। যারা পরীক্ষায় করোনা পজিটিভ হিসেবে শনাক্ত হচ্ছেন, তারা বাসায় থাকবেন না হাসপাতালে থাকবেন, সেখানে তাদের কী করতে হবে, কিংবা বাসায় থাকাকালে নিয়ম মানছেন কি না, এসব ব্যাপারে কোনো সুনির্দিষ্ট কোনো ম্যাকানিজম দেখা যাচ্ছে না। যারা হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে যাচ্ছেন, তারাও খুব একটা সন্তুষ্ট হচ্ছেন না। পরীক্ষার রেজাল্ট পেতে অনেক সময় লেগে যাচ্ছে। পুরো প্রক্রিয়ায় একটা গা-ছাড়া ভাব দেখা যাচ্ছে। অথচ রোগীর সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে।

রোগী শনাক্তকরণ ও আইসোলেশনে নেওয়ার সময়টায় নতুন ব্যক্তিদের সংক্রমণ ঠোকানোর ক্ষেত্রেও একটা গ্যাপ আছে। আমাদের দেশে এখনো পর্যন্ত করোনা শনাক্ত হওয়ার পর রোগীকে হাসপাতালে বা বাসায় আইসোলেশনে রাখা হয়। তার বাড়ির লোকজনকে কোয়ারেন্টাইন করা হয়। কিন্তু সবচেয়ে বড় কথা, এই প্রক্রিয়া শুরুই হচ্ছে রোগ নির্ণয়ের পর। অর্থাৎ সেই ব্যক্তির দেহে উপসর্গ দেখা দিচ্ছে, তিনি দু-তিন দিন সেই উপসর্গ নিয়ে বাড়ির লোককে ব্যতিব্যস্ত করছেন, বাধ্য হয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নিচ্ছেন। এই সবকিছুর পর হচ্ছে নমুনা পরীক্ষা। তখন যাকে বলে শিরে-সংক্রান্তি। ততদিনে কতজনের শরীরে ছড়িয়ে পড়ল ভাইরাস? হয়তো দুজন, হয়তো চারজন, যা হওয়াটা মোটেই কাক্সিক্ষত নয়। অন্যদিকে করোনার লক্ষণ গোপন করে চিকিৎসা গ্রহণের প্রবণতাও দিন দিন বাড়ছে। আমাদের দেশে চিকিৎসা পেতে যে বিড়ম্বনা ভোগ করতে হয় এবং করোনা রোগীদের প্রতি যে ধরনের সামাজিক বর্জনের মনোভাব পোষণ করা হয়, তাতে অনেকেই এখন এই রোগের উপসর্গগুলো লুকাতে চান। এর ফলে সংক্রমণ নীরবে-নিভুতে ছড়িয়ে পড়ছে।

রোগ হওয়ার আগেই রোগকে আটকানো জনস্বাস্থ্যের এই নীতির ওপর অগ্রাধিকার দেওয়া হয়নি বলে, আমরা গোষ্ঠী সংক্রমণ আটকানোর প্রারম্ভিক সুযোগগুলো হাতছাড়া করেছি। এমনকি দুর্বল স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর ওপর দাঁড়িয়েও যেটুকু পরিষেবা দেওয়া সম্ভব, তাকে সুরক্ষিত করার যথোপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এখন আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যার পরিবর্তে আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। অঙ্কের এই খেলাকে কাজে লাগিয়ে পরিস্থিতির উন্নতি দাবি করা হচ্ছে। আসলে মুখে না বললেও, রাষ্ট্র হার্ড ইমিউনিটির তত্ত্বের ওপরই ভরসা করছে।

‘হার্ড ইমিউনিটি’ গড়ে তোলার পক্ষে বড় যুক্তি হলো, লকডাউনের সাহায্যে মহামারীর বিস্তারকে খানিক শ্লথ করা যায় ঠিকই। কিন্তু যতক্ষণ না দেশের একটা বড়সড় অংশের মধ্যে সংশ্লিষ্ট অসুখের জন্য ইমিউনিটি গড়ে ওঠে, সংক্রমণ চলতেই থাকবে। ওদিকে দেশের মোটামুটি ৬০-৭০ শতাংশ জনতার যদি এই ইমিউনিটি গড়ে ওঠে, তবেই থেমে যাবে ভাইরাসের বিজয়রথ। এটাই সংক্রমণের অন্তর্নিহিত বিজ্ঞান। যেকোনো মহামারীর ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য এই কথা।

আমেরিকার সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনসনের হিসাব বলছে এই সংক্রমণটা অবশ্য ৮৫ শতাংশেরও হতে পারে হার্ড ইমিউনিটি গড়ে ওঠার আগে। এই তত্ত্ব অনুসারে, যদি একটা দেশের ৭০-৮০ শতাংশ লোকের অসুখটা হয়ে যায়, তবে বাকি ২০-৩০ শতাংশ মানুষ অনেকটা সুরক্ষিত থাকবে, তাদের অন্যদের থেকে সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কা কমে যাবে। এখানে অবশ্য ধরে নেওয়া হয়েছে, কারও কভিড-১৯ নামক অসুখটি হলে তার শরীরে থেকে যাবে এই অসুখের প্রতিরোধ ক্ষমতা। মানুষের মধ্যে এই ইমিউনিটি কিন্তু গড়ে উঠতে পারে দুভাবে এক, যদি ভ্যাকসিন দেওয়া হয়; অথবা যদি তাদের অসুখটা হয়। করোনার ভ্যাকসিন এখনো দূর অস্ত। তাই যেকোনো দেশের পক্ষে এ মুহূর্তে হার্ড ইমিউনিটি গড়ে তোলার একটাই উপায় দেশের লোকদের স্বাভাবিক দৈনন্দিন কর্মকাণ্ড চালিয়ে যেতে দেওয়া। হয়তো খানিকটা নিয়ন্ত্রিতভাবে। তার ফলে বেশির ভাগ জনগণ আক্রান্ত হবে এবং এর মধ্য দিয়েই তাদের মধ্যে গড়ে উঠবে প্রতিরোধ ক্ষমতা। এই কাজটা করেছে সুইডেন।

তবে ‘হার্ড ইমিউনিটি’ এসে গেলেই যে এই অসুখটা আর কারও হবে না, ব্যাপারটা সে রকম নয়। লোকজনের অসুখ হবে, এমনকি অসুখে লোকজন মরবেও, তবে তা আর মহামারীর আকার নেবে না, এই যা। এটা ঠিকই যে, করোনাভাইরাসের প্রবল প্রকোপের মধ্যেও ইতালি, স্পেন বা জার্মানির মতো দেশগুলো একটু একটু করে খুলে দিচ্ছে তাদের অর্থনীতিকে, পূর্ণ লকডাউন হয়ে উঠছে আংশিক লকডাউন। অর্থনীতিকে বাঁচাতে গেলে এটুকু হয়তো করতেই হবে। কারণ অর্থনীতিকে কিছুটা হলেও রক্ষা না করতে পারলে শুধু ধনীরা নয়, চূড়ান্ত বিপদে পড়বে অসংখ্য সাধারণ মানুষ। জীবিকার সমস্যায়, খাদ্য-সমস্যায় দিশেহারা হয়ে পড়বে তারা।

ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনও ‘হার্ড ইমিউনিটি’র পক্ষে ছিলেন প্রথম দিকে। তারপর মৃত্যু মিছিলের চাপে পড়ে ঢোক গিলে দেশ জুড়ে লকডাউন করতে হয়েছে তাকে। ব্রাজিল, আমেরিকাও লকডাউন খুলে দেওয়ার পথে হাঁটছে। যদিও দেশ দুটি এ মুহূর্তে স্বস্তিতে নেই করোনার প্রকোপে।

আসলে লকডাউন না করে স্বাভাবিকভাবে ভাইরাসকে বিস্তৃত হতে দিলে একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক জনতা অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে। তাদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পরিষেবা দেওয়া তখন উন্নত দেশগুলোরও ক্ষমতার বাইরে চলে যায়, তাদের অনেক উন্নত স্বাস্থ্য-পরিষেবা সত্ত্বেও। আর যেসব দেশের চিকিৎসা-পরিষেবা ততটা উন্নত নয়, তাদের কথা তো বলাই বাহুল্য। সুইডেনের মতো ধনী কিন্তু ছোট দেশ, যার জনসংখ্যা মাত্র এক কোটি, জনঘনত্ব বেশ কম প্রতি বর্গ কিলোমিটারে মাত্র ২৫ এবং যে দেশের লোকজন স্বাভাবিকভাবেই সরকারি অনুশাসন আর বিধিনিষেধ মেনে চলতে অভ্যস্ত, সেখানে এই ‘হার্ড ইমিউনিটি’র তত্ত্ব প্রয়োগ করা হয়তো তুলনায় সহজ। তবু লক্ষ করলে দেখা যাবে, সুইডেনের করোনায় মৃত্যুহার কিন্তু অন্য নর্ডিক দেশগুলোর মধ্যে বেশ বেশি। হয়তো এই হার্ড ইমিউনিটি তত্ত্বের প্রয়োগের জন্যই, লকডাউন না হওয়ার কারণেই।

কিন্তু আমাদের দেশে হার্ড ইমিউনিটির তত্ত্বের প্রয়োগ অত্যন্ত বিপজ্জনক। প্রায় ১৭ কোটি মানুষের এই দেশের জনঘনত্ব সুইডেনের চেয়ে প্রায় ২০ গুণ। একসঙ্গে বেশি করোনা রোগী হয়ে গেলে চিকিৎসা পরিষেবা, প্রয়োজনীয় আইসিইউ কিংবা ভেন্টিলেশনে টান পড়বে এখানে। প্রতিদিন পাঁচ-ছয়শ রোগীর চাপ সামলাতেই হিমশিম। এটা দু-তিন হাজারে উঠলে ধসে পড়বে সিস্টেম। তবু, লকডাউনকে হয়তো আস্তে আস্তে আলগা করতেই হবে অর্থনীতিকে ভেন্টিলেশন থেকে বাইরে আনার জন্য। এটি বড় কঠিন চ্যালেঞ্জ!

লেখক : লেখক ও কলামনিস্ট

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত