একান্ত সাক্ষাৎকারে ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম

স্বাস্থ্য কৃষি সামাজিক নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থানে জোর দিতে হবে

আপডেট : ১০ জুন ২০২০, ০৭:০৯ এএম

প্রতি বছর বাজেট এলেও আগামী ২০২০-২১ অর্থবছরের বিষয়টা একেবারে ভিন্ন। করোনার কারণে অর্থনীতির সব হিসাব-নিকাশ ওলটপালট হয়ে গেছে। স্থবির চয়ে পড়েছে ব্যবসা-বাণিজ্য। মানুষকে আবার আয়বর্ধক কর্মকান্ডে ফিরিয়ে এনে কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে দিতে হবে বড় ছাড়। ফলে এ অবস্থায় আসন্ন বাজেট বাস্তবায়নে অর্থসংস্থান সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জিং হবে। তবে আগামী বাজেটের প্রতি সবার একটা আলাদা দৃষ্টি রয়েছে। এজন্য বাজেটকে কল্যাণমুখী করতে স্বাস্থ্য, কৃষি, সামাজিক নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থানে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। 

আগামী বাজেট নিয়ে আলাপকালে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম এসব কথা বলেন। নিচে চৌম্বক অংশ তুলে ধরা হলো।

আগামী বাজেটে কোন কোন বিষয় বেশি অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত জানতে চাইলে মির্জ্জা আজিজ বলেন, আসন্ন বাজেটে চারটি বিষয় সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে। মানুষকে তার কর্ম ফিরিয়ে দিতে হবে। এটি করতে পারলে অর্থাৎ মানুষের আয়বর্ধক কর্মকা- নিশ্চিত করতে পারলে অনেক কিছুর সমাধান হয়ে যাবে। করোনার কারণে স্বাভাবিকভাবে স্বাস্থ্য খাতে বেশি জোর দেওয়া উচিত। আগামী বাজেটে এটা মূল ইস্যু হওয়া উচিত। এরপর সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেক বেশি বাড়াতে হবে। করোনার কারণে অনেক লোক চাকরি হারাবে। মানুষকে খাইয়ে-পরিয়ে বাঁচিয়ে রাখার জন্য বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ থাকতে হবে। প্রবাসী অনেকে চাকরি হারিয়ে দেশে ফিরবেন। তাদের দিকেও বিশেষ নজর দিতে হবে। একই সঙ্গে কৃষিতেও স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি বরাদ্দ দিতে হবে, যাতে সংকটময় এ সময়ে খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মধ্যে না পড়ে। এখন বরাদ্দ যাই হোক না কেন সরকার চাইলে যেকোনো সময় বরাদ্দ বাড়াতে বা কমাতে পারে। এ ছাড়া

করোনায় ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির। সহসায় আসবে না বিনিয়োগ। বিনিয়োগে গতি আনার বিষয়ে মির্জ্জা আজিজ বলেন, দেশে দীর্ঘদিন থেকে বিনিয়োগে মন্দা চলছে। বেসরকারি বিনিয়োগ অত্যন্ত হতাশাজনক। দেশের অবকাঠামোগত সমস্যার কারণে এই বিনিয়োগ কমছে। এই মন্দা কাটাতে উদ্যোগ নিতে হবে। বিশেষ করে বিনিয়োগকারীদের জন্য পুঁজির জোগান নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্য সহজ করতে হবে। এক্ষেত্রে বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হলেও তার খুব একটা বেশি সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। আশা করছি, স্টপ সার্ভিসের পূর্ণাঙ্গ সুবিধা পেলে বিনিয়োগে সুফল আসতে পারে।

তিনি বলেন, দেশে করপোরেট করহার অনেক বেশি। পুঁজিবাজারে অতালিকাভুক্ত কোম্পানির করহার অনেক  বেশি আছে। এটি কমানো যেতে পারে। তবে করপোরেট করহার কমালেই হবে না, অবকাঠামো উন্নয়ন, সুশাসন নিশ্চিত এবং ‘ইজ অব ডুয়িং’ বিজনেসে উন্নতি করতে হবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে বিনিয়োগের প্রয়োজন রয়েছে। তবে শুধু প্রণোদনা দিয়ে বিনিয়োগ বাড়ানো যায় না। বিনিয়োগের পরিবেশ সৃষ্টি করতে হয়। সেটি করতে হবে।

তিনি বলেন, সরকারের ব্যয় খুব একটা কমবে না। আগে থেকেই সরকারের রাজস্ব আদায়ে বড় দুর্বলতা রয়েছে। রাজস্ব আদায় করে মূলত এনবিআর। রাজস্ব আদায়ের বড় খাত ভ্যাট। করোনার কারণে ব্যবসা-বাণিজ্যে যে স্থবির অবস্থা চলছে, তাতে ভ্যাট আদায় কমবে। তা ছাড়া আমদানি কমার কারণে এখান থেকে শুল্ক আদায় বাড়ার সম্ভাবনা কম। রাজস্ব আয়ের আর একটি খাত হচ্ছে ব্যক্তি কর ও প্রাতিষ্ঠানিক কর থেকে প্রত্যক্ষ রাজস্ব আদায়। কিন্তু চলতি সংকটের কারণে সবাই প্রণোদনা বা কর মওকুফ চাইছে। এ খাত থেকেও রাজস্ব আদায় বাড়ানোর সম্ভাবনা কম।

প্রবৃদ্ধি নিয়ে তিনি বলেন, প্রবৃদ্ধির এই লক্ষ্যমাত্রা অবাস্তব। জিডিপির সঙ্গে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও রাজস্ব আদায়ের প্রক্ষেপণ বাস্তবসম্মত নয়। প্রবৃদ্ধি কত হবে তা সম্পূর্ণ নির্ভর করছে বর্তমান করোনা সংকট পরিস্থিতি কতদিন স্থায়ী হয় তার ওপর। আমার ঠিক মনে হয়, করোনা সংকট উত্তরণে যতটুকু দক্ষতার স্বাক্ষর রাখা প্রয়োজন ছিল, ততটুকু আমরা দেখাতে পারছি না। অর্থাৎ সংকট দীর্ঘায়িত হওয়ার শঙ্কা আছে।

তিনি বলেন,  ব্যাংক থেকে বড় অঙ্কের ঋণ নেওয়ার চিন্তাও ভালো মনে হচ্ছে না। যখন বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি কম, তখন সরকার বড় অঙ্কের ঋণ নিলে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি আরও কমবে। তাতে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচি বাধাগ্রস্ত হবে।

তিনি বলেন, জিডিপির তুলনায় বাজেট ঘাটতি ৬ থেকে ৭ শতাংশ রাখা যেতে পারে। প্রশ্ন হলো, ঘাটতি বাজেটের অর্থ কোথা থেকে সংগ্রহ হবে। এ সমস্যা সরকার চাইলে অন্যভাবে মেটাতে পারে।

তিনি বলেন, আসন্ন বাজেটে দুর্বলতাগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো বাজেট বাস্তবায়ন। প্রতি বছরই বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা, সংশোধিত বাজেটে তা কমানো হয়। এখন অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রকল্প নির্বাচন, পর্যাপ্ত বরাদ্দ দেওয়া, যথাসময়ে বাস্তবায়ন এবং গুণগত মান নিশ্চিত করতে হবে। এ ছাড়া  আমলাতন্ত্রের সিনিয়র কর্মকর্তা পর্যায়ে জবাবদিহির অভাব আছে। অভিজ্ঞতা ও দক্ষতারও বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত