কন্টেইনার ডিটেনশন চার্জ নিয়ে সংকটে আমদানিকারকরা

আপডেট : ১২ মে ২০২০, ০৬:০৮ এএম

কভিড-১৯ মোকাবিলায় সরকারঘোষিত সাধারণ ছুটিতে চট্টগ্রাম বন্দরে দীর্ঘ সময় আটকে থাকা কন্টেইনারের ডিটেনশন চার্জ নিয়ে সংকটে পড়েছেন আমদানিকারকরা। ফ্রি টাইমের অতিরিক্ত সময়ের চার্জ হিসেবে বড় অঙ্কের ডিটেনশন চার্জ এসেছে একেকটি কন্টেইনারের ওপর। এ ছাড়া মুম্বাই ও কলকাতা বন্দরের মতো চট্টগ্রাম বন্দরের ক্ষেত্রেও ডিটেনশন চার্জ মওকুফের জন্য নৌপরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের দপ্তর থেকে শিপিং লাইনগুলোর কাছে সুপারিশ (অ্যাডভাইজরি চিঠি) পাঠানো হলেও এতে সাড়া মিলছে না শিপিং কোম্পানিগুলো থেকে। শিপিং এজেন্ট ও আমদানিকারকদের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, বিভিন্ন শিপিং কোম্পানির সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি অনুসারে জাহাজ থেকে আমদানি পণ্যের কন্টেইনার বন্দরে নামানোর পর ১৪ থেকে ২১ দিন পর্যন্ত ‘ফ্রি টাইম’ থাকে। ওই সময়ের মধ্যে পণ্য খালাস করে কন্টেইনার খালি করে শিপিং লাইনকে কন্টেইনার হস্তান্তর করলে তাতে কোনো চার্জ থাকে না। কিন্তু নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কন্টেইনার বুঝিয়ে দিতে না পারলে শিপিং লাইনগুলোর নির্ধারিত সø্যাব অনুযায়ী ডিটেনশন চার্জ দিতে হয়।

বিশে^ মহামারী রূপে ছড়ানো করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরুর পর গত ২৬ মার্চ থেকে সারা দেশে ঘোষণা করা হয় সাধারণ ছুটি। জরুরি প্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠান ছাড়া বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়। বন্ধ হয় গণপরিবহন। সংক্রমিত এলাকায় ঘোষণা করা হয় লকডাউন। এমন পরিস্থিতিতে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে পণ্য খালাস পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়ে। নজিরবিহীন কন্টেইনারজটের সৃষ্টি হয় চট্টগ্রাম বন্দরে। বন্দরে ৪৯ হাজার টিইইউস কন্টেইনার রাখার ধারণ ক্ষমতা থাকলেও সেখানে কন্টেইনার দাঁড়ায় ৫০ হাজার টিইইউসে। পরবর্তী সময়ে শতভাগ স্টোর রেন্ট মওকুফ ও সব ধরনের পণ্যের কন্টেইনার অফডকে পাঠানোর সিদ্ধান্তের ফলে বন্দরে কন্টেইনার কিছুটা কমে আসে। কিন্তু বন্দর থেকে অফডকে পাঠানোর পরও ডেলিভারিতে আশানুরূপ গতি না আসায় সেখানেও এখন জটের সৃষ্টি হচ্ছে।

জানা যায়, করোনা পরিস্থিতি, সরকারঘোষিত সাধারণ ছুটি ইত্যাদি বিবেচনায় সাধারণ ছুটি চলাকালে আমদানি-রপ্তানি পণ্যের কন্টেইনারের ওপর কোনো ডিটেনশন চার্জ আরোপ না করার সুপারিশসংবলিত একটি সার্কুলার জারি করে নৌপরিবহন অধিদপ্তর। গত ২৯ এপ্রিল শিপিং লাইনগুলোর কাছেও এ সার্কুলার পাঠানো হয়। কিন্তু এখন পর্যন্ত তাদের কাছ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) প্রথম সহসভাপতি মোহাম্মদ আবদুস সালাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘করোনা পরিস্থিতির কারণে বন্দর থেকে কন্টেইনার ডেলিভারিতে যে স্থবিরতা সৃষ্টি হয় তাতে আমাদের কোনো হাত ছিল না। কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া, পরিবহনসংকট, দেশে দেশে লকডাউনের কারণে যথাসময়ে আমদানি দলিলপত্র হাতে না পাওয়া ইত্যাদি কারণে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বিশে^র বিভিন্ন বন্দরে এমন ঘটনা ঘটেছে। এমন পরিস্থিতিতে চট্টগ্রাম বন্দর শতভাগ স্টোর রেন্ট মওকুফ করেছে। পাশ্ববর্তী দেশ ভারতের বিভিন্ন বন্দরে শিপিং লাইনগুলো কন্টেইনার ডিটেনশন চার্জ মওকুফ করেছে। চট্টগ্রাম বন্দরের ক্ষেত্রে কন্টেইনার ডিটেনশন চার্জ মওকুফের সুপারিশ করেছে নৌপরিবহন অধিদপ্তর। কিন্তু এ সুপারিশকে কোনো গুরুত্ব দেয়নি শিপিং লাইনগুলো, যা অত্যন্ত দুঃখজনক।’ তিনি বলেন, ‘সাধারণ ছুটির সময় কোনো কোনো কন্টেইনারে দেড় থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত ডিটেনশন চার্জ এসেছে। এমনিতে করোনা দুর্যোগের কারণে ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়েছেন। এ অবস্থায় এ চার্জ পরিশোধ করতে হলে বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়বেন ব্যবসায়ীরা।’

এদিকে কন্টেইনার ডিটেনশন চার্জ আরোপ ও মওকুফের বিষয়টি সম্পূর্ণ বৈদেশিক প্রিন্সিপালদের এখতিয়ারাধীন বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশেনের (বিএসএএ) সভাপতি আহসানুল হক চৌধুরী। এ প্রসঙ্গে আলাপকালে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কন্টেইনার ডেলিভারি নেওয়ার জন্য প্রতিটি বি/এলে (বিল অব লেডিং) ১৪ থেকে ২১ দিন পর্যন্ত ফ্রি টাইম নির্ধারিত থাকে। ওই সময়ে ডিটেনশন চার্জ আরোপ করা হয় না। এই দীর্ঘ সময়ে আমদানিকারকরা মালামাল ডেলিভারি নিলে এমএলওর (মেইন লাইন অপারেটর) কন্টেইনার ডিটেনশন চার্জ আরোপের সুযোগ থাকে না।’ নৌপরিবহন অধিদপ্তর কর্র্তৃক সুপারিশ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘মুম্বাই ও কলকাতা বন্দরের অনুসরণে এ সুপারিশ করা হয়েছে। কিন্তু এসব বন্দরের সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দরের অবস্থা তুলনা করা যায় না। কারণ মুম্বাই বন্দরে কোনো জাহাজজট নেই এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জাহাজগুলো আমদানিকৃত মালামাল খালাস করে রপ্তানি পণ্যসহ বন্দর ত্যাগ করে। পক্ষান্তরে চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজ হ্যান্ডলিংয়ে নির্ধারিত সময়ের পরও ১৫-১৬ দিন অতিরিক্ত সময়ের প্রয়োজন হয়। তারপরও শিপিং এজেন্টরা বিষয়টি বৈদেশিক প্রিন্সিপালকে অবহিত করেছে। বিষয়টি সম্পূর্ণ তাদের ওপর নির্ভর করে। এ ক্ষেত্রে কন্টেইনার ডিটেনশন চার্জ মওকুফের বিষয়ে শিপিং এজেন্টদের করার কিছুই নেই।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত