দেশে করোনা মহামারী ক্রমাগত ঘনীভূত রূপ নিচ্ছে। আর এ সময়েই শুরু হয়ে গেছে ডেঙ্গুর মৌসুম। করোনার পাশাপাশি ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়ে গেলে তা ভয়াবহ বিপদ ডেকে আনতে পারে পুরো দেশে। বিশেষত ডেঙ্গুজ্বরের উপসর্গগুলো করোনার উপসর্গের কাছাকাছি হওয়ায় ডেঙ্গু না করোনা সেটা শনাক্ত করাই মুশকিল হয়ে উঠতে পারে। এদিকে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে যে হারে ডেঙ্গুর সংক্রমণ ঘটেছে তাতে এ বছরও ডেঙ্গুর প্রকোপ মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে বলে ইতিমধ্যেই সতর্ক করেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। গত বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছিলেন ৪৮ জন। এবার মার্চের ১৭ তারিখ পর্যন্ত ভর্তি হয়েছেন ২৬৩ জন। এই হিসাবে দেখা যাচ্ছে প্রথম তিন মাসেই গত বছরের তুলনায় ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বেড়েছে ছয় গুণেরও বেশি। একইসঙ্গে এবার বসন্তকালের শুরুতেই ঢাকায় ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার জীবাণুবাহী এডিস মশার ঘনত্ব অনেক বেশি দেখা যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন কীটতত্ত্ববিদরা। এখনই প্রতিরোধমূলক সর্বাত্মক পদক্ষেপ নেওয়া না হলে করোনা মহামারীর মধ্যে মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে উঠতে পারে ডেঙ্গু ও চিকনগুনিয়া।
মশার কামড়ের মাধ্যমে ছড়ানো ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়াতেও ভাইরাসজনিত অন্যান্য রোগের মতোই উপসর্গ শুরু হয় জ্বর দিয়ে। জ্বর, শরীরব্যথা বা শরীর ম্যাজম্যাজ, অরুচি, বমিভাব, বমি ও ক্লান্তি ডেঙ্গুর প্রাথমিক লক্ষণ। তবে, সাধারণ ইনফ্লুয়েঞ্জা আর করোনায় এসব উপসর্গের সঙ্গে গলাব্যথা ও শুকনো কাশিও থাকে। এদিকে ডেঙ্গুর উপসর্গগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রচণ্ড মাথাব্যথা, শরীরব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, শরীরে র্যাশ ওঠা। তবে প্রতি বছর ডেঙ্গুর ধরন খানিকটা পাল্টায়। ফলে কাশি হওয়াও বিচিত্র নয়। বমি ও ডায়রিয়াও হতে পারে। আর করোনা ও ডেঙ্গু উভয় রোগেই চোখ লাল হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখন ১০১ ডিগ্রি ফারেনহাইটের ওপর উঠলে সতর্কভাবে উপসর্গগুলো লক্ষ করা এবং চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। সরকারের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরও চলতি মৌসুমে জ্বর হলে করোনার সঙ্গে সঙ্গে ডেঙ্গু পরীক্ষারও পরামর্শ দিচ্ছে। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো, সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে করোনা পরীক্ষা করানো যেমন কষ্টসাধ্য বিষয়ে পরিণত হয়েছে, তেমনি অন্যান্য রোগীর চিকিৎসাসেবাও অনেকটা ভেঙে পড়েছে। ফলে, করোনাই হোক কিংবা ডেঙ্গু, সাধারণ মানুষের জন্য পরীক্ষার মাধ্যমে রোগ শনাক্ত করার ব্যবস্থা সহজ করতে বিশেষ পদক্ষেপ নিতে হবে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য মতে, গত বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মারা যান ১৭৯ জন। মোট আক্রান্ত হয়েছিলেন ১ লাখ ১ হাজার ৩৫৪ জন। যার মধ্যে ৪৯ হাজার ৫৪৪ জন ছিলেন ঢাকার বাইরের। অর্থাৎ অর্ধেকেরও বেশি ডেঙ্গু রোগী ছিলেন ঢাকায়। ফলে রাজধানী ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এলাকা যে ডেঙ্গুর হটস্পট সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে চলতি মৌসুমে ডেঙ্গু প্রতিরোধে এতদিনেও উল্লেখযোগ্য কোনো কার্যক্রম দেখা যায়নি। উল্লেখ্য, শুক্রবার বিকেলেই প্রথমবারের মতো ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের নবনির্বাচিত মেয়র ও কাউন্সিলররা প্রথম বোর্ড সভায় যোগ দেন। অনলাইনে এই ভার্চুয়াল বোর্ড সভায় এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে নবনির্বাচিত ওয়ার্ড ও সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলরদের আহ্বান জানান মেয়র আতিকুল ইসলাম। নির্ধারিত গুণ ও পরিমাণ বজায় রেখে মশার কীটনাশক ছিটানো হচ্ছে কি না, তা তদারকির জন্য কাউন্সিলরদের সতর্ক করেছেন মেয়র। এদিকে, শনিবার বিকেলেই ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন শেখ ফজলে নূর তাপস। এদিন অনলাইনে সাংবাদিকদের ব্রিফিং করলেও ১৭ মে প্রথম অফিস করার মধ্য দিয়ে মেয়রের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু করবেন নবনির্বাচিত মেয়র তাপস।
গত ১ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে জয়লাভ করে উত্তরে আতিকুল ইসলাম ও দক্ষিণে ফজলে নূর তাপস মেয়র নির্বাচিত হন। উত্তরে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও দক্ষিণে বিদায়ী মেয়র এতদিন দায়িত্ব পালন করেছেন। কিন্তু করোনার মহাদুর্যোগে রাজধানীর বাসিন্দাদের সুরক্ষায় জনস্বাস্থ্য সংশ্লিষ্ট তেমন কোনো কার্যক্রম দেখা যায়নি ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের। এখন নবনির্বাচিত মেয়ররা করোনাকালে নতুন আতঙ্কের সঞ্চার করা ডেঙ্গুজ্বর প্রতিরোধে কতটা সাফল্য দেখাতে পারেন তা অবশ্যই নাগরিকরা বিশেষভাবে খেয়াল করবেন। এ অবস্থায় সিটি করপোরেশন পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম এবং যথাযথভাবে মশার ওষুধ ছিটিয়ে নগরবাসীর ডেঙ্গুর শঙ্কা কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে। করোনা ও ডেঙ্গু দুটি রোগই চিকিৎসার চেয়ে আগেই প্রতিরোধ করা জরুরি। তাই নাগরিকদেরও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা এবং নিজ নিজ এলাকা ও বাড়ির ভেতর ও আশপাশ পরিষ্কার রাখায় সচেতন হতে হবে। নইলে করোনার সঙ্গে ডেঙ্গুর মহামারী শুরু হলে সবাইকেই ভয়াবহ পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হবে।
