আগামী বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের দুর্বলতা কাটাতে পদক্ষেপ থাকা অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। কারণ করোনা পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য খাতের ভয়াবহ ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা জনসমক্ষে উন্মুক্ত হয়েছে। এসব দুর্বলতা ঘুচিয়ে দেশের মানুষকে বাঁচিয়ে রাখাই হবে এবারের বাজেটের মূল লক্ষ্য। একই কারণে শিল্প উৎপাদন থমকে আছে। কর্মসংস্থান কমছে। প্রবাসী শ্রমিকরা বেকার হয়ে দেশে ফেরত এসেছে। অর্থনীতির এ পরিস্থিতির গভীর উপলব্ধি থাকা উচিত সরকারের চিন্তা-ভাবনায়।
গতকাল ‘কভিড-১৯ এবং জাতীয় বাজেট ২০২০-২১ : নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য কৌশল পুনর্বিবেচনা’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় এ মতামত দিয়েছেন তারা। একই বিষয়ে একটি সমীক্ষার ফলাফল প্রকাশ উপলক্ষে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে এ আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। ব্র্যাক, ডেটা সেন্স ও উন্নয়ন সমন্বয় যৌথভাবে এ সমীক্ষা পরিচালনা এবং আলোচনা সভার আয়োজন করে।
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ এবং পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) চেয়ারম্যান ও ব্র্যাকের চেয়ারপারসন ড. হোসেন জিল্লুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান। ব্র্যাকের ঊর্ধ্বতন পরিচালক কেএএম মোর্শেদের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন আইসোশ্যালের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. অনন্য রায়হান।
আলোচনায় ড. আতিয়ার রহমান বলেন, মানুষকে আগে বাঁচাতে হবে, তারপর স্বপ্নপূরণ আর সুখে থাকার চিন্তা। তাই এবারের বাজেট হোক বেঁচে থাকার বা টিকে থাকার বাজেট। কভিড-১৯-এর এ মহামারীতে সবচেয়ে হুমকির মুখে স্বাস্থ্যব্যবস্থা। মধ্যবিত্তরাই চিকিৎসাসেবা পাবেন কি না সেই আতঙ্কে আছেন, দরিদ্রদের অবস্থা তো আরও করুণ। তাদের শুধুু খাবার দিলেই হবে না। চিকিৎসা এবং নগদ অর্থ সহায়তা দিতে হবে। আগামী কয়েক মাস এ সহায়তা চালিয়ে যেতে হবে। তিনি বলেন, স্বাস্থ্য খাতেই এবারের বাজেটে মূল নজর দিতে হবে। ১ শতাংশ থেকে এ খাতের বাজেট পর্যায়ক্রমে ৪ শতাংশে নিতে হবে। তবে অর্থের অপচয় অপব্যবহার সম্পর্কেও সচেতন থাকতে হবে। ড. আতিউর বলেন, স্বাস্থ্য খাতেই বিদেশি বিনিয়োগ প্রয়োজন এবং সেই সুযোগ রয়েছে। স্বাস্থ্য খাত ঠিক না করলে বিদেশি বিনিয়োগ আসবে না, অর্থনীতিও এগোবে না।
হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, পরিস্থিতির কারণে স্বাস্থ্য খাত অর্থনীতির খাতে পরিণত হয়েছে। এ খাতের ব্যবস্থাপনায় ধসের পরিস্থিতিতে এখন ব্যাপক সংস্কার প্রয়োজন। হাসপাতালের সংখ্যা বাড়াতে হবে। প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়াতে হবে। আক্রান্ত হলে সেবা এ নীতি থেকে বেরিয়ে আক্রান্ত না হওয়ার জন্য পরিচ্ছন্নতা ব্যবস্থা উন্নয়নসহ সুস্বাস্থ্যের প্রতি মনোযোগ দিতে হবে। এ বিষয়ে একটি জাতীয় টাস্কফোর্স গঠন এবং প্রত্যেক মন্ত্রণালয়ভিত্তিক বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি কমিটি গঠন করতে হবে। প্রত্যেক পৌরসভার জন্য এক হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ, প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তির পরিমাণ ১০০ থেকে ৫০০ টাকায় উন্নীত করতে হবে। নগর প্রাথমিক চিকিৎসায় এবং বাস্তবায়ন দক্ষতা বৃদ্ধিতে বিশেষভাবে মনোযোগ দেওয়ার কথা বলেছেন তিনি।
ভিডিও কনফারেন্সে আলোচনায় অংশ নিয়ে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড. নাজনীন আহমেদ বলেন, নিম্ন আয়ের মানুষদের বাঁচিয়ে রাখার প্রণোদনা বা ভর্তুকির ব্যবস্থা রাখতে হবে। এখন অনলাইন ব্যবসায়ের উদ্যোক্তা বেড়েছে। এসব কারণে এবারের বাজেটে স্মার্টফোন সুলভ করে ইন্টারনেট খরচ কমাতে হবে। ব্র্যাক ইনস্টিটিউটের গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইমরান মতিন বলেন, জনগণের আতঙ্ক স্বাস্থ্য খাতে অবকাঠামো ও মানবসম্পদ বাড়াতে হবে। উপজেলা ও গ্রামীণ পর্যায়েও সার্বক্ষণিক ডাক্তার ও স্বাস্থ্যকর্মী, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম রাখতে হবে।
১০ কোটি ২২ লাখ মানুষ অর্থনৈতিক ও স্বাস্থ্যঝুঁকিতে : করোনার কারণে ১০ কোটি ২২ লাখ মানুষ অর্থনৈতিক ও স্বাস্থ্যগত দুর্বলতার ঝুঁকিতে রয়েছেন। প্রায় ৭৪ শতাংশ পরিবারের উপার্জন কমে গেছে। ১৪ লাখেরও বেশি প্রবাসী শ্রমিক চাকরি হারিয়ে দেশে ফিরে এসেছেন। ২৫ জেলায় দৈবচয়নে নির্বাচিত ৯৬২ জন উত্তরদাতার অংশগ্রহণে মে মাসের ১৫-১৮ তারিখের মধ্যে এ জরিপ করা হয়। এতে দেখা যায়, অর্থনৈতিক ও স্বাস্থ্যগত ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীর মধ্যে ৫ কোটি ৩৬ লাখ মানুষ চরম দরিদ্র। এদের মধ্যে নতুন করে চরম দরিদ্র হয়ে পড়া পরিবারগুলোও রয়েছে। উচ্চ অর্থনৈতিক ঝুঁকিতে থাকা চরম দরিদ্রের সংখ্যা ৪ কোটি ৭৩ লাখ এবং উচ্চ স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছেন ৩ কোটি ৬৩ লাখ মানুষ।
