প্রয়োজন সরকারি-বেসরকারি চিকিৎসার মেলবন্ধন

আপডেট : ০৭ জুন ২০২০, ১১:৩১ পিএম

মহামারী করোনার তাণ্ডবে মানুষ বিপর্যস্ত। কভিড ও অকভিড দুই ধরনের রোগের ন্যূনতম মানসম্পন্ন চিকিৎসা পেতে লোকজন দিশেহারা। এ প্রসঙ্গেই বেসরকারি হাসপাতাল ও চিকিৎসক বিষয় দুটি নানাভাবে উচ্চারিত। এই উচ্চারণের অধিকাংশ স্থান জুড়ে থাকে অভিযোগের তীক্ষন তীর ও বল্লম। পুরো বিষয়টির একটি বিশ্লেষণ হওয়া জরুরি।

প্রথমেই বাংলাদেশে চিকিৎসাসেবা ব্যবস্থার অবয়ব সম্পর্কে একটি ধারণা থাকা দরকার। সারা দেশে হাসপাতালগুলোতে শয্যাসংখ্যা ২ লাখ ৭০ হাজারের মতো। মানুষকে চিকিৎসা দেওয়ার কাজে নিয়োজিত চিকিৎসকের সংখ্যা ৮৫ থেকে ৯০ হাজারের মধ্যে। এই চিকিৎসকদের ২৬ থেকে ২৭ হাজার সরকারি স্বাস্থ্য খাতে কর্মরত। বাকি চিকিৎসকরা বেসরকারি খাতে নিয়োজিত। হাসপাতালের শয্যার এক-তৃতীয়াংশ সরকারি এবং বাকি দুই-তৃতীয়াংশ বেসরকারি মালিকানায়। রোগনির্ণয়সহ চিকিৎসাসেবার অন্যান্য ক্ষেত্রের চিত্রও অনুরূপ। বাংলাদেশের চিকিৎসাব্যবস্থায় বেসরকারি খাতের উদ্ভব ও বিকাশের শুরু হয়েছিল প্রায় চার দশক আগে। সরকার নিজে সারা দেশের সব মানুষকে চিকিৎসাসেবা প্রদানে সক্ষম অথবা ইচ্ছুক নয়। তাই আইনি কাঠামোর আওতায় চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য খাতে বেসরকারি বিকাশকে সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে। এখানে ব্যাখ্যাটি সহজ ও খোলামেলা। রাষ্ট্রের যে নাগরিকের অর্থনৈতিক সামর্থ্য রয়েছে, তিনি টাকা দিয়ে চিকিৎসাসেবা ক্রয় করবেন। যার বেশি টাকা তিনি পাঁচ তারকা হাসপাতালে যাবেন। যার সামর্থ্য নেই তিনি যাবেন সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যের সেবা গ্রহণ করতে। (বিনামূল্যের চলতি প্রতিশব্দ হলো মাগনা। এটি তাচ্ছিল্য অর্থে বেশি ব্যবহৃত হয়)। মূলত এভাবেই বেসরকারি চিকিৎসাসেবার প্রতি একটি মনোসামাজিক পৃষ্ঠপোষকতা গড়ে তোলা হয়।

বাংলাদেশ রাষ্ট্র বাজার অর্থনীতিকে রাষ্ট্রীয় দর্শন ও মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করে। এর ফলে চিকিৎসাসেবা পণ্যে রূপান্তরিত হয়। বিষয়টির সঙ্গে একমত বা দ্বিমত হওয়ার ব্যাপক অবকাশ রয়েছে। কিন্তু বিগত চার দশকে দেশের অধিকাংশ মানুষ এই মুক্ত বাজার অর্থনীতি, নিদেনপক্ষে চিকিৎসাসেবাকে পণ্যে পরিণত করার প্রক্রিয়াকে প্রত্যাখ্যান করেনি। অন্তত বিগত চার দশকে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে সে বিষয়টি সুস্পষ্ট। এ রকম প্রেক্ষাপটে করোনাবিরোধী মহারণে সরকারি ও বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা খাত সম্মিলিতভাবে একটি কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার অধীনে যুদ্ধে নামবে সেটাই ছিল প্রত্যাশিত। সে ক্ষেত্রে কী ঘটেছে, তার দিকে চোখ ফেরানো যাক।

সাধারণভাবে একটি মহামারী প্রতিরোধের পরিকল্পনা করা হয় ‘এপিডেমিক প্রজেকশন মডেল’ অনুসরণ করে। সেখানে প্রতিরোধ কার্যক্রম ও চিকিৎসা কার্যক্রম এই দুটি অংশকেই বিবেচনায় রাখা হয়। বাংলাদেশে করোনাবিরোধী লড়াইয়ের কৌশল এবং পরিকল্পনা দুটিই প্রণয়ন করা হয়েছে বেসরকারি স্বাস্থ্য খাতকে বাইরে রেখে। প্রতিরোধ পরিকল্পনাকারীরা করোনা বিস্তৃতির সম্ভাব্য বিশালতাকে অনুধাবন করতে ব্যর্থ হন। সেটা প্রত্যক্ষ করা গেল করোনা পরীক্ষাকে আইইডিসিআরের কুক্ষিগত করে রাখার মধ্য দিয়ে। মাত্র দুই হাজার পরীক্ষা কিটের সংগ্রহ নিয়ে ১৬ কোটি মানুষের বাংলাদেশে করোনা নিয়ন্ত্রণ লড়াই শুরু করে। অথচ এ ক্ষেত্রে বেসরকারি খাতকে যুক্ত করা হলে এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে কয়েক লাখ পরীক্ষা কিট আমদানি করা যেত। যৌক্তিকভাবেই সরকার পরীক্ষার মূল্য নিয়ন্ত্রণ করতে পারত। পরীক্ষার সংখ্যাও অনেক অনেক গুণ বেড়ে যেত। হাসপাতালের শয্যা, আইসিইউ বেডসহ সব বেসরকারি অবকাঠামোকে একটি ব্যবহার-পরিকল্পনায় আনা যেত। সেদিকে না গিয়ে মাঝে মাঝে প্রজ্ঞাপন ও নির্দেশনা জারি করে দায়িত্বশীলরা তাদের দায়িত্ব পালন সম্পন্ন করেন। করোনাতা-বের প্রথম ধাক্কায় অপ্রস্তুত চিকিৎসাব্যবস্থার লেজেগোবরে অবস্থা আমরা অবলোকন করি। সুরক্ষাসামগ্রী ছাড়া চিকিৎসক, নার্স ও অন্য স্বাস্থ্যকর্মীদের তখন বেহাল অবস্থা। করোনা পরীক্ষার অভাবে শত শত মানুষ দিশেহারার মতো ঘুরছে। হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার জন্য মানুষজন রোগের ইতিহাস গোপন করে। ইতিহাস গোপন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে করোনা রোগী হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স, সেবাকর্মী ও অকভিড রোগীদের আক্রান্ত করে ফেলছে। এ রকম অবস্থায় একের পর এক হাসপাতাল, হাসপাতালের ওয়ার্ড, আইসিইউ বন্ধ হতে থাকল। বিপুলসংখ্যক চিকিৎসক এবং অন্যান্য সেবাকর্মীকে কোয়ারেন্টাইন ও আইসোলেশনে যেতে হলো। এ রকম একটি বেসামাল সময়ে স্বাস্থ্য বিভাগের অধিকর্তারা ধমক দিয়ে, ভয় প্রদর্শন করে চিকিৎসক ও হাসপাতালকে কর্মক্ষম করতে উদ্যোগ নেয়। নিজেদের পরিকল্পনাহীনতা ও ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা আড়াল করতে স্বাস্থ্য প্রশাসন চিকিৎসক ও জনসাধারণকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেওয়ার অপকৌশল গ্রহণ করে। অত্যন্ত যৌক্তিক কারণেই দোষারোপ প্রদানের সেসব কৌশল ব্যর্থ হয়।

দেশের বেসরকারি চিকিৎসা খাত এখন বিশাল সংকটের সময় অতিক্রম করছে। ডাক্তার, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রায় পঞ্চাশ ভাগ কোয়ারেন্টাইন অথবা আইসোলেশনে রয়েছে। অনেকে পারিবারিক সমস্যার কারণে কর্মক্ষেত্রে উপস্থিত হতে পারছে না। হাসপাতালে ভর্তি প্রতিজন রোগীকে এখন সম্ভাব্য করোনা রোগী হিসেবে সেবা দিতে হয়। ফলে হাসপাতালের সব চিকিৎসক, নার্স ও কর্মীদের সুরক্ষাসামগ্রীর ব্যবস্থা করতে অর্থের জোগান দিতে হয়। গত তিন মাসে হাসপাতালের আয় এক-চতুর্থাংশের নিচে চলে এসেছে। পাঁচ তারকা ও অন্যান্য তারকাচিহ্নিত কতিপয় হাসপাতালকে এই হিসাবের মধ্যে ধরা হয়নি।

দেশে করোনার বিস্তার দ্রুত বাড়ছে। পরিবারসহ নিজের চিকিৎসা এবং দেশের মানুষের পাশে দাঁড়ানোর লক্ষ্যে বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে সক্রিয় ভূমিকা রাখতেই হবে। যদি কোনো হাসপাতাল এই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়, সেটিকে এ দেশে কার্যক্রম চালিয়ে যেতে দেওয়া যায় না। অন্তত আগামী তিন মাস সময়ের জন্য বেসরকারি হাসপাতালগুলো ‘লাভ নয় লোকসান নয়’ ভিত্তিতে পরিচালিত হওয়া উচিত। (আশা করা যায় তিন মাস সময়ের মধ্যে করোনার প্রথম তাণ্ডব কমে আসবে)। অতি দ্রুত সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউ বেড, শয্যা, ল্যাবরেটরি সুবিধা ও অন্য সেবাগুলোকে একটি সমন্বিত পরিকল্পনার অধীনে আনা হোক। ডেটাবেইস তৈরি করে প্রতিটি মহানগর ও জেলায় হাসপাতাল শয্যার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা যাবে। রোগীর চিকিৎসা ও হাসপাতালে ভর্তির বিষয়ে রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক ক্ষমতাবান নয়, চিকিৎসকদের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হবে। এ ক্ষেত্রে অনভিপ্রেত হস্তক্ষেপ এবং স্বাস্থ্য খাতের সব দুর্নীতি বন্ধে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী উদ্যোগী হলে সুফল আসবে। সরকারি-বেসরকারি সব হাসপাতালে প্রয়োজনীয় সুরক্ষাসামগ্রী সরকার বিনামূল্যে সরবরাহ করবে। ডাক্তার, নার্সসহ অন্যান্য দক্ষ জনশক্তির প্রয়োজন হলে সরকার বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে সাহায্য করবে। মান ও মূল্য নিশ্চিত করে করোনা পরীক্ষা সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হোক। চিকিৎসাসেবার সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন মূল্য সরকার নির্ধারণ করে দেবে। যারা চ্যারিটিভিত্তিক সেবা প্রদান করবে, সরকার তাদের সুবিধা ও প্রণোদনা দেবে। সরকার ঘোষিত প্রণোদনা সরকারি-বেসরকারি খাতের সব ডাক্তার, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য সমভাবে প্রযোজ্য হতে হবে। নীতিনির্ধারকদের অনুধাবন করতে হবে করোনাবিরোধী লড়াইয়ে জয়ী হতে হলে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে অগ্রসর হওয়া ব্যতিরেকে অন্য কোনো পথ নেই। দৃঢ় মনোবলে উদ্বুদ্ধ সেনা দল দ্বারাই শুধু বিজয় করায়ত্ত হয়।

লেখক

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ

পরিবেশ ও স্বাস্থ্য অধিকার কর্মী

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত