মহামারীর কালে আধুনিকতার দান : নিঃসঙ্গতার ইতিহাস

আপডেট : ১৪ মে ২০২০, ০৬:৫৬ এএম

নিঃসঙ্গতা একটা প্লেগ, মড়ক, কিংবা মহামারী হয়ে উঠেছে, যা তরুণ ও বৃদ্ধ উভয়কেই আক্রান্ত করছে। বর্তমানের আরেকটি মহামারী কভিড-১৯ এর সঙ্গে নিঃসঙ্গতার মেলবন্ধন সর্বব্যাপী আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঘরে বসে কাজ করা যখন নয়া রেওয়াজে পরিণত হয়েছে; স্কুল, সরাইখানা, দোকানপাট সবই বন্ধ, আর মানুষের চলাচলও রীতিমতো সীমাবদ্ধ তখন মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর এই লকডাউনের প্রভাব নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় মানুষ এখন বেশি একা এবং নিঃসঙ্গ, অন্য মানুষের সঙ্গবঞ্চিত, সংস্পর্শ ও সম্পর্কবঞ্চিত। লকডাউনের এই নিঃসঙ্গতাকে অতি সহজেই সেইসব লোকজন ব্যাখ্যা করে ফেলছেন, যারা স্নায়ুবিজ্ঞানী জন ক্যাসিওপ্পোর মতো করেই বলছেন, অন্তরঙ্গতার জন্য আমাদের তো ইন্টারনেট সংযোগ আছে। কিন্তু সামাজিকভাবে যূথবদ্ধ থাকাটা মানুষের একটা জৈবিক চাহিদা এবং এই নিঃসঙ্গতা আমাদের বলে দিচ্ছে অন্য মানুষের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন আমাদের একটা শারীরিক চাহিদাও বটে।

কিন্তু তবু বলব, জৈবশরীরকেন্দ্রিক এই দৃষ্টিভঙ্গি দেহ ও আবেগের ইতিহাস উপেক্ষা করে যায়। এই দৃষ্টিভঙ্গি দেখতে পায় না যে নিঃসঙ্গতা পৃথিবীর তাবৎ মানুষের জন্য কোনো সর্বজনীন বাস্তবতা নয়, এর নির্দিষ্ট ইতিহাস আছে। ১৮০০ সালের আগে ইংরেজি ভাষায় প্রাত্যহিক ব্যবহারে নিঃসঙ্গতা বলে কোনো শব্দই ছিল না। যদিওবা কোথাও ব্যবহার হতো অন্য একটা বহুল প্রচলিত শব্দের অর্থেই ব্যবহার হতো- একাকিত্ব, মানে একা অবস্থা। বৃক্ষগুলো একা একা, রাস্তাগুলো একা একা, এমনকি মেঘগুলোও- যেমন উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ তার বিখ্যাত কবিতায় বলেছেন। কিন্তু সেই একাকিত্ব আর আজকের একাকিত্ব এক নয়, এ হলো আমরা যে সম্পর্কগুলোতে অতীতে ছিলাম এবং আমরা এখন যে সম্পর্কগুলো সাগ্রহে গড়ে তুলতে চাই এই দুইয়ের ফারাক। 

সত্যি যে, উনিশ শতকের পূর্বে মানুষ অনেক নির্জনতায় ছিল। এবং কখনোবা এই নির্জনতা দুর্মর ভার হয়ে চেপে বসত, ফলে মানুষ অদ্ভুত অদ্ভুত জিনিস নিয়ে উদ্ভট কল্পনা করত এবং তা নিয়ে মাতোয়ারা হয়ে থাকত, রবার্ট ব্রুটন যেমন অ্যানাটমি অব মেলাঙ্কোলিতে (১৬২৮) দেখিয়েছেন। অল্প কিছু মানুষ একাকীই বাস করত, শহর বা নগরে থাকত।  কিছু মানুষ স্বেচ্ছায় আধ্যাত্মিক নির্জনতা বেছে নিত, বিশেষত তৃতীয় শতকে থিব্বসনিবাসী পলের সময় থেকেই ধর্মীয় তপস্বীরা জঙ্গলে বা জনশূন্য এলাকায় নিভৃতে নিজেদের আস্তানা গাড়ত, কিন্তু তারা নিঃসঙ্গ ছিল না। এমনকি, ড্যানিয়েল ডিফোর ১৭১৯ সালে লিখিত উপন্যাসের চরিত্র রবিনসন ক্রুসো সমুদ্রে ভেসে ভেসে জনবিচ্ছিন্ন দ্বীপে আটকা পড়ে থাকলেও নিঃসঙ্গ ছিলেন না। কেন?   

এ শুধু শব্দের জন্য শব্দ নিয়ে খেলা না। আবেগের ইতিহাস এখন সুপ্রতিষ্ঠিত একটি জ্ঞানকাণ্ড, যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আবেগের রূপান্তর এবং তা প্রকাশে ভাষাভঙ্গির বদল অধ্যয়ন করে দেখে। নিঃসঙ্গতার অস্তিত্ব থাকতে হলে দুটি বস্তুর উপস্থিতি প্রয়োজন: ব্যক্তিক সম্পর্ক অর্থহীন হয়ে ওঠা (কিংবা আদৌ কোনো সম্পর্ক না থাকা), এবং অপরদের থেকে ব্যক্তির স্বাতন্ত্র্যের উপলব্ধি। প্রাগাধুনিক সমাজে সব অস্তিত্বকেই অর্থবোধক করে তুলত ধর্ম, এবং ব্যক্তির অনন্যতা সে যুগে বিশেষ একটা গুরুত্ববহ ছিল না। যেমন কবি আলেকজান্ডার পোপ লিখেছিলেন, ঈশ্বর ও প্রকৃতি মিলে গড়ে দিয়েছে সাধারণ রূপকাঠামো/আর বলে দিয়েছে আত্মপ্রেম ও সমাজের প্রেম সমান কথা (এ্যসে অন ম্যান-৩, ১৭৩১)। ভালোমন্দ যাই হোক না কেন, সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ ছিল এক অদৃশ্য হাতে। ১৮ শতকে যখন দোকানদার ও ডায়েরি লেখক টমাস টার্নারের বৌ মারা গেল এবং সব ধরনের বন্ধুবিচ্ছেদ ঘটল, তখন সে হাজার সংকটে মাটিতে মিশে গিয়েছিল, কিন্তু তবু সে নিঃসঙ্গ ছিল না। আর কীভাবেই বা তিনি নিঃসঙ্গ হবেন? ঈশ্বর সব সময় সঙ্গে থাকেন।

কিন্তু পরের শতকেই, আধুনিকতা নিয়ে আসে অনিশ্চয়তা আর সেইসঙ্গে স্বাধীনতা। হ্যাঁ, ধর্ম সচল থাকে বটে, কিন্তু এর সামাজিক ভূমিকার বদল ঘটে যায়, অর্থনৈতিক কাঠামোসমূহ এবং এর দর্শন পৃথিবীর দিকে তাকানোর নতুন ভুবনদৃষ্টি দান করে, এবং সেই পৃথিবীতে আমাদের অবস্থানও নির্দেশ করে দেয়। ষোল শতক থেকেই ধর্মীয় বিশ্বাস চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে, কিন্তু বৈজ্ঞানিক চিকিৎসাশাস্ত্র আত্মার উপস্থিতি স্বীকার না-করে পারল না। নগরায়ণ সনাতন সম্প্রদায়গুলো ভেঙে দিল এবং অপরদের থেকে শারীরিক দূরত্ব (এবং প্রতিযোগিতা) অনিবার্য করে তুলল। সবচেয়ে যোগ্যরাই টিকে থাকবে, ডারউইনের এই মতবাদের জোরে অর্থনৈতিক ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য ন্যায্যতা পেল। ইহজাগতিকতার দর্শন ঈশ্বরকে বাদ দিয়েই জীবনের অর্থ খুঁজে নিতে চাইল।

এই ঐতিহাসিক পরিপ্রেক্ষিতেই নিঃসঙ্গতার আবির্ভাব ঘটে এবং পরবর্তী সময়ে নয়া-উদারনৈতিক নীতিনৈতিকতা একে প্রকট করে তোলে।  গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, তথাকথিত যূথবদ্ধ সংস্কৃতিগুলোর (জাপান, চীন, ব্রাজিল) তুলনায় ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী দেশগুলোতে (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য এবং ইউরোপের অধিকাংশ অঞ্চল) এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ মাত্রায় নিঃসঙ্গতার সংকট দেখা দিয়েছে। তবে, বিশ্বায়নের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এই প্যাটার্নে পরিবর্তন আসছে, পণ্যসংস্কৃতি ও নিঃসঙ্গতা বিশেষত তরুণদের মধ্যে সর্বব্যাপী হয়ে উঠেছে।

নিঃসঙ্গতা নামের আবেগটিকে সহজাত জৈবিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে না-দেখে বরং নির্দিষ্ট ইতিহাসের সৃষ্টি হিসেবে বুঝতে পারলে এই লকডাউনকালে একে অনেক বুদ্ধিদীপ্তভাবে আমরা মোকাবিলা করার সুযোগ পাব। এই বুঝতে পারাটা জরুরি, কেননা নিঃসঙ্গতা কোনো একক আবেগ নয়। এর ভেতরে পাওয়া যাবে হরেক কিসিমের আবেগীয় অভিঘাত: রাগ কিংবা দুঃখ, ঈর্ষা কিংবা উষ্মা, স্বপ্ন কিংবা বিষাদ। একজন বয়স্ক মানুষ যদি কভিড-১৯ এ তার সঙ্গী হারান তাহলে তিনি যে প্রকারের নিঃসঙ্গতায় ভুগবেন তার প্রকৃতি একেবারেই আলাদা হবে সেই একাকী মায়ের চেয়ে, যে মাকে কাজকর্ম নিয়ে নিত্য হয়রানির মধ্যেও চার চারটা ছোট বাচ্চাকে সামলাতে হয়, যে বাচ্চাগুলো আবার মায়ের শরীরটিকে নিজেদের শরীরেরই সম্প্রসারণ ভাবে। আবার প্রকট দারিদ্র্য, জরাগ্রস্ততা ও অসুস্থতার কারণে যে স্থায়ী অবয়বগত নিঃসঙ্গতা দেখা দেয় তা কিন্তু অপরের সঙ্গকামনা বিশেষত প্রিয়তম কারও জন্য ব্যাকুলতার মতো বাস্তব নিঃসঙ্গতা থেকে আলাদা।

এই ব্যাপারগুলো বিবেচনায় রেখেই নিঃসঙ্গতা মোকাবিলায় সতর্কতা প্রয়োজন, সেইসঙ্গে এও মনে রাখা দরকার যে, নিঃসঙ্গতা সবসময় খারাপ কিছু না। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায় শিল্পী ও লেখকরা, যেমন ভার্জিনিয়া উলফ এবং মে সার্টন, কেবল নির্জনতাই বেছে নেননি, নিঃসঙ্গতার প্রকট যন্ত্রণাও বরণ করে নিয়েছিলেন শিল্পসৃষ্টির জন্য। এই প্রকারের নিঃসঙ্গতার বিশেষ সুযোগ সবার আরাধ্য নয়। তবু, নিঃসঙ্গতা নিয়ে অধ্যয়নে নিয়োজিত একজন গবেষক হিসেবে আমি লকডাউনের শুরু থেকেই অসংখ্য মানুষের ই-মেইল পাচ্ছি যারা প্রত্যহ তাদের দরজার ঘণ্টা না-বাজায় রীতিমতো আনন্দিত। আর, সঙ্গবোধ কেবল পরস্পরের স্পর্শানুভূতির মধ্যেই সীমিত নয়, আমাদের চারপাশের পৃথিবী এবং অন্য মানুষদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের বেলায় স্পর্শ, গন্ধ, স্বাদ ইত্যাকার নানাবিধ অনুভূতি কাজ করে। আর হয়তো এ কারণেই অনেকে রান্নাঘরে ঢুকে রুটি বানাতে উৎসাহী হয়ে উঠেছেন।

এসব জটিলতার প্রতি যত্নশীল না হলে আমরা লকডাউনের এই নিঃসঙ্গতা মোকাবিলা করতে পারব না। নিঃসঙ্গতা হতে পারে স্বল্পমেয়াদি কিংবা দীর্ঘমেয়াদি, আকস্মিক কিংবা স্থায়ী। নিঃসঙ্গতা হতে পারে এই বদ্ধ সময়ের মতোই সাময়িক, কিংবা আমৃত্যু চলমান। নিঃসঙ্গতা কারও স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে, আবার কাউকে কর্মোদ্যমী করে তুলতে পারে। তাই, আগেভাগেই যথেষ্ট ভেবেচিন্তে নিতে হবে, কীভাবে আমরা নিজেদের এবং অন্যদের নিঃসঙ্গতার মুখোমুখি হব। লকডাউন পরবর্তী পার্টি করার জল্পনা-কল্পনা নিয়ে যে তুমুল হট্টগোল চলছে এবং পরস্পরের সঙ্গ-কাতরতার যে গল্পগুলো শিরোনাম হচ্ছে বারবার, তার মধ্যেও আমাদের অবশ্যই স্মরণ রাখতে হবে নিঃসঙ্গতা কত জটিল ও বৈচিত্র্যময় একটা সমস্যা। এই সমস্যাটি আগে থেকেই ছিল, কভিড-১৯ বাস্তবতা কেবল তাকে আরও গুরুতর করে তুলেছে, যেমন স্পষ্ট করে তুলেছে আর্থ-সামাজিক বিভেদের রেখাটিকে। এটাও মনে রাখা দরকার, মহামারী থাকুক বা না থাকুক, সবার জন্য এই সমস্যার নিদান এক রকম হতে পারে না।  

[ফে বাউন্ড আলবার্তি যুক্তরাজ্যের ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসবিদ্যার সম্মানিত রিডার, এবং ইউকেআরআই ফিউচার লিডার্স প্রোগ্রামের ফেলো। তার সর্বসাম্প্রতিক গ্রন্থ ‘এ বায়োগ্রাফি অব লোনলিনেস: দ্যা হিস্ট্রি অব এন ইমোশন’ (২০১৯)।  এই লেখাটি ‘লোনলিনেস ইজ এ মডার্ন ক্রিয়েশন: আন্ডারস্ট্যান্ডিং দ্যাট হিস্ট্রি ক্যান হেল্প আস গেট থ্রু দিস প্যানডেমিক’ শিরোনামে টাইম ম্যাগজিনে ২৯ এপ্রিল ২০২০ তারিখে প্রকাশিত হয়। অনুবাদ করেছেন আ-আল মামুন, তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে শিক্ষকতা করেন।]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত