করোনাকালের জাতীয় বাজেটে কাঠামোগত বড় কোনো সংস্কার যেমন দেখা গেল না; তেমনি করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত খাতগুলোসহ সংকট উত্তরণের সময়োপযোগী বিশেষ কোনো পদক্ষেপও দেখা গেল না। উপরন্তু দেখা যাচ্ছে ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে অর্থায়নের এক-তৃতীয়াংশই ঋণনির্ভর। এছাড়া করোনা মহামারীর মধ্যেও জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৮ দশমিক ২ শতাংশ। করোনাকালে জাতীয় ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় যা কল্পনাবিলাসী বলে মন্তব্য করেছেন অর্থনীতিবিদরা। এবারের বাজেটের মোট আকার ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে রাজস্ব আয় ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকা। বিগত বছরগুলোর বাস্তবতা এবং করোনাকালের বাস্তবতার নিরিখে এই রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রাও অতি উচ্চাকাক্সক্ষী। উন্নয়ন বাজেটে আছে ২ লাখ ৫ হাজার কোটি। ঘাটতি ধরা হয়েছে ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। যা জাতীয় আয়ের ৬ শতাংশ। সাধারণত ৫ শতাংশ ঘাটতিকে স্বাভাবিক ধরা হয়। সে হিসাবে বলা যায় ঘাটতি বাজেট ঠিকই আছে। তবে, সব মিলিয়ে করোনাকালের এই উচ্চাকাক্সক্ষী বাজেট বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জে পড়ার আশঙ্কা জানিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা।
মহামারীরকালে দেশে দারিদ্র্য ও অতিদারিদ্র্য বৃদ্ধি, ব্যাপক হারে বেকারত্ব বৃদ্ধি এবং রপ্তানি ও বৈদেশিক আয় সংকোচনের ফলে যেসব সংকট তৈরি হয়েছে- বাজেটে সেসব সমস্যার সমাধানে সুনির্দিষ্ট কোনো রোডম্যাপ দেখা যায়নি। সরকারি পরিসংখ্যানে যে দারিদ্র্য হার ২০ শতাংশে নেমে এসেছিল, মহামারীরকালে এখন তা ৩৫ শতাংশে পৌঁছে গেছে বলে দাবি করছেন অর্থনীতিবিদরা। নিম্নআয়ের বিপুলসংখ্যক মানুষ কাজ হারিয়ে খাদ্য সহায়তা ও নগদ অর্থ সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। খোদ অর্থমন্ত্রীও বাজেট বক্তৃতায় এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের বরাত দিয়ে বলছেন, করোনার কারণে ১৪ লাখ লোক বেকার হতে পারেন। যদিও জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অন্যান্য গবেষণায় বেকারত্বের হার আরও অনেক বেশি হওয়ার কথা বলা হয়েছে। তথাপি মহামারীতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত মানবসম্পদ খাতের সংকট উত্তরণে বাজেটে কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেই। আর সাধারণ মানুষের কাছে বাজেটে বিভিন্ন পণ্য ও সেবার দাম বাড়া বা কমার যে বিষয়টি আলোচনার কেন্দ্রে থাকে সেখানেও কোনো সুখবর নেই। উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে, মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেট ব্যবহারে খরচ বাড়ার কথা। অথচ করোনাকালে ফোন কল ও ইন্টারনেট আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে জরুরি হয়ে পড়ায় এসব সেবার দাম কমানোই ছিল জনদাবি।
এবারের বাজেট ঘিরে সবচেয়ে বেশি আলোচিত ছিল স্বাস্থ্য, কৃষি, রপ্তানিমুখী শিল্প এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাত। পাশাপাশি খাদ্যনিরাপত্তাসহ সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থা বিস্তৃত ও জোরদার করার বিষয়ে দাবি ছিল। কিন্তু এসব খাতে উল্লেখযোগ্য হারে বরাদ্দ বাড়েনি। কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং খাদ্য নিরাপত্তা মিলে ২২ হাজার ৮৪৯ কোটি টাকা বরাদ্দ। কিন্তু পৌনে তিন কোটি মানুষের কর্মসংস্থানের কৃষি খাতের জন্য এই বরাদ্দ অপ্রতুলই বলতে হবে। আশা করা হয়েছিল বহুল আলোচিত স্বাস্থ্য খাতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ ৩ হাজার ৫১৪ কোটি টাকা বাড়িয়ে ২৯ হাজার ২৪৭ কোটি টাকা করা হয়েছে। কিন্তু এর প্রায় পঁচিশ শতাংশই বাড়ানো হয়েছে অনুন্নয়ন খাতে। মাত্র ১ দশমিক ৯০ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে উন্নয়ন খাতে। এরপরও স্বাস্থ্য খাতের মোট বরাদ্দ এখনো জিডিপির ১ শতাংশের নিচে। পাশাপাশি করোনা মহামারী মোকাবিলায় বাজেটে যে ১০ হাজার কোটি টাকা থোক বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে, তা ঠিক কোথায় ও কীভাবে ব্যয় করা হবে সেটা নির্ধারণ করা হয়নি। অথচ থোক বরাদ্দ ব্যয়েই অনিয়ম ও দুর্নীতির আশঙ্কা সবসময় বেশি। এখন মহামারী মোকাবিলায় এই ১০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা প্রণয়ন ও প্রকাশ করা উচিত সরকারের।
এছাড়া এবার বাজেটের সবচেয়ে সমালোচিত দুটি দিক হলো কালো টাকা সাদা করার সুযোগ এবং করনীতি। টাকা দুভাবে কালো হয়ে থাকে। কর না দেওয়ায় বৈধ আয় অনেক সময় অবৈধ হয়ে যায়। আবার অবৈধ পথে উপার্জিত অর্থও কালো টাকা। এখন বাজেটে ১০ শতাংশ কর দিয়েই দুই ধরনের কালো টাকাই সাদা করার সুযোগ দেওয়া হলো। সংকটকালে কালো টাকা সাদা করার মধ্য দিয়ে অর্থনীতিতে তারল্যপ্রবাহ বাড়াতে পারলে তা হয়তো ইতিবাচক ফল দেবে। কিন্তু এটা নিয়মিত উচ্চহারে করদাতাদের জন্য বঞ্চনামূলক। সেক্ষেত্রে নিয়মিত ভালো করদাতাদের জন্য বিশেষ প্রণোদনার পদক্ষেপ নিতে পারে সরকার। ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের জন্য সরকার যে ছাড় দিয়েছে তার তুলনায় অতিধনীদের জন্য দেওয়া ছাড়েও রয়েছে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। কর সংস্কৃতির জন্য যা কোনোভাবেই ইতিবাচক নয়। এদিকে, টাকা পাচার প্রমাণ হলেই ৫০ শতাংশ কর আরোপ করার যে প্রস্তাব অর্থমন্ত্রী দিয়েছেন সেটাও বাস্তবসম্মত বলে মনে হয় না। সর্বোপরি বলতে হবে, উচ্চাকাক্সক্ষী এই বাজেট যথাযথভাবে বাস্তবায়নের স্বার্থে অনিয়ম ও দুর্নীতি রোধ করে সরকারকে রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রমাণ দিতে হবে।
