মরদেহে করোনার উপস্থিতি ড. আনিসুজ্জামানের প্রস্থান

আপডেট : ১৫ মে ২০২০, ০৭:৫৩ এএম

চলে গেলেন বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষক, গবেষক একুশে পদকজয়ী জাতীয় অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান। রাজধানী ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেল ৪টা ৫৫ মিনিটে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্নালিল্লাহিৃরাজিউন)। মৃত্যুর পর অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের শরীরে করোনার উপস্থিতি পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন তার ছেলে আনন্দ জামান।

ড. আনিসুজ্জামানের বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর। তিনি স্ত্রী সিদ্দিকা জামান, দুই মেয়ে রুচিবা ও শুচিতা এবং একমাত্র ছেলে আনন্দসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। হৃদরোগ, কিডনি ও ফুসফুসে জটিলতা, পারকিনসন্স ডিজিজ ও প্রোস্টেটের সমস্যার পাশাপাশি শেষ দিকে রক্তেও ইনফেকশন দেখা দিয়েছিল আনিসুজ্জামানের। অসুস্থতা বাড়তে থাকায় গত ২৭ এপ্রিল তাকে রাজধানীর ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় ৯ মে তাকে নেওয়া হয় ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে।

অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের ছেলে আনন্দ জামান তার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে গতকাল সন্ধ্যায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শুক্রবার সিএমএইচ কর্র্তৃপক্ষ বাবার লাশ আমাদের (পরিবার) কাছে হস্তান্তর করবে। বাবার করোনার টেস্টও করা হবে। তবে জানাজা ও দাফনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত এখনো নেওয়া হয়নি।’

এর কয়েক ঘণ্টা পর আনন্দ জামান তার বাবার শরীরে করোনাভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়ার কথা নিশ্চিত করেন দেশ রূপান্তরকে। তবে এ বিষয়ে হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ কিছু জানায়নি। আনন্দ জামান দেশ রূপান্তরকে জানান, তাদের পরিবারের ইচ্ছা ছিল আজিমপুরে মরদেহ দাফন করার। এখন করোনা পজিটিভ আসার কারণে স্বাস্থ্যবিধি মেনে মরদেহ দাফনের জন্য প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে বলা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘দাফনের আগে মরদেহ বাংলা একাডেমিতে নিয়ে যাওয়া, জানাজাসহ সব কর্মসূচি বাতিল করা হয়েছে। আমরা তো চেয়েছিলাম, দাদার কবরের পাশে আজিমপুরে দাফন করতে। এখন হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ এবং প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে আমাদের জানাবে, কীভাবে মরদেহ দাফন করা যায়।’

জাতির মনন গঠনে আজন্ম অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন আনিসুজ্জামান। দেশের যেকোনো ক্রান্তিকালে তিনি ছিলেন অগ্রসেনানী। তার কলমে উঠে এসেছে দেশ বিভাগ, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ। দেশের অভিভাবকতুল্য এই শিক্ষাবিদকে হারানোর শোক প্রকাশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেইসবুক যেন হয়ে উঠেছে শোকবই। বাংলাদেশের শিক্ষা-সংস্কৃতির এই উজ্জ্বল দিকপালের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে শোকের ছায়া নেমে আসে দেশজুড়ে।

তার মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এছাড়া জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ ও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও সংসদে বিরোধীদলীয় উপনেতা জিএম কাদের গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন।

শোকবার্তায় রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান ছিলেন বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। দেশে শিক্ষার মান উন্নয়নে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।’ রাষ্ট্রপ্রধান আরও বলেন, ‘তার মৃত্যু সত্যিকারার্থেই বাংলাদেশের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি।’ রাষ্ট্রপতি হামিদ মরহুমের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে পড়ার দিনগুলোতে আনিসুজ্জামানকে পেয়েছিলেন শিক্ষক হিসেবে। গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে প্রয়াত শিক্ষকের কথা স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী তার শোকবার্তায় বলেন, ‘আমি ছিলাম স্যারের টিউটোরিয়াল গ্রুপের শিক্ষার্থী।’ শোকবার্তায় প্রধানমন্ত্রী শিক্ষা ক্ষেত্রসহ ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধসহ সব গণতান্ত্রিক আন্দোলনে অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের অবদান শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। তিনি বলেন, ‘তার মৃত্যুতে দেশ ও জাতি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং শিক্ষা ক্ষেত্রে এক উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ককে হারাল।’

অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মৃত্যুতে গভীর শোক জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, গণফোরামের সভাপতি ড. কামাল হোসেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম, সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কেএম খালিদসহ অনেকে। এছাড়া বাংলা একাডেমি, শিল্পকলা একাডেমি, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন, আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদসহ বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন শোকপ্রকাশ করেছে। তার মৃত্যুতে গভীর শোকপ্রকাশ করে বিবৃতি দেওয়া হয়েছে ভারতের সিপিআই (এম) ত্রিপুরা রাজ্য সম্পাদকম-লীর পক্ষ থেকে।

আনিসুজ্জামানের পুরো নাম আবু তৈয়ব মোহাম্মদ আনিসুজ্জামান। ১৯৩৭ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনা জেলার বসিরহাট মহকুমায় মোহাম্মদপুর গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা বিখ্যাত হোমিও চিকিৎসক আবু তাহের মোহাম্মদ মোয়াজ্জেম ও মাতা গৃহিণী সৈয়দা খাতুন। লেখালেখির অভ্যাস ছিল সৈয়দা খাতুনের। আনিসুজ্জামানের পিতামহ শেখ আবদুর রহিম ছিলেন লেখক ও সাংবাদিক। আনিসুজ্জামানরা পাঁচ ভাই-বোন।

আনিসুজ্জামানের রচিত ও সম্পাদিত বিভিন্ন গ্রন্থ আমাদের শিল্প-সংস্কৃতি ও ইতিহাসের বিবেচনায় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তার প্রবন্ধ-গবেষণা গ্রন্থের মধ্যে মুসলিম মানস ও বাংলা সাহিত্য, মুসলিম বাংলার সাময়িকপত্র, স্বরূপের সন্ধানে, আঠারো শতকের বাংলা চিঠি, আমার একাত্তর, মুক্তিযুদ্ধ এবং তারপর, আমার চোখে, বাঙালি নারী : সাহিত্যে ও সমাজে, পূর্বগামী, কাল নিরবধি, বিপুলা পৃথিবী উল্লেখযোগ্য। তিনি বেশকিছু উল্লেখযোগ্য বিদেশি সাহিত্যের অনুবাদও করেছেন এবং নানা বিষয়ে বই সম্পাদনা করেছেন। শিক্ষা, শিল্প-সাহিত্য ও সাংগঠনিক ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, অলক্ত পুরস্কার, একুশে পদক, আলাওল সাহিত্য পুরস্কার, বেগম জেবুন্নেসা ও কাজী মাহবুবউল্লাহ ট্রাস্ট পুরস্কার (১৯৯০), দেওয়ান গোলাম মোর্তাজা স্মৃতিপদক (১৯৯৩), অশোককুমার স্মৃতি আনন্দ পুরস্কার (১৯৯৪) পেয়েছেন। এছাড়া তিনি ভারতীয় রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ‘পদ্মভূষণ’ ও রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানসূচক ডি.লিট সম্মাননা পেয়েছেন।

আনিসুজ্জামান ১৯৫১ সালে নবাবপুর গভর্নমেন্ট হাইস্কুল থেকে প্রবেশিকা বা ম্যাট্রিক ও জগন্নাথ কলেজ থেকে ১৯৫৩ সালে আইএ পাস করে বাংলায় ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯৫৬ ও ১৯৫৭ সালে স্নাতক সম্মান ও এমএতে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করেন তিনি। ১৯৫৮ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করার জন্য যোগদান করেন। ১৯৫৮ সালেই বাংলা একাডেমি বৃত্তি পেয়েও তা ছেড়ে দিয়ে মাত্র ২২ বছর বয়সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে অ্যাডহক ভিত্তিতে তিন মাসের জন্য যোগ দেন আনিসুজ্জামান। এরপর ১৯৬৯ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন। ১৯৭১ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত তিনি সেখানেই ছিলেন।

১৯৭৪-৭৫ সালে কমনওয়েলথ অ্যাকাডেমি স্টাফ ফেলো হিসেবে তিনি লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজে গবেষণা করেন। জাতিসংঘ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা-প্রকল্পে অংশ নেন ১৯৭৮ থেকে ১৯৮৩ পর্যন্ত। ১৯৮৫ সালে তিনি চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে আসেন। সেখান থেকে অবসর নেন ২০০৩ সালে। ২০১৮ সালের জুলাই মাসে সরকার তাকে জাতীয় অধ্যাপকে পদে সম্মানীত করে। তিনি মওলানা আবুল কালাম আজাদ ইনস্টিটিউট অব এশিয়ান স্টাডিজ (কলকাতা), প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয় এবং নর্থ ক্যারোলাইনা স্টেট ইউনিভার্সিটিতে ভিজিটিং ফেলো ছিলেন। এছাড়া তিনি নজরুল ইনস্টিটিউট ও বাংলা একাডেমির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত