সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একজন মন্তব্য করেছেন ‘লকডাউনের মানে কী?’ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখেছি কোনো একজন লিখেছেন, লকডাউন মানে ‘পাড়ার গলির মুখে বাঁশ বেঁধে তার ডাউন দিয়ে চলাচল করা’। লকডাউনের এ অর্থের মধ্যে রসিকতা থাকলেও বাঙালির জন্য তা আজ প্রকৃত সত্য। সিংহভাগ বাঙালি সরকারি লকডাউনকে এভাবেই দেখেছে। জরুরি প্রয়োজন মেটানোর জন্য যে সামান্য সুযোগ রাখা হয়েছে, তার সুবিধা নিয়ে বাঙালি বাসায় না থেকে বের হয়ে পড়ছে। ফলে সব জায়গায় মানুষের ঢল। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় পাড়ার মধ্যে সকাল-বিকেল ফুটবল খেলা, ঘুড়ি ওড়ানো, ক্রিকেট খেলা আর না হলে পাড়ার মোড়ে জটলা অথবা দল ধরে গলা জড়িয়ে রাস্তা জুড়ে হেঁটে হেঁটে গল্প করা। এর সঙ্গে মানুষের গাছের ফলমূল ধ্বংস চলছে নির্বিচারে। সব মিলিয়ে এমনই অবস্থা লকডাউনের। প্রধান সড়কগুলোতে শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত বাহিনী তাদের সর্বোচ্চ উদ্যোগে নিবেদিত। কিন্তু তাতে কোনো সুফল দেখা যাচ্ছে না। এখন আবার ধীরে ধীরে সব খুলে দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে।
করোনাভাইরাস থেকে জীবন রক্ষায় বিশ্বব্যাপী প্রচারে মানুষকে ভয় না পেয়ে সতর্কতা অবলম্বন করতে বলা হচ্ছে। বাঙালি যে ভয় পায়নি, তা তাদের নিত্যদিনের চলাফেরাই নিশ্চিত করছে। আর যদি সতর্কতার কথা বলতে হয়, তবে কিছু অনুযোগ এসে যেতে পারে। করোনার প্রাদুর্ভাবের প্রাথমিক লগ্ন থেকে আমাদের দায়িত্বপ্রাপ্তরা বিষয়টিকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে জনগণকে অভয় দিয়ে তা মোকাবিলায় উন্নত বিশ্বের চেয়ে ভালো প্রস্তুতির কথা জানিয়েছিলেন। মিথ্যা পরিসংখ্যান দিয়ে মানুষকে সাহস জুগিয়েছেন। এই সাহসে বলীয়ান জনগণ সাধারণ ছুটি পেয়ে আর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। অবসর উপভোগের আকাক্সক্ষা নিয়ে রাজধানী থেকে এক কোটি মানুষ সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। করোনা-আক্রান্ত দেশ থেকে যেসব বাংলাদেশি দেশে ফেরে, তারাও নিজ নিজ পরিবারের সঙ্গে মিশে গিয়েছে। সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে না পারায় কোনো ক্ষেত্রেই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি।
আমাদের উন্নত প্রস্তুতির অংশ হিসেবে আজ পর্যন্ত দেশের সব জেলায় করোনা পরীক্ষার ব্যবস্থাই গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। ভাইরাসের পরীক্ষার ব্যবস্থাই যেখানে হলো না, সেখানে রোগীর সন্ধান পাওয়া যাবে কোথায়? রোগী শনাক্ত করার পরীক্ষা নেই, তাই করোনাও নেই। সবাই মনের আনন্দে বাজার করছে, খাচ্ছে আর ঘুরে বেড়াচ্ছে। করোনা পরীক্ষার সামান্যতম ব্যবস্থা হলেই একটার পর একটা জেলা লকডাউন। তবে সরকারি প্রজ্ঞাপন জারির আগের ও পরের অবস্থার পার্থক্য খুব একটা করা যায়নি। বিশ্ব পরিস্থিতি বিবেচনায় কিছু মানুষ বেশি সতর্কতা অবলম্বন করছে আর সিংহভাগ মানুষের বোধের মধ্যেই আসেনি যে সতর্ক হতে হবে।
সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ মনে করেন যে, বাসাবাড়িতে যদি নূ্যূনতম খাবার থাকত তাহলে অনেক মানুষকে ঘরবন্দি রাখা সম্ভব হতো। সরকারি-বেসরকারি ত্রাণসামগ্রী সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে সমন্বয় করা গেলে অনেকখানি পথ এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হতো বলেই বিশ্বাস। কিন্তু নিয়ন্ত্রণহীন প্রচারে নিবেদিত হয়ে ব্যর্থতার পরিচয়ই রাখা হলো মাত্র। এর মধ্যে আরেক রসিকতা, ফোন করলে খাবার পৌঁছে দেওয়া হবে। কিন্তু সবদিকের সামগ্রিক অব্যবস্থাপনার ফলে ত্রাণ প্রয়োজনীয়দের কাছে পৌঁছাল না। একজনের ঘরে কয়েকজনের ত্রাণ জমা হলো। ক্ষমতাবানরাই যেখানে সতর্ক হলো না, সেখানে সাধারণ মানুষ সতর্ক হবে কীভাবে? সর্বোপরি ত্রাণসামগ্রী ব্যবসার বাইরে থাকল না। প্রতিদিন মিডিয়ায় প্রকাশ হয়েই চলেছে ত্রাণসামগ্রীকে নিজের করে রাখার প্রতিযোগিতার কথা। মৃত্যুভয়ও ব্যক্তি-স্বার্থের বাইরে এদের আনতে ব্যর্থ হলো।
সরকার মুখে বিশ্বজয়ের আনন্দ করুক তাতে সাধারণ মানুষের আপত্তি নেই। সীমিত সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষদের সঙ্গে নিয়ে পাড়া-মহল্লায় প্রতিটি বাড়িতে ন্যূনতম ত্রাণ পৌঁছে দিলেই সরকারি প্রজ্ঞাপন জারি সফল হতো। শুধু চাল আর আলু বা ডাল দিয়ে জনগণকে বলা যেত জীবন বাঁচানোর জন্য এক মাস সেদ্ধ ভাত খাও। বিষয়টি হতে হবে এমন ‘ত্রাণের তালিকায় সবাই থাকবে, তবে যার প্রয়োজন সেই গ্রহণ করবে’। তবে দিন বাড়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে প্রয়োজনের তালিকায় মানুষও বাড়ছে। হতদরিদ্রদের সঙ্গে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, হকার, দিনমজুর, রিকশা-ভ্যানচালক, দোকানের কর্মচারী ইত্যাদি বহু পেশার মানুষ গৃহবন্দি অবস্থায় সমস্যার মধ্যে আছে। এরা নিয়মিত শ্রমের বিনিময়ে নিজেদের অন্নসংস্থান করত কিন্তু আজ তারা কাজের অভাবে বিপন্ন। তাই প্রয়োজন বিবেচনাটা উন্মুক্ত রাখা এবং বিস্তার ঘটানো দরকার।
ত্রাণ বিতরণে স্বজনপ্রীতির যে মহড়া হয়েছে, তা দেশের এই ক্রান্তিকালে দুঃখজনক। ৫০ লাখ কার্ড বিতরণও একই পথে হাঁটলে সাধারণ জনগণকে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে। দল সরকার পরিচালনা করে মানে দলটিই রাষ্ট্রের মালিক নয়, মালিক জনগণ। দলের নেতাকর্মীদের এ কথা বোঝানো জরুরি। কেননা, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের এক ডিলারকেও প্রকাশ্যে বলতে শোনা যায় আগে দল, পরে অন্যরা। কিন্তু এরাই দায়িত্ব পালন করে চলে বহাল তবিয়তে। তখন খুব জানতে ইচ্ছা করে সরকারি দল চায় কী? দেশের মোট জনপ্রতিনিধি ৬১ হাজার ৫৬৯ জনের মধ্যে ৬০ হাজার সরকারি দলের হতে পারে। তাই বলে কি এরাই বাংলাদেশ!
স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতি নিয়ে অনেক দিন ধরেই যে আলোচনা হচ্ছে, তা আজও চলমান। সংশ্লিষ্টরা ধরেই নিয়েছে ক্ষমতাবান হওয়া মানে আগামী কয়েক পুরুষের বিলাসী জীবন নিশ্চিত করা। ধমক দিয়ে হয়তো কিছুদিন মুখ বন্ধ করে রাখা যাবে কিন্তু আজ যেভাবে স্বাস্থ্যসেবাদানকারীরা করোনা-আক্রান্ত হচ্ছেন তার জবাব কী? প্রাথমিক পর্যায়ে প্রায় তিন লাখ পিপিই কোথায় এবং কাদের মধ্যে বিতরণ করা হলো? উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসা সেবাকর্মীরা মাত্র কয়েক দিন আগে পিপিই পেয়েছেন। আবার ডা. মঈনের মৃত্যুর পর সরবরাহ করা পিপিইর মান নিয়ে সরকার সমর্থক স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের নেতাকেই দেখা গিয়েছে সন্দেহ প্রকাশ করতে। এই যখন অবস্থা, তখন সাধারণ মানুষের বলার কিছু আছে বলে মনে হয় না। তবে বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় এর রাশ টানা আশু প্রয়োজন।
করোনা মোকাবিলায় আন্তরিক হলে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সমন্বয়ে পরিকল্পনা করে পদক্ষেপ গ্রহণ প্রয়োজন। ক্ষমতার অহংকারের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে এই দুর্যোগের মহাসমুদ্র পাড়ি দেওয়া সম্ভব হবে না। ক্ষমতাবানরা নিজেরা সতর্ক হয়ে জনগণকে সতর্ক করলে তবে জনগণ প্রকৃত সতর্ক হবে। সাহসের সঙ্গে এই যুদ্ধ জিততে হবে। আগামীর অর্থনৈতিক বিপর্যয় আরও কঠিন। লকডাউনের ফলে সবারই সঞ্চয়ে হাত পড়েছে। মধ্যবিত্ত দরিদ্র হচ্ছে আর দরিদ্র হতদরিদ্র হচ্ছে। এই বিশাল জনসংখ্যার প্রান্তিক মানুষগুলোর জীবন-জীবিকার সমস্যার সমাধান করতে হবে। এখন থেকে প্রস্তুতি গ্রহণ করা না হলে আজকের দুর্যোগে মানুষের জীবন রক্ষা করা গেলেও তখন রক্ষা করা খুব কঠিন হবে।
লকডাউন মানে কী তা জানার প্রয়োজন নেই। জীবন রক্ষার জন্য ঘরবন্দি থাকতে হবে। এই ঘরবন্দি থাকার সুষ্ঠু পরিবেশ সৃষ্টির দায়িত্ব সরকারকেই নিতে হবে। এদিকে, আইন তার নিজস্ব গতিতে চলতে গিয়ে অনিয়ম-দুর্নীতির প্রতিবাদকারীদের শাস্তিকে সমর্থন করছে। সাধারণ মানুষকে বলি দেওয়ার প্রতিযোগিতায় ক্ষমতাবানদের দায়িত্বহীনতার অবসানে করোনার দুর্যোগ কি মুক্তির পথ দেখাবে? নাকি আমরা সবাই এই দায়িত্বহীনতার বলি হব? আমরা যে প্রবল বেপরোয়া জীবনযাপন করছি, তার জন্য অনুশোচনা করার সময় কি পাব?
লেখক : সাবেক সভাপতি, ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ
