বাংলাদেশের সাবেক অধিনায়ক হাবিবুল বাশার এখন অন্যতম নির্বাচক। ক্যারিয়ারে ৫০টি টেস্ট এবং ১১১টি ওয়ানডে খেলেছেন। ২০০৪ থেকে ২০০৭ পর্যন্ত দুই সংস্করণে নেতৃত্ব দিয়েছেন দেশকে। নিজের সময়ের সফলতম এই ব্যাটসম্যান যাদের সঙ্গে খেলেছেন তাদের নিয়ে একটি সেরা একাদশ বানিয়েছেন, যা প্রকাশিত হয় ‘ক্রিকেট মান্থলি’ সাময়িকীতে। দেশ রূপান্তরের পাঠকের জন্য তা তুলে ধরা হলো।
তামিম ইকবাল : আকরাম ভাইয়ের (তামিমের চাচা, বাংলাদেশের সাবেক অধিনায়ক) কাছে জেনেছিলাম, তার ভাতিজা বিশাল বিশাল মার দিতে জানে। প্রথমবার তামিমকে দেখি জিম্বাবুয়েতে, ২০০৭ বিশ্বকাপের ঠিক আগে। ডাউন দ্য উইকেটে নেমে গিয়ে মারটা ছিল তার সিগনেচার শট। বিধ্বংসী। কারও বিপক্ষে পাওয়ার প্লের সুবিধা নিতে হলে তামিমকে আমরা কাজে লাগাতাম। কমপ্লিট এক ওপেনিং ব্যাটসম্যান। অনেক ব্যাটসম্যান পেসের বিপক্ষে অসাধারণ হলেও স্পিনের বিপক্ষে প্রশ্নবিদ্ধ। তামিম স্পিনও খুব শাসন করতে জানে। রান করতে পারে যে কোনো কন্ডিশনে।
জাভেদ ওমর : তামিমের ওপেনিং পার্টনার হিসেবে আমার অন্য পছন্দের ব্যাটসম্যান মেহরাব হোসেন অপি ও শাহরিয়ার হোসেন বিদ্যুৎ। তবে তারা আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে জায়গা পাকা করতে পারেনি। জাভেদ ওমর ৪০ টেস্ট খেলেছে। নতুন বল খেলতে জানে, দাঁতধকামড়ে পড়ে থাকতে জানে। আমার সময়ের আরেক সেরা ব্যাটসম্যান তামিমের ভাই নাফিস ইকবাল। ভালো টেকনিক ছিল তার। শাহরিয়ার নাফীসও ভালো খেলোয়াড়। তবে জাভেদ বাংলাদেশের ক্রিকেটের সংগ্রামের সময়গুলোতে রান করেছে।
আল শাহরিয়ার রোকন : আরেক দারুণ প্রতিভাবান ব্যাটসম্যান। অনেক সামর্থ্য ছিল। নতুন বল সামলানোর সঙ্গে স্পিনেও ভালো ছিল। তার ব্যাপারে নির্বাচকরা একটু কম ধৈর্য দেখিয়েছিল। ব্যাটিং অর্ডার খুব অদল বদল হতো তার। কখনো ওপেন করতো, কখনো ৬ নম্বরে ব্যাট করত। আমি বেশিরভাগ সময় ৩ নম্বরে খেলেছি। আর কেউ ওই জায়গাটা নিতে পারলে সেটা সম্ভবত রোকন। তার চারটা টেস্ট ফিফটিই ছিল দেশের বাইরে। রোকনও তার সম্ভাবনা অনুযায়ী পারফর্ম করতে পারেনি। সুযোগের সর্বোচ্চ ব্যবহারও করতে পারেনি।
মুশফিকুর রহিম (উইকেটকিপার) : ৪ নম্বরে আরও অন্তত দুজনের নাম করা যায়। আমিনুল ইসলাম বুলবুল ওই পজিশনে খুব ভালো শুরু করেছিলেন। আমাদের অভিষেক টেস্টে ভারতের বিপক্ষে সেঞ্চুরি করেছিলেন। মোহাম্মদ আশরাফুলের কথাও এই পজিশনের জন্য ভেবেছি। কিন্তু মুশফিক প্রমাণ করেছে যে কোনো কন্ডিশনে বড় রান করার ক্ষমতা আছে। ২০০৫ সালে প্রথম দেখাতেই তার আঁটোসাঁটো টেকনিক চোখে পড়েছিল। শারীরিক কাঠামো ছোট হলেও স্লগ সুইপ খুব ভালো খেলে।
সাকিব আল হাসান : সাকিবকে বোলার হয়ে ওঠার আগে ব্যাটসম্যানই জানতাম। তখন পার্টটাইম বোলার ছিল ও। ৪ নম্বর ব্যাটসম্যান ছিল। বোলিংয়ে বাড়তি মনোযোগ না দিলে তার এখন আরও বেশি টেস্ট সেঞ্চুরি থাকতে পারত। জেনুইন ক্লাস ব্যাটসম্যান। তবে বোলিংয়ের কারণে ব্যাটিং ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ওর। জানতাম ওর দীর্ঘ ক্যারিয়ার হবে। ঘরোয়া ক্রিকেটে ওকে খুব বেশি খেলতে না দেখলেও ২০০৭ বিশ্বকাপে বার্বাডোজে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ওর অপরাজিত ৫৭ রানের ইনিংস দেখে আমার উপলব্ধি হয়েছিল, তখনকার যে কোনো তরুণ খেলোয়াড়ের চেয়ে সাকিব ভালো।
আমিনুল ইসলাম বুলবুল : বুলবুল ভাই ও আকরাম ভাই আমাদের আইকনিক ক্রিকেটার ছিলেন। তবে বেশি টেস্ট খেলার সুযোগ পাননি। আরেকটু লম্বা সময় খেলতে পারলে বাংলাদেশের ক্রিকেটের বেশ কাজে আসত। অভিষেক টেস্টে আমরা খুব অনভিজ্ঞ ছিলাম। তারপরও বুলবুল ভাই আমাদের আলো দেখিয়েছিলেন। ভারতের বিপক্ষে বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে তার ১৪৫ এর চেয়ে পরে জিম্বাবুয়েতে আমাদের প্রথম টেস্ট সফরে করা তার ফিফটিটাকে আমি বেশি নম্বর দেব। বিদেশের কন্ডিশনে জিম্বাবুয়ের বোলিং আক্রমণের জন্যই এই ব্যবধান।
আফতাব আহমেদ : অপচয় হয়ে যাওয়া আরেকটা প্রতিভা। দীর্ঘ ক্যারিয়ার হতে পারত তার। আমাদের সময়ে প্রতিপক্ষ যাদের গোনায় ধরত তাদের একজন ছিল সে। ডারহামে ইংল্যান্ডের ভয়ানক বোলিংয়ের বিপক্ষে ৮২ রান করেছিল ও। টেস্টে ৬ ও ৭ নম্বরে ব্যাট করার সামর্থ্য ছিল, পেস ও স্পিনের বিপক্ষে সমান ভালো ছিল আফতাব।
মোহাম্মদ রফিক : ঘণ্টার পর ঘণ্টা ক্লান্তিহীনভাবে বল করে যেতে পারত। রফিকের খুব টার্ন কিংবা বৈচিত্র্য ছিল না। তবে খুব বিপজ্জনক আর্ম বল ছিল। বলকে কথা বলাতে জানত। মুলতানে ওর ৫ উইকেট আমার খুব প্রিয়। যখনই উইকেট দরকার পড়ত রফিককে দিয়ে চেষ্টা করতাম। তখন ওভারপ্রতি ৪ থেকে ৫ রান দিতাম আমরা। একজন বোলার রান নিয়ন্ত্রণ করতে দরকার পড়ত। এটা করতে করতেই রফিক আচমকা উইকেট পেয়ে যেত। তাই যে কোনো অধিনায়কের জন্য একেবারে আদর্শ এক বোলার ছিল রফিক। লোয়ার অর্ডারে ব্যাটিংও ভালো করত।
মাশরাফী বিন মোর্ত্তজা : ক্যারিয়ারের মধ্যগগনে থাকার সময়টায় খুব বেশি ইনজুরিতে পড়ায় টেস্ট বোলার হিসেবে মাশরাফী নিজের সম্ভাবনা পূরণ করতে পারেনি। ক্যারিয়ারে খুব বেশি সময় খুব জোরে বল করতে পারেনি। তবে ২০০৩ সালে চট্টগ্রামে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আমি তাকে টেস্ট ক্রিকেটের অন্যতম দ্রুতগতির স্পেল করতে দেখেছি। স্লিপে দাঁড়িয়েছিলাম। দেখতে পাচ্ছিলাম নাসের হুসেইন তার পেসের বিপক্ষে খুব স্ট্রাগল করছে। ইনজুরি মাশরাফীর গতি কমিয়ে লাইন-লেন্থে ভর করতে বাধ্য করেছিল। তবে তার উইকেট নেওয়ার সামর্থ্য ঠিকই সবসময় ছিল। ব্যাটসম্যানদের দুর্বলতা খুব ভালো বুঝত।
তাপস বৈশ্য : আরেকজন উইকেটটেকার। খুবই আন্ডাররেটেড। তবে খুব ভালো বোলার ছিল। এই প্রজন্মে জন্ম নিলে অনেক বেশি উইকেট পেতে পারত। শ্রীলঙ্কায় ওর টেস্ট অভিষেকের পরই বুঝতে পারি অন্য পেস বোলারদের চেয়ে কতটা আলাদা সে। পুরনো বলে আরও ভালো করার কৌশল রপ্ত করেছিল তাপস। ইনিংসের যে কোনো সময় আমি ওকে বোলিংয়ে আনতে পারতাম। জানতাম, নিজের সর্বস্ব তো ও দেবেইÑ এর সঙ্গে বলকে দিয়ে আরও কিছু করে ফেলবে। ভালো স্লোয়ার ছিল ওর। তাপসের দুর্ভাগ্য যে দেশে আমাদের বেশিরভাগ সময় ফ্ল্যাট উইকেটে খেলতে হতো।
শাহাদাত হোসেন রাজিব : নিজের সেরা সময়ে রাজিব এমনকি মাশরাফীর চেয়েও ভালো টেস্ট বোলার ছিল। আগ্রাসী ছিল। গতি ও বাউন্স ছিল। সবসময় রাজিবের মতো একজন টেস্ট বোলারের প্রয়োজন অনুভব করতাম আমি। আমার নেতৃত্বে ওর স্ট্রাইক রেট ছিল অসাধারণ। সেজন্য আমি কৃতিত্ব নিতে পারি। রফিক আমার অমূল্য বোলার ছিল। কিন্তু রাজিব ছিল স্ট্রাইক বোলার। কিন্তু দুর্ভাগ্য, লম্বা টেস্ট ক্যারিয়ারের জন্য নিজেকে ঠিক পথে চালাতে পারেনি ও।
যাদের বিরুদ্ধে হাবিবুল বাশার খেলেছেন তাদের মধ্য থেকে তার সেরা একাদশটি এমন : ১. মার্কাস ট্রেসকোথিক ২. গ্রায়েম স্মিথ ৩. রিকি পন্টিং (অধিনায়ক) ৪. শচিন টেন্ডুলকার ৫. ইনজামাম উল হক ৬. মাহেলা জয়াবর্ধনে ৭. কুমার সাঙ্গাকারা ৮. ওয়াসিম আকরাম ৯. শেন ওয়ার্ন ১০. ওয়াকার ইউনুস ১১. মুত্তিয়া মুরালিধরন।
