মানুষ বাঁচাতে হবে, কোথা থেকে টাকা আসবে চিন্তা করিনি

আপডেট : ১৩ জুন ২০২০, ০৪:১৫ এএম

২০২০-২১ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটকে ‘মানুষ বাঁচানোর বাজেট’ বলে অভিহিত করেছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। তিনি বলেন, বাজেটে প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে অতীতের অসাধারণ অর্জনের ওপর ভিত্তি করে। করোনা পরিস্থিতির মধ্যে বিশাল অঙ্কের রাজস্ব আদায় নিয়ে কোনো ব্যাখ্যা না দিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘টাকা কোথা থেকে আসবে সে চিন্তা আমরা করিনি। মানুষকে বাঁচাতে হবে, কমর্সংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। গ্রামের অর্থনীতিসহ সামষ্টিক অর্থনীতিতে প্রাণ সঞ্চার করতে হবে। অর্থ যাই লাগবে সেটা জোগাড় করা হবে।’ গতকাল শুক্রবার ভার্চুয়াল মাধ্যমে বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন তিনি।

আগামী অর্থবছরের জন্য ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট গত বৃহস্পতিবার সংসদে উপস্থাপন করেছেন অর্থমন্ত্রী। এর মধ্যে ৬৬ শতাংশ অর্থ রাজস্ব আয় থেকে জোগানোর পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে যুক্ত ছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান, কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমান, জ¦ালানি উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবীর, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিম, অর্থ সচিব আবদুর রউফ তালুকদার প্রমুখ।

মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যমাত্রার ব্যাখ্যা দিয়ে সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী বলেন, ওই লক্ষ্য ‘অতীতের অর্জনের ধারাবাহিকতায়’ ধরা হয়েছে। যদিও মহামারীর ধাক্কায় বিদায়ী অর্থবছরের বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য সংশোধন করে ৫ দশমিক ২ শতাংশে নামিয়ে আনতে হয়েছে। কবে এ মহামারী শেষ হবে সেই নিশ্চয়তা যখন কেউ দিতে পারছে না, তখনো নতুন অর্থবছরে ৮ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ‘এবারে অতীত অভিজ্ঞতা, সবার মতামত, আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক ও অর্থনৈতিক চিন্তাবিদদের পরামর্শের ভিত্তিতে বাজেট দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছি। এবার মহামারীর কারণে ভিন্নপথে কাজ করতে হয়েছে। অসংগতি মনে হতে পারে। কিন্তু কিছুই করার ছিল না। করোনা মোকাবিলায় সরকার মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। এটি অব্যাহত থাকবে। আমাদের প্রধান কাজ এ দুর্দিনে মানুষের পাশে দাঁড়ানো। তাদের মুখে খাবার দেওয়া, তাদের কাজ দেওয়া। অন্য সময় আমরা আগে আয় করতাম, পরে খরচ করতাম। করোনা আমাদের সেই পুরনো সিস্টেম উল্টে দিয়েছে। করোনা মোকাবিলায় এখন আমরা আগে খরচ করব, পরে আয় করব। আমি আশা করি, করোনার এ দুর্দিন বেশি সময় থাকবে না। তারপরও যদি করোনার কাল দীর্ঘ হয় সে ক্ষেত্রেও আমাদের কাছে পথ খোলা রয়েছে।’

মুস্তফা কামাল আরও বলেন, ‘এবারের বাজেট অতীতের অর্জনের ভিত্তিতে করা হয়েছে। গত ১০ বছর ধরে সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়ে আসছে। মাথাপিছু আয় গত পাঁচ বছর ধরে সর্বোচ্চ।’ তিনি বলেন, ‘আমরা আশা করি এ বাজেট আমরা যেভাবে সাজিয়েছি, সেভাবে বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হব। আমাদের প্রত্যাশা হলো করোনা বেশিদিন প্রলম্বিত হবে না। যেহেতু আইএমএফ বলছে, ২০২০-২১ অর্থবছরে ৯ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করব। ইতিমধ্যে আমাদের ভৌত অবকাঠামো তৈরি করা আছে। সুতরাং আমরা বিশ্বাস করি, ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট আমরা বাস্তবায়ন করতে পারব। এজন্য বাজেটটি আমরা দিয়েছি।’

অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘সারা দেশের মানুষ আমাদের নিয়ে কী ভাবে, কী স্বপ্ন দেখে, এগিয়ে যাওয়ার জন্য তাদের যে প্রত্যাশা সবকিছু আমরা মূল্যায়ন করেছি। বাাজেট না থাকলে কোনো অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে নেওয়া যায় না। এখন আমাদের দেশের মানুষ মারা যাচ্ছে, অনেকে না খেয়ে কষ্ট পাবে, যারা চাকরি হারিয়েছেন তারা কষ্ট পাবে, যারা রিকশাশ্রমিক তারা কষ্ট পাবেন এসব মানুষের কষ্ট দূর করার জন্য প্রধানমন্ত্রী কোনো সময় নষ্ট না করে দ্রুত ছুটে আসলেন। আমাদের নির্দেশনা দিলেন যে, প্রধানমন্ত্রী যেভাবে নির্দেশনা দেন, সেই নির্দেশনা মেনে আমরা যেন সবাইকে সহযোগিতা করি। সেই কাজটি আমরা করে যাচ্ছি।’

তিনি বলেন, ‘অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে আমরা বাজেটটি তৈরি করেছি। আমি আবারও বলি, স্বাভাবিক নিয়মে আমরা বাজেটটি করতে পারিনি। স্বাভাবিক নিয়মে না করলেও আমরা চেষ্টা করেছি দুটো জিনিস গুরুত্ব দিতে। একটা হচ্ছে অতীত অর্জন। অতীতে আমরা যা অর্জন করেছি, তা অস্বাভাবিক। গত ১০ বছরে সারা বিশ্বের সবার ওপর আমাদের জিডিপির গ্রোথ। গত ৫ বছরে আমাদের মাথাপিছু আয় সারা বিশ্বে সেরা। আমাদের সমান ছিল শুধু ভারত ও চীন। এ অর্জনগুলোকে আমরা বিবেচনায় নিয়েছি। করোনায় আক্রান্ত হওয়ার পর আমাদের নিয়ে সারা বিশ্ব নতুন করে কী ভাবছে, সেটা বিবেচনায় নিয়েছি। সবার মতামত নিয়ে আমরা এ বাজেট সাজিয়েছি।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ব্যাংকের কাছে অনেক টাকা থাকতে হবে, তা নট নেসেসারি (প্রয়োজনীয় নয়)। আমি দায়িত্ব নেওয়ার আগে ব্যাংকিং খাত দেখেছি। আমার আগে ব্যাংকের নন-পারফরমিং লোনের পরিমাণ বেশি ছিল। সে কারণে ব্যাংকগুলো মাঝেমধ্যে লক্ষ করতাম, তাদের লিকুইডিটির অবস্থা একটু খারাপ হয়ে যেত। ইদানীং কোনো ব্যাংকের লিকুইডিটি খারাপ, এ কথা শুনিনি। এখন কেউ বলতে পারবে না, ব্যাংকে গিয়ে টাকা পাইনি, ফিরে আসছে। কোনোরকম খারাপ ব্যবহার করেছে গ্রাহকের সঙ্গে ব্যাংক কর্র্তৃপক্ষ। এটা আমার সময় পাইনি।’ প্রশ্নকারী সাংবাদিককে ‘দুই বছর আগে আর দুই বছর পরে’ শিরোনামে একটি নিবন্ধ লেখারও অনুরোধ জানান অর্থমন্ত্রী।

আরেক প্রশ্নের জবাবে এনবিআর চেয়ারম্যান আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিম বলেন, ‘বর্তমানে কলরেট অনেক কম। তাই অপ্রয়োজনীয় কথা বলার প্রবণতা বেড়ে গেছে। তবে কথা বলার প্রবণতা কমানোর জন্য কলরেটে আরও ৫ শতাংশ শুল্ক বসানো হয়নি। বরং কলরেট কম তাই মাত্র ৫ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়েছে, যা ব্যয়ের সক্ষমতা মানুষের আছে।’

বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘করোনা-পরবর্তী পরিস্থিতিতে দেশে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়বে। আমাদের কর জিডিপি অনুপাত খুব কম। বর্তমানে ১০ শতাংশ রয়েছে। এটি ১৫ শতাংশে উন্নীত করলে টাকার অভাব হবে না। এতদিন বুঝতে পারিনি কীভাবে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। এখন তা বুঝে গেছি। সুদহার বেশি ছিল তা কমানো হয়েছে।’

আরেক প্রশ্নের জবাবে ড. মসিউর রহমান বলেন, স্বাস্থ্য খাতের দুর্বলতা নিয়ে অনেক সমালোচনা হয়। দুর্নীতি বন্ধ করা কর্তব্য সরকারের। এজন্য তিনি ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দেওয়ার অনুরোধ করেন।

আরেক প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবীর বলেন, ‘আবগারি শুল্ক নিচের দিকে কিছু করা হয়নি। ১০ লাখ টাকার ওপরে করা হয়েছে।’

স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানো প্রসঙ্গে অর্থ সচিব আবদুর রউফ তালুকদার বলেন, ‘খরচের সক্ষমতা নেই। এছাড়া অতিরিক্ত ১০ হাজার কোটি টাকা রাখা আছে। প্রয়োজনের সময় তা খরচ করা হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘প্রতি বছর হাজার কোটির টাকার বেশি খরচ করতে পারে না স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।’

আরেক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, পুঁজিবাজার সরকার এমনভাবে পরিচালনা করতে চায় যার মাধ্যমে অর্থনীতি শক্তিশালী হয়। আমরা অর্থনীতিকে সবার ওপরে নিতে চাই। তাহলে পুঁজিবাজারেও এর প্রভাব এমনিতেই পড়বে।

এক প্রশ্নের জবাবে পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান বলেন, এবারের বাজেটে স্বাস্থ্য ও কৃষি খাতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ দুটি মন্ত্রণালয়ের যেকোনো প্রকল্প এলেই বিলম্ব না করেই চূড়ান্ত করা হবে।

আরেক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘যেকোনো সরকারই চাইবে না দেশ থেকে টাকা পাচার হোক। এজন্য আইনকে আরও আধুনিকায়ন করা হবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত