কোটি টাকা হাতিয়েছে মোবাইল ব্যাংকিং প্রতারক চক্র

আপডেট : ০৮ জুন ২০২০, ০৫:১২ এএম

প্রতারণার মাধ্যমে কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া মোবাইল ব্যাংকিং ও ডেবিট-ক্রেডিট কার্ড জালিয়াত চক্রের ৯ হোতাসহ ১৩ জনকে আটক করেছে র‌্যাব। গত শনিবার রাত থেকে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ও ফরিদপুরের ভাঙ্গায় অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করা হয়। গ্রেপ্তারদের কাছ থেকে প্রায় ১৫ লাখ টাকাসহ প্রতারণার কাজে ব্যবহৃত নানা সরঞ্জাম উদ্ধার হয়েছে। অন্তত ৩০ থেকে ৪০ জনের সংঘবদ্ধ এই চক্র পাঁচটি

ভাগে বিভক্ত হয়ে মোবাইল ব্যাংকিং ও কার্ড জালিয়াতির মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে ইতিমধ্যে কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। তাদের মূল টার্গেট পেশাজীবী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও পোশাককর্মী। গতকাল রবিবার দুপুরে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে র‌্যাব মিডিয়া সেন্টারে বাহিনীটির আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক সারওয়ার বিন কাশেম এসব তথ্য জানান।

গ্রেপ্তাররা হলেন নাজমুল জমাদ্দার (১৯), হাসান মীর (১৮), ইব্রাহিম মীর (১৮), তৌহিদ হাওলাদার (২৩), মোহন শিকদার (৩০), পারভেজ মীর (১৮), সোহেল মোল্যা (২৬), মো. দেলোয়ার হোসেন (৩৫), সৈয়দ হাওলাদার (২০), বাকির হোসেন (২৪), মোহাম্মদ আলী মিয়া (২৬), পলাশ তালুকদার (৩৪), মো. ইমন (২৫)। তাদের সবার বাড়ি ফরিদপুরের ভাঙ্গায়।

সংবাদ সম্মেলনে সারওয়ার বিন কাশেম বলেন, একজন মাস্টারমাইন্ড পুরো প্রতারক চক্রকে নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন। এই চক্রের ৩০ থেকে ৩৫ জন সদস্য রয়েছে। চক্রটি হান্টার, স্পুফিং, কাস্টমার কেয়ার, টাকা উত্তোলন ও পর্যবেক্ষক দলে ভাগ হয়ে প্রতারণার কাজ করে থাকে। প্রতিটি গ্রুপ সমন্বয়ের মাধ্যমে প্রতারণা করে থাকে।

প্রতারণার কৌশল সম্পর্কে তিনি বলেন, কাস্টমার কেয়ারের প্রধানই মূল মাস্টার মাইন্ড। একজন মাস্টার মাইন্ড বা মূল হোতা হান্টার টিমের কাছ থেকে গ্রাহকদের নম্বর সংগ্রহ করে স্পুফিং টিমকে দেয়। স্পুফিং টিম তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহার করে কাস্টমার কেয়ারদের নম্বর বা সংস্থার নাম স্পুফিং করে থাকে। ফেক কাস্টমার কেয়ারের সদস্যরা গ্রাহককে প্রতারিত করে বিভিন্ন এজেন্টের মাধ্যমে বা অনলাইনে কেনাকাটা করে অর্থ সংগ্রহ করে থাকে।

এই ৫টি গ্রুপের কার্যক্রম সম্পর্কে সারওয়ার বিন কাশেম বলেন, হান্টার গ্রুপ মূলত গ্রাহকদের মোবাইল নম্বর ও তথ্যাদি সংগ্রহ করে মাস্টার মাইন্ডকে সরবরাহ করে থাকে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের অফিসের কর্মচারী, মোবাইল ব্যাংকিং এজেন্ট, পোশাককর্মী, বিক্রয়কেন্দ্র, অনলাইন কুরিয়ার সার্ভিসের কর্মীদের কাছ থেকে টাকার বিনিময়ে নম্বর সংগ্রহ করে থাকে। বর্তমানে দেশের বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠান ও পোশাক কারখানার শ্রমিকদের বেতন দেওয়া হয় অনলাইন ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে। প্রতারক চক্রটি পেশাজীবী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, পোশাককর্মীদের টার্গেট করে প্রতারণার ফাঁদ তৈরির পরিকল্পনা করেছে। স্পুফিং গ্রুপের কাজ হলো নম্বর ক্লোন করা। এই দলের সদস্যরা তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহারের মাধ্যমে মোবাইল নম্বর স্পুফিং করে থাকে। স্পুফিংয়ের ফলে গ্রাহক প্রতারিত হয়। প্রতিটি স্পুফিংয়ের জন্য তারা মাস্টার মাইন্ডের কাছ থেকে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা করে পায়। এ ছাড়া কল ডিউরেশন অনুযায়ী আলাদা করে টাকা পেয়ে থাকে।

ফেক কাস্টমার সেন্টারের কাজ বিভিন্ন নম্বরে ফোন করে কৌশলে প্রতারণার মাধ্যমে পিন কোড নেওয়া। মাস্টার মাইন্ড নিজেই সাধারণত এ দলটি পরিচালনা করে থাকে। একজন মাস্টার মাইন্ডের অধীনে তিন থেকে পাঁচজন মূল কর্মী থাকে। প্রত্যেক কর্মীর আবার দুজন করে সহযোগী থাকে। প্রতিটি কাস্টমার কেয়ারের ১৫-২০ জন সদস্য থাকে। সাধারণত মাস্টার মাইন্ড অথবা তাদের মধ্য থেকে একজন কাস্টমার কেয়ার সেজে গ্রাহকের সঙ্গে কথা বলে বিভিন্ন তথ্য দেওয়া ও নেওয়ার কাজ করে থাকে। কথোপকথনের সময় কর্মী ও সহযোগীরা কেউ তথ্য লিপিবদ্ধ করে, কেউ অন্য মোবাইলে প্রাপ্ত তথ্য ইনপুট দিয়ে অ্যাকাউন্ট নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে থাকে। তারা সাধারণত চরের কোনো নির্জন জায়গা বা গাছপালা ঘেরা নিরাপদ স্থান বেছে নেয়। কার্যক্রম পরিচালনার সময় অন্য সহযোগীরা এমনভাবে কথা বলতে থাকে যেন ফোনের অপর প্রান্ত থেকে একটি অফিশিয়াল এনভারমেন্ট মনে হয়।

উত্তোলন দলের কাজ হলো বিভিন্ন জায়গায় তাদের লোক বসিয়ে টাকা তুলে নেওয়া। গ্রাহকের অ্যাকাউন্ট ট্রান্সফার হওয়ার পর সিন্ডিকেটের মোবাইল ব্যাংকিং এজেন্টদের মাধ্যমে টাকা উত্তোলন করা হয়ে থাকে। ভাঙ্গা, ফরিদপুর, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে তাদের এজেন্ট রয়েছে। এভাবে প্রতারণাকৃত অর্থ কয়েকটি জায়গায় পাঠিয়ে নিরাপদ জায়গা থেকে তুলে নেয়। এই চক্রের কারও কারও আবার নামে-বেনামে এজেন্টশিপ রয়েছে। এজেন্টরা হাজারে ২০০ টাকা কমিশন পেয়ে থাকে। আর ওয়াচম্যানের কাজ হলো এলাকায় ছোট ছোট পানের, মুচির দোকানসহ বিভিন্ন দোকান বসিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতি বা গতিবিধি দেখা।

র‌্যাব কর্মকর্তা সারওয়ার বিন কাশেম আরও বলেন, মোবাইল ব্যাংকিং করতে গিয়ে প্রতারণার শিকার হচ্ছে অনেক মানুষ। আর করোনাভাইরাসের সময় মোবাইল ব্যাংকিংয়ের লেনদেন বেড়ে যাওয়ার সুযোগটি কাজে লাগিয়েছে এই প্রতারক চক্র। এই ১৩ জন আগে কখনো গ্রেপ্তার হননি। তাদের মধ্যে মোহন জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছেন, গত দুই মাসে তিনি এক কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত