মোবাইলসেবায় বাড়তি সম্পূরক শুল্ক

বাজেট পাসের আগে কার্যকরের কারণ জানতে চায় বিটিআরসি

আপডেট : ১৫ জুন ২০২০, ০৭:২১ এএম

বাজেট পাস হওয়ার আগেই মোবাইলসেবায় বাড়তি হারে সম্পূরক শুল্ক কাটার কারণ জানতে চেয়ে অপারেটরদের চিঠি দিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। গত শনিবার চার মোবাইল অপারেটরকে ই-মেইলে পাঠানো এক চিঠিতে কারণ জানতে চেয়ে বিটিআরসি বলেছে, বাজেটে সম্পূরক শুল্ক বাড়ানোর ঘোষণার পর তা ইতিমধ্যে আরোপ করা শুরু হয়েছে, এটি প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কঠোর ব্যবস্থা হিসেবে অনাপত্তিপত্র (এনওসি) বন্ধ করে দেওয়া এবং সব সেবা ও ট্যারিফ অনুমোদন বন্ধ করে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে চিঠিতে। ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে মোবাইল সেবায় সম্পূরক শুল্ক ১০ থেকে বাড়িয়ে ১৫ শতাংশে উন্নীত করা  হয়েছে। বিটিআরসি তাদের চিঠিতে এটি আগামী ১ জুলাই থেকে কার্যকর হওয়ার কথা উল্লেখ করেছে।

গত বৃহস্পতিবার অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল সংসদে ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে মোবাইল সিম বা রিম কার্ড ব্যবহারের মাধ্যমে সেবার বিপরীতে সম্পূরক শুল্ক ১০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ নির্ধারণের কথা বলেন। সেদিনই জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এ বিষয়ে এসআরও জারি করে এবং মধ্যরাত থেকে মোবাইলসেবায় গ্রাহকের কাছ থেকে বাড়তি করের টাকা কাটা শুরু হয়।

এসআরও জারির পর মোবাইল অপারেটরগুলো আইনগতভাবে বাধ্য হয় বাড়তি করের টাকা গ্রাহকের কাছ থেকে কেটে রাখতে। তবে এসআরও জারি হওয়ার দুদিন পর মোবাইল অপারেটরগুলোকে বাড়তি হারে সম্পূরক শুল্ক কাটার কারণ জানতে চেয়ে বিটিআরসির দেওয়া চিঠিতে বিস্ময় প্রকাশ করেছে মোবাইল ফোন অপারেটররা। আর এটিকে সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে চরম সমন্বয়হীনতা হিসেবে দেখছেন এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল মজিদ।

এ বিষয়ে আবদুল মজিদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমাদের দেশের সংস্কৃতি অনুযায়ী ব্রিটিশ আমল থেকেই সম্পূরক শুল্ক, ভ্যাট ইত্যাদি যেসব পরোক্ষ শুল্ক রয়েছে, সেগুলো বাজেটে বাড়ানো হলে সঙ্গে সঙ্গে কার্যকর করতে হয়। তা না হলে এর অপব্যবহারের সুযোগ থেকে যায়। পরোক্ষ কর যদি তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর করা না হয়, তাহলে বাজেট প্রস্তাবের পণ্য মজুদ করে দাম বৃদ্ধির সুযোগ নিতে পারে। তবে পণ্যের ক্ষেত্রে এটি সঙ্গে সঙ্গে কার্যকর করা হলেও সেবার ক্ষেত্রে তা বাজেট পাস হওয়ার পরই কার্যকর করা উচিত বলে তিনি মনে করেন। কারণ সেবার ক্ষেত্রে (মোবাইলসেবায় বাড়তি কর) বিভিন্ন দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সরকার যদি বাজেট অনুমোদনের সময় বর্ধিত করের প্রস্তাব প্রত্যাহার করে নেয়, তাহলে তো এত দিন যে টাকা কাটা হলো, সেটি আর ফেরত দেওয়ার সুযোগ নেই।

আর এনবিআর যদি তাৎক্ষণিক এসআরও জারি করে ফেলে তাহলে ধরে নেওয়া হয়, সরকার দায়দায়িত্ব নিচ্ছে যে কর প্রস্তাব করা হয়েছে, তা প্রত্যাহার হবে না। বাজেট পাসের আগেই এনবিআরকে আইনগত অধিকার দিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তবে মোবাইলসেবায় বর্ধিত সম্পূরক শুল্ক আরোপ অযৌক্তিক বলে মনে করেন আবদুল মজিদ। এটি সরকারের পরস্পরবিরোধী অবস্থান। তিনি বলেন, যেহেতু সরকার দেশকে ডিজিটালাইজেনের দিকে নিয়ে যাচ্ছে, তাই মোবাইলসেবা ডিজিটালাইজেশনের অংশ, তাই এই সেবায় নতুন করে কর আরোপ উচিত হবে না। এতে সাধারণ মানুষের ব্যয় বেড়ে যাবে।

বিটিআরসির জ্যেষ্ঠ সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ ফারহান আলম কর্তৃক মোবাইল অপারেটরদের দেওয়া চিঠিতে বলা হয়েছে, বাজেটে যে সম্পূরক শুল্ক বাড়ানো হয়েছে, তা ইতিমধ্যেই আরোপ করা শুরু করেছে অপারেটররা। বিষয়টি বিটিআরসির নজরে এসেছে। এটা প্রমাণিত হলে নজিরবিহীন কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। গতকাল শনিবার অপারেটরগুলোকে এ ই-মেইল পাঠান বলে জানা গেছে। চিঠি প্রসঙ্গে বিটিআরসির মুখপাত্র সিনিয়র সহকারী পরিচালক জাকির হোসেন খন বলেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বাড়তি সম্পূরক শুল্ক কাটার বিষয়টি আমরা জানতে চেয়েছি। অপারেটররা তাদের মতামত জানাবে।

এ বিষয়ে মোবাইল ফোন অপারেটরদের সংগঠন এমটবের মহাসচিব এস এম ফরহাদ এক বিবৃতিতে বলেন, ‘অপারেটররা সরকারের বিধি অনুযায়ীই কাজ করেছে। এ ক্ষেত্রে জাতীয় সংসদে বাজেট ঘোষণার দিনই এসআরও জারি করা হয়, যা অবিলম্বে কার্যকর করার কথা বলা হয়েছে। অর্থবিলের ৮৮ পাতায় কোন কোন বিষয় অবিলম্বে কার্যকর হবে, তা উল্লেখ করে দেওয়া হয়েছে। এর আওতায় ৮০ নম্বর দফাও আছে। এই দফার অন্তর্ভুক্ত মোবাইলসেবা। এটি নতুন নয়।’ 

এবারের বাজেটে সম্পূরক শুল্ক ১০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৫ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছে। নতুন করহারে মোবাইলসেবার ওপর মূল্য সংযোজন কর (মূসক বা ভ্যাট) ১৫ শতাংশ, সম্পূরক শুল্ক ১৫ শতাংশ ও সারচার্জ ১ শতাংশ। ফলে মোট করভার দাঁড়িয়েছে ৩৩ দশমিক ৫৭ শতাংশ। এর ফলে প্রতি ১০০ টাকা রিচার্জে সরকারের কাছে কর হিসেবে যাবে ২৫ টাকার কিছু বেশি, এত দিন যা ২২ টাকার মতো ছিল। সম্পূরক শুল্কের কারণে বাড়তি অর্থ গ্রাহকদেরই দিতে হবে।

শীর্ষ দুই মোবাইল অপারেটর প্রামীণফোন ও রবির হিসাবে, তাদের মোট রাজস্ব আয়ের ৫৩ থেকে ৫৬ শতাংশই সরকারের কোষাগারে বিভিন্ন কর ও ফি বা মাশুল হিসেবে চলে যায়। দেশে মার্চ শেষে মোবাইল গ্রাহক দাঁড়িয়েছে ১৬ কোটি ৫৩ লাখের বেশি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত