গোলাম রহমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগে শিক্ষকতা করেন। ছিলেন বাণিজ্য সচিব। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিবেরও দায়িত্ব পালন করেন তিনি। কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি পদে আসার আগে গোলাম রহমান দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) চেয়ারম্যান ছিলেন।
আসন্ন বাজেট নিয়ে জানতে চাইলে বর্তমান ক্যাব সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য আসন্ন বাজেট মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপ বাড়াবে এটা সত্য। কিন্তু সরকার যদি কিছু পদক্ষেপ নেয়, তাহলে এটি জনগণের জন্য কল্যাণমুখী বাজেটও হতে পারে। এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে জ¦ালানি তেলের দাম সমন্বয় করা উচিত। বিশে^র অনেক দেশে একেবারে কম দামে তেল পাওয়া যাচ্ছে। এটি করা গেলে শিল্পকারখানার উৎপাদন, বাড়তি যানবাহন ভাড়া কমে যাবে। এছাড়া মধ্যবিত্তের জন্য সঞ্চয়পত্রের উৎসে কর কমানো যেতে পারে। এটির মাধ্যমে অনেক মানুষ যাদের কাজ নেই এবং কাজ করার সক্ষমতাও নেই, তাদের আয় বাড়বে, চলতে পারবে। এছাড়া ব্যবসা-বাণিজ্য স্বাভাবিক করতে প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত প্রণোদনায় খেলাপিদের বাদ দিতে হবে। ৯-৬ থিউরিসহ আসন্ন বাজেটে সঞ্চয়পত্রের বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা যেতে পারে। সর্বোপরি, মানুষের কর্মসংস্থানে নিশ্চিত করা জরুরি। মানুষের কর্মসংস্থান তথা আয়বর্ধক কর্মকা- স্বাভাবিক করতে পারলে মানুষের ওপর চাপ কমে যাবে।
গতকাল শুক্রবার দেশ রূপান্তররের সঙ্গে আলাপ-আলোচনায় গোলাম রহমান এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে হলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়াতে হবে। বাজারব্যবস্থা সচল ও সুনিশ্চিত করতে হবে। এ দুটি কাজ করতে হলে মানুষের কর্মসংস্থান বাড়াতে হবে। আয়বর্ধক কর্মকা- স্বাভাবিক করতে হবে।
তিনি বলেন, ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি ফেরাতে প্রণোদনা দিয়ে শিল্পকারখানার উৎপাদন ও আয়বর্ধক কর্মকা- বাড়ানো যেতে পারে। কিন্তু সরকার যদি খেলাপিদের এ প্রণোদনা দেয়, তবে সেটা সফল হবে না। খেলাপিদের কারণেই পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থাটা নড়বড়ে হয়ে গেছে। সরকারের উচিত ছিল খেলাপিদের কাছ থেকে টাকা আদায় করা। সেটা করা হয়নি। উল্টো ৯-৬ থিউরি চালু করা হয়েছে। ব্যাংকে ৯-৬ ব্যবস্থা অর্থনীতিকে ৯-৬-এর দিকে ধাবিত করছে। এটা ভালো সিদ্ধান্ত হয়নি।
তিনি বলেন, মধ্যবিত্তের মধ্যে যাদের কর্ম নেই, কিন্তু কিছু সঞ্চয় রয়েছে তাদের বড় আয়ের উৎস ছিল সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ। একসময় এটিকে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতাভুক্ত করা হয়েছিল। সরকার সুদের একটি অংশ বহন করত। ধীরে ধীরে এটির প্রতি মধ্যবিত্তকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। বর্তমানে এটির ওপর উৎসে কর আরোপ করা হয়েছে। আগে যে পরিমাণ সঞ্চয়পত্র কেনা যেত (৭৫ লাখ টাকা) এখন সেটাও পারা যায় না। সিলিং বসানো হয়েছে, ৫০ লাখ টাকার বেশি কেনা যায় না। আমার কথা হলো, দেশের অভ্যন্তরে ঋণ কোনো ঋণ নয়, এটি একধরনের সাপোর্ট। সরকার খেলাপি ঋণ আদায়ের ওপর চাপ সৃষ্টি না করে, মধ্যবিত্তের আয়ের ওপর দৃষ্টি দিয়েছে। এতে মানুষের সঞ্চয়ের মানসিকতাকে নিরুৎসাহিত করছে। মানুষ নয়-ছয় না করলে বিনিয়োগ বাড়বে কেমনে প্রশ্ন করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, সরকারের উচিত আগামী বাজেটে ব্যাংকের ৯-৬ থিউরি ও সঞ্চয়পত্রের বিদ্যমান নিয়ম বিষয়ে পুনর্বিবেচনা করা উচিত। এতে অর্থনীতি সচলের পাশাপাশি মানুষের আয় বাড়াবে। এছাড়া মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপ থাকতে হবে। টাকা ছাপানোর চিন্তা থেকে সরে আসতে হবে। এটি করলে মূল্যস্ফীতির লাগাম কোনোভাবেই টেনে ধরা সম্ভব হবে না। এ কাজগুলো করতে পারলে রাজস্ব আদায়ও হবে কিন্তু এতে মানুষের জীবনযাত্রায় ব্যয়ের চাপ কমে যাবে।
গোলাম রহমান বলেন, রাজস্ব বাড়াতে বিড়ি-সিগারেট বা তামাক পণ্যের ওপর কর বাড়–ক এটা আমরাও চাই। কারণ এটা ব্যয় নয়, অপব্যয়। অন্যদিকে মোবাইলে কথা বলার ওপর যদি সরকার কর বাড়ায় এটাও খুব খারাপ পদক্ষেপ হবে না। এ খাতে ১ পয়সাও যদি কর বাড়ানো যায়, তাহলে বড় অঙ্কের রাজস্ব আসবে। মানুষ মোবাইলে কথা কম বলে এর ব্যয় কভার করতে পারবে। এছাড়া দোকানে দোকানে ইসিআর মেশিন বসিয়ে মানুষের দেওয়া ভ্যাট প্রাপ্তির নিশ্চিত করা উচিত। কারণ মানুষ ভ্যাট দেয়, কিন্তু সরকার পায় না।
ইসিএফ মেশিন বসানোর গুরুত্ব অনেক আগে থেকেই উপলব্ধি করতে পেরেছে সরকার। গত দু-তিন বছর থেকে এনবিআর তা বসানোর চেষ্টাও করেছে। সফল হয়নি। এ বছর করোনার প্রভাবে ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির। ফলে এটা আসন্ন বাজেটের পরও করতে পারবে কি না সন্দেহ রয়েছে। সাধ ও সাধ্যের সমন্বয়ও থাকতে হয়।
