আন্দ্রিয়া পির্লো : ফুটবল মাঠের নিঃশব্দ নেতা

আপডেট : ১৯ মে ২০২০, ০৫:২৪ এএম

আন্দ্রিয়া পির্লোর জীবনে মে মাস গুরুত্বপূর্ণ খুব। ১৯ মে তার জন্ম। আন্তর্জাতিক ফুটবলে অভিষেক তার এই মে মাসে। আর মে-তেই তিনি অবসরও নেন।

২০১৮ সালে ইতালি কিংবদন্তির বিদায় অনুষ্ঠান হয়েছিল মিলানের সান সিরোতে। তারকাখচিত সেই অনুষ্ঠানের নাম ছিল, ‘নাইট অফ দ্য মাস্টার’। রবার্তো বাজ্জিও, পাওলো মালদিনি, জিয়ানলুইগি বুফোনদের সঙ্গে স্টেডিয়াম সেদিন ৫০ হাজার দর্শকও উপস্থিত ছিল। বিদায় সম্ভাষণে পির্লো বলেছিলেন, ‘২১ মে আমি ফুটবল থেকে অবসর নিলাম কারণ, ২১ আমার জার্সি নম্বর ছিল। আর আমার অভিষেকও হয়েছিল মে মাসে।’

ইতালির নীল জার্সিতে ১১৬টি ম্যাচ খেলেছেন পির্লো। ২০১৭ সালের নভেম্বরে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দেন। সেই মাসেই রাশিয়া বিশ্বকাপের বাছাই পর্ব থেকে ছিটকে গিয়েছিল ইতালি। ১৯৫৮ সালের পর সেবারই প্রথম ইতালিকে ছাড়া ফুটবল বিশ্বকাপ দেখেছে দুনিয়া। পির্লোর মনে এই ঘটনা কীভাবে ছায়াপাত করেছিল? প্রশ্নটা উঠছে, কারণ ইতালি ফুটবলে তিনি সেই বিরল প্রতিভাবানদের একজন যার স্বপ্নের দিগন্ত রেখা বাস্তবের জমিনে এসে মিশে গিয়েছিল। যা স্বপ্ন দেখেছিলেন তা অর্জনও করেছিলেন। দেশের হয়ে ২০০৬ বিশ্বকাপ জিতেছিলেন পির্লো। তার ঝুলিতে রয়েছে দুটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ট্রফি এবং ছয়টি সিরি ‘এ’। এর সঙ্গে অলিম্পিকের ব্রোঞ্জ, ইউরো কাপের রানার্স-আপ শিরোপা, কনফেডারেশন্স ব্রোঞ্জ ও একটা বিশ্ব ক্লাবকাপ শিরোপা যোগ করুন দেখবেন এমন এক বিরল নজির তৈরি হচ্ছে, যার সমান কিছু ফুটবল বিশ্বে দুর্লভ। এখানে সচেতনভাবে বলে রাখা ভালো, ফুটবল টিম গেম বলে পির্লোর কৃতিত্বকে খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। কারণ বিশ্বজয়ী ইতালিয়ান কোচ মার্সেলো লিপ্পির ভাষায়, ‘পির্লো হলো নিঃশব্দ নেতা। ও পা দিয়ে কথা বলে।’

পির্লোর খেলার ধরনে পুরাতন মিডফিল্ডারদের সৃষ্টিশীল স্টাইল খুঁজে পান অনেকেই। তবে স্পেনের জাভির মতো ‘বক্স টু বক্স’ মিডফিল্ডারের ভূমিকাতেও সফল ছিলেন পির্লো। দলের প্রয়োজনে খেলেছেন ‘ডিপ লাইং মিডফিল্ডার’ হিসেবেও। ইতালির ডিফেন্সিভ থার্ড ও মিডল থার্ডের বিস্তৃত অঞ্চলের নেতা ছিলেন তিনি। ছিলেন আক্রমণ ভাগের প্রধান কারিগরও। বেশি গোল করতেন না। বরাবর গোল করাতেই পছন্দ করতেন। জুভেন্তাস তার নাম দিয়েছিল ‘আর্কিটেক্টো’ আন্দ্রে পির্লো। আজ্জুরিদের কাছেও তাই ছিলেন। আধুনিক ফুটবলের পেস-পাওয়ার-অ্যাথলেটিজমের বিরুদ্ধে তিনি যুদ্ধ করেছেন মস্তিষ্ক দিয়ে। ওটাই তার সেরা অস্ত্র।

আরও একটা অস্ত্র ছিল তার। সেটা ‘ফ্রি-কিক।’ আত্মজীবনী ‘আই থিঙ্ক দেয়ারফর আই প্লে’তে পির্লো লিখেছিলেন, ‘আমার ফ্রিকিকে সাফল্য সবই ব্রাজিলিয়ান জুনিনহোকে দেখে। লিওঁতে ওর ম্যাচ ভিডিও চালিয়ে শিখেছি অনেক। আমার মধ্যে একটু ব্রাজিলিয়ান ব্যাপার আছে। ব্রাজিলিয়ানরা আমাকে পির্লিনহো বলে ডাকতে পারেন। আমি যখন ফ্রিকিক নিতে চাই, তখন ভাবি পর্তুগিজ ভাষায়, গোল হলে উদযাপন করি ইতালি স্টাইলে।’

এসি মিলান, ইন্টার মিলান হয়ে ২০১১ সালে পির্লো যোগ দেন জুভেন্তাসে। সেই ঘটনা সম্পর্কে বুফন বলেছিলেন, ‘আন্দ্রিয়া যখন কথাটা আমায় বলে, তখন প্রথমেই মনে হয়েছিল ঈশ্বর আসছেন আমাদের ক্লাবে।’ ২০১৫ সাল পর্যন্ত জুভেন্তাসে ছিলেন পির্লো। খেলেছেন সেরা ফর্মে। বরাবরের মতোই আড়ালে থেকে। এটাই তার স্টাইল। সাংবাদিক মিচেল কক্স একবার লিখেছিলেন, ‘পির্লো কি তার প্রজন্মের সেরা ফুটবলার? হয়তো না। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তো বটেই।’

বিপুল উত্তেজনায় নিস্পৃহ থেকে কীভাবে বিশ্বকাপ জিততে হয় তার সেরা উদাহরণ পির্লো। ২০০৬ সালের বিশ্বকাপ ফাইনাল হয়েছিল ৯ জুলাই বার্লিনে। আগের রাতে ভিডিও গেম খেলেছিলেন পির্লো। আত্মজীবনীতে লিখেছেন, ‘কোনো চাপ অনুভব করিনি। ফাইনালের আগে ভিডিও গেম খেলে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। পরের দিন বিকেলে মাঠে নেমে বিশ্বকাপ জিতলাম।’

পির্লো এমনই। বরাবর ইতালি দলের প্রাণভোমরা। অথচ তিনি তা নিয়ে মোটেই সচেতন নন। তাকে ঘিরে দলের ফুটবল আবর্তিত হতো, আর তিনি ‘নিরুদ্দেশের পথিক’ হয়ে দূরে দূরে থাকতেন।

২০১৪ সালের বিশ্বকাপের আগে পাওলো মালদিনি ইতালির বিখ্যাত দৈনিক গাজ্জেত্তা দেল্লোতে দামি একটা কথা লিখেছিলেন, ‘আন্দ্রিয়া হলো আমাদের দলটার মেরুদ-। সব পাসই ওর মাধ্যমে খেলতে হবে। ও লং পাস খেলতে পারে, ও শর্ট পাস খেলতে পারে। এমন ফুটবলার খুব কম আছে বিশ্বে।’

এর সঙ্গে পির্লোর বরফ-শীতল মাথাটা যোগ করুন। দেখবেন পৃথিবীতে তার তুলনা নেই।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত