স্বজনদের অভিযোগ

লাইফ সাপোর্টে নেওয়া নিয়ে মিথ্যা বলছে ইউনাইটেড

আপডেট : ৩০ মে ২০২০, ০৬:০৭ এএম

রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালের ‘করোনা ইউনিটে’ আগুন লেগে মারা যাওয়া পাঁচ রোগীর অন্তত তিনজন লাইফ সাপোর্টে ছিলেন না বলে দাবি করেছেন তাদের স্বজনরা। তারা বলছেন, লাইফ সাপোর্টে নেওয়ার জন্য তাদের অনুমতি নেওয়া হয়নি এবং কোনো কাগজপত্রেও তারা স্বাক্ষর করেননি। তাদের অভিযোগ, ইউনাইটেড হাসপাতাল নিজেদের বাঁচাতে মিথ্যা বলছে। তারা রোগীদের লাইফ সাপোর্টে নিয়ে থাকলে সে কাগজপত্র দিতে হবে।

এ ব্যাপারে নিহত বাকি দুজনের স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তিনজনের স্বজন লাইফ সাপোর্ট নিয়ে যে অভিযোগ করেছেন সে ব্যাপারে প্রতিষ্ঠানটির কমিউনিকেশন অ্যান্ড বিজনেস ডেভেলপমেন্টের প্রধান ডা. সাগুপ্তা আনোয়ার গতকাল শুক্রবার  দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তাদের এ অভিযোগ সঠিক নয়।’ এ ব্যাপারে পুলিশের গুলশান বিভাগের উপকমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী বলেন, ‘এ বিষয়ে তদন্ত চলছে। তদন্তে আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখব।’

এদিকে ইউনাইটেড হাসপাতালের চেয়ারম্যান হাসান রাজা এক মাস আগেই করোনা ইউনিটের অনুমতি পাওয়ার দাবি জানালেও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর গতকাল জানিয়েছে, তাদের সে অনুমতি দেওয়া হয়নি।

গত বুধবার রাতে ইউনাইটেড হাসপাতালের বর্ধিত অংশে আগুন লেগে প্রাণ হারান মোহাম্মদ মাহবুব (৫০), মনির হোসেন (৭৫), ভেরন অ্যান্থনি পল (৭৪), খোদেজা বেগম (৭০) ও রিয়াজুল আলম (৫০)। তাদের মধ্যে প্রথম তিনজন করোনা আক্রান্ত ছিলেন। বাকি দুজনের করোনা নেগেটিভ ছিল।

পরদিন বৃহস্পতিবার হাসপাতালের গেটে ডাকা সংবাদ সম্মেলনে ডা. সাগুপ্তা আনোয়ার দাবি করেছিলেন, মারা যাওয়া পাঁচ রোগীর অবস্থাই ছিল ক্রিটিক্যাল এবং তারা আইসিইউতে লাইফ সাপোর্টে ছিলেন।

আগুনে মারা যাওয়া রিয়াজুল বুধবার বিকেলেই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন এবং তার করোনা রিপোর্ট নেগেটিভ ছিল। এ বিষয়ে সাগুপ্তা আনোয়ার বলেছিলেন, তার করোনা নেগেটিভ হলেও শারীরিক অবস্থা খারাপ ছিল। তবে রিয়াজুল করিম লিটনের স্ত্রী ফৌজিয়া আক্তার জেনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘এটা ডাহা মিথ্যা কথা। সন্ধ্যার সময় যে মানুষটা ভাত খেয়েছে, আমাকে জানানো হলো তিনি ভালো আছেন, সেই মানুষটা কী করে হাইলি সাসপিসিয়াস হন? তাকে কখন লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়েছে? যদি ওদের কথা সত্যও ধরে নিই, তাহলে কার অনুমতি নিয়ে তারা তাকে লাইফ সাপোর্টে নিয়েছেন?’ ফৌজিয়া বলেন, ‘সে (রিয়াজুল) একদম ভালো ছিল, কেবল অল্প জ্বর আর হালকা শ্বাসকষ্ট নিয়ে হেঁটে হেঁটে হাসপাতালে ঢুকল। কেবল অক্সিজেনের জন্য হাসপাতালে নিলাম। বাচ্চা ছোট থাকায় এক আত্মীয় আর গাড়িচালককে রেখে বাচ্চাকে নিয়ে চলে আসি। সন্ধ্যার দিকে কল করলাম, আমাকে বলা হলো আপনার রোগী ভালো আছে, সে ডিনার করেছে। তাহলে পৌনে ১০টার দিকে তাকে কী করে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়, তার অবস্থা কি এত খারাপ ছিল? আর খারাপ হলে, কার অনুমতি নিয়ে তাকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়েছে, আমাকে জানাতে হবে।’

অগ্নিকাণ্ডে মারা যাওয়া খোদেজা বেগমের ছেলে আলমগীর হোসেনও বলেছেন তার মা লাইফ সাপোর্টে ছিলেন না। ঈদের আগের দিন মাকে ভর্তি করেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘মূলত শ্বাসকষ্ট হওয়ায় তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য এই হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। উন্নত চিকিৎসার আশায় মাকে ভর্তি করিয়েছিলাম, কিন্তু সেখানে নিয়ে মাকে মেরেই ফেললাম।’ পাঁচ রোগীই লাইফ সাপোর্টে ছিল ইউনাইটেডের এমন দাবির বিষয়ে আলমগীর বলেন, ‘ওরা পুরোটাই মিথ্যা বলেছে। বাকি চারজনের কথা জানি না, আমার মাকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়নি। লাইফ সাপোর্টে নিতে হলে তো আমাদের অনুমতি লাগবে। আমাদের বলতে হবে। সেগুলো তো তারা কিছুই করেনি। সেখানে লাইফ সাপোর্টের কোনো ব্যবস্থাই ছিল না, অক্সিজেন সিলিন্ডার ছিল। কিন্তু লাইফ সাপোর্ট আর অক্সিজেনে পার্থক্য রয়েছে।’

অগ্নিকাণ্ডে মারা যাওয়া ভেরন অ্যান্থনি পলের ছেলে এন্দ্রে ডোমিনিক পল বলেন, ‘ওখানে তো কোনো লাইফ সাপোর্টের ব্যবস্থাই ছিল না, কেবল অক্সিজেন ছিল। লাইফ সাপোর্ট দেবে কীভাবে? বাবাকে অক্সিজেন সাপোর্ট দেওয়া হয়েছিল। আমার কাছে বিল আছে, সেখানে লাইফ সাপোর্টের কিছু উল্লেখ নেই, ওরা এত মিথ্যা কথা বলছে কেন? ইউনাইটেডকে দেখাতে হবে, তাদের বিলের মধ্যে কোথায় লাইফ সাপোর্টের কথা মেনশন করা রয়েছে।’ ভেরন অ্যান্থনি পলকে গত ২৫ মে হাসপাতালে ভর্তি করা হয় জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমার বাবাকে যদি লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়, তাহলে পরিবারকে জানাতে হবে, অনুমতি নিতে হবে। ইউনাইটেড কার অনুমতি নিয়েছে, সেটা তারা বলুক। আমার বাবা ভালো হচ্ছিল, সেদিনও তাকে মুখে তুলে খাওয়ানো হয়েছে, তাহলে লাইফ সাপোর্টের কথা বলে কী করে?’

নিহতদের স্বজনদের অভিযোগ অস্বীকার করে ইউনাইটেড হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. সাগুপ্তা আনোয়ার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সব রোগী হাই ফ্লো ফ্লাই অক্সিজেন সাপোর্টে ছিলেন। এটিকেই আমরা লাইফ সাপোর্ট বলছি। সেখানে দুজনকে ভেন্টিলেটর লাইনের মাধ্যমে বিআইপিএপি (বিশেষ যন্ত্রের সহায়তায় অক্সিজেন দেওয়া) সহায়তা দেওয়া হচ্ছিল।’ তিনি বলেন, ‘এ ধরনের সাপোর্ট দেওয়ার জন্য রোগী বা তাদের পরিবারের কারও অনুমোদন বা সম্মতির প্রয়োজন হয় না।’ সাগুপ্তা আনোয়ার আরও বলেন, ‘তাদেরকে প্রচলিত লাইফ সাপোর্ট বলতে যা বুঝায় অর্থাৎ কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাসে বাঁচিয়ে রাখা সেটা আমরা কখনো বলিনি। আমাদের আইসোলেশন ইউনিটটি অত্যাধুনিক আইসিইউ সুবিধা সংবলিত ছিল।’

করোনা ইউনিটের অনুমতি ছিল না : স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক আমিনুল হাসান জানিয়েছেন, ইউনাইটেড হাসপাতালের করোনা ইউনিটের অনুমতি ছিল না। তিনি বলেন, কোনো হাসপাতালের নতুন ইউনিট বা ওয়ার্ড বাড়াতে হলে অধিদপ্তরের অনুমতি নিতে হবে এবং নির্দেশনা মেনে চলতে হবে। তারা সেটা করেনি। তবে ইউনাইটেড হাসপাতালের চেয়ারম্যান হাসান রাজা গত বৃহস্পতিবার দাবি করেন, তারা এক মাস আগে অধিদপ্তর থেকে অনুমতি নিয়েছেন। এ ব্যাপারে ডা. সাগুপ্তা গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকারের নির্দেশনা মেনে আমরা পাঁচ শয্যাবিশিষ্ট একটা আইসোলেশন সেন্টার করেছি। সেটা মূল ভবনের সঙ্গে ছিল।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত