১ লাখ টাকা করে বরাদ্দ এডিপির ১০৬ প্রকল্পে

আপডেট : ১৭ জুন ২০২০, ০৬:২৭ এএম

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্বাচনী আসনে ‘টুঙ্গিপাড়া ও কোটালীপাড়া উপজেলা ও পৌরসভায় পানি সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ প্রকল্প (সংশোধিত)’ শীর্ষক প্রকল্প নেওয়া হয় ২০১৭ সালে। ৫৫ কোটি টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্প আরও আগেই শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু শেষ করতে না পারায় সংশোধনী এনে মেয়াদ বাড়ানো হয়েছিল। চলতি জুনেই প্রকল্পের কথা থাকলেও হচ্ছে না। গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রকল্পে মোট ব্যয় হয়েছে ৩৭ কোটি টাকা। কিন্তু প্রকল্পটিতে আগামী ২০২০-২১ অর্থবছরে বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে মাত্র ১ লাখ টাকা। হেমায়েতপুর থেকে মানিকগঞ্জ মহাসড়ককে ৪ লেনে উন্নীত করতে ২০১৭ সালে বরাদ্দ দেওয়া হয় ২৯০ কোটি টাকা, ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ব্যয় ২২৭ কোটি টাকা। আগামী বছর বরাদ্দ মাত্র ১ লাখ টাকা। অর্থাৎ প্রকল্প দুটির কাজ আগামী বছরও শেষ না করে কোনোভাবে জিইয়ে রাখা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, করোনার কারণে রাজস্ব আয়ে ভাটা পড়েছে। তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। এতে উন্নয়নে চরম আর্থিক সংকটে রয়েছে সরকার। আগামী ২০২০-২১ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) মাত্র ১ লাখ টাকা করে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১০৬টি প্রকল্পের বিপরীতে। শুধু তাই নয়, প্রকল্প কোনোভাবে জিইয়ে রাখার উদ্দেশে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এমন প্রকল্পের ছড়াছড়ি। এর মধ্যে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পও রয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান দেশ রূপান্তরকে বলেন, করোনায় বা যে কোনো কারণেই হোক সব প্রকল্পের অর্থায়ন করা যাচ্ছে না। এখন এসব প্রকল্প বাতিলও করা যাচ্ছে না, চালিয়ে নেওয়াও যাচ্ছে না। ফলে জিইয়ে রাখা হচ্ছে। পরে যখন বেশি প্রয়োজন হবে, এগুলো আবারও সচল করা হবে।

তিনি বলেন, রাজনৈতিক বা ভোটের প্রকল্প বললে ভুল হবে না। কারণ সব প্রকল্পই কোনো না কোনো উদ্দেশ্য নিয়েই করা হয়। অনেকে এসব প্রকল্প দিয়ে নিজেদের এলাকার উন্নয়ন যেমন করেন, তেমনি আত্মীয় স্বজনকে কর্মসংস্থানেরও ব্যবস্থা করেন। ফলে প্রকল্প হলেই লাভ, না হলেই ক্ষতি। কারণ পরে এগুলো সংশোধনী এনে ব্যয় বাড়ানো হয়।

২০২০-২১ অর্থবছরের জন্য ২ লাখ ৫ হাজার ১৪৫ কোটি টাকার এডিপি গ্রহণ করেছে সরকার। ১ হাজার ৫৮৪টি প্রকল্পের বিপরীতে এই বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এডিপি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, এসব প্রকল্পের মধ্যে ১০৬টিতে বরাদ্দ রয়েছে মাত্র ১ লাখ টাকা করে। এসব প্রকল্পের মধ্যে ৮৮টি বিনিয়োগ প্রকল্প, বাকি ২২টি কারিগরি সহায়তার প্রকল্প। আর ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত বরাদ্দ দিয়ে প্রকল্প চলমান রয়েছে এমন প্রকল্প রয়েছে আরও শতাধিক। এই টাকা দিয়ে প্রকল্প পরিচালক বা পিডিদের বেতন দেওয়া হবে শুধু। অন্য কোনো কাজ হবে না।

বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট স্থাপনে সম্ভাব্য স্থান নির্বাচনে সমীক্ষা শুরু হয় ২০১৭ সালে। বরাদ্দ ছিল প্রায় ১০ কোটি টাকা। ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ৪ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। আগামী ৩০ জুন কাজ শেষ হওয়ার কথা, কিন্ত আগামী বছরের এডিপিতে বরাদ্দ মাত্র ১ লাখ টাকা।

অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের এলাকা কুমিল্লা। কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের অবকাঠামো উন্নয়নে (রাস্তা, ড্রেন, ফুটপাত) ২০১৮ সালে নেওয়া হয় প্রায় ৪৯ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রকল্প। ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ২০ কোটি টাকা। একই সঙ্গে ওই সিটির রাস্তা, ড্রেন নির্মাণ ও সংস্কারকরণে ২০১৮ সালেই নেওয়া হয় আরও একটি প্রকল্প। এর বিপরীতে বরাদ্দ ছিল ৪৫ কোটি টাকা। ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ২৭ কোটি টাকা। চলতি বছরের ৩০ জুন প্রকল্প দুটির কাজ শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু আগামী বছর এ দুই প্রকল্পের বিপরীতে বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে মাত্র ১ লাখ টাকা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ^ব্যাংকের ঢাকা অফিসের পরামর্শক ও অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, করোনার কারণে অর্থসংকট সৃষ্টি হওয়া স্বাভাবিক। এই অবস্থায় উন্নয়ন কর্মকা-ের চেয়ে মানুষের জীবন, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানমূখী কর্মকা-ে মনোযোগ বাড়াতে হবে। এক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় বা কম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে অর্থ বরাদ্দ না দেওয়াই উচিত হবে।

করোনা প্রাদুর্ভাবের পর উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ ব্যয় নিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে একটি পরিপত্র জারি করা হয়েছে। এই পরিপত্র অনুসারে আরএডিপিতে চলমান প্রকল্পগুলোকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে। এর মধ্যে পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দর, কর্ণফুলী টানেল, পদ্মা রেল লিঙ্কের মতো মেগা প্রকল্পগুলো অর্থ ব্যয় করতে পারবে। এদের রাখা হয়েছে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার তালিকায়। তবে ‘নিম্ন অগ্রাধিকার’ উন্নয়ন প্রকল্পে খরচ বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে যৌক্তিক কারণে ব্যয় করতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন লাগবে। আর ‘মধ্যম অগ্রাধিকার’ প্রকল্পের যেসব খাতে না করলেই নয় এমন খাতে নিজ বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নিতে হবে মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে।

পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, এর অংশ হিসেবে চলতি অর্থবছরের সংশোধিত এডিপি থেকে ১০ হাজার ৫০০ কোটি টাকা কেটে নেওয়া হয়। নিম্ন অগ্রাধিকার তালিকায় স্থান পাওয়া ৩৩৬ প্রকল্পের আওতায় বরাদ্দ রয়েছে ২১ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের ৮ মাসে এই বরাদ্দের ৫০ শতাংশ ব্যয় হয়েছে। বাকি অর্ধেক বা অব্যয়িত ১০ হাজার ৫০০ কোটি টাকা করোনা  মোকাবিলায় ব্যয় হবে।

আগামী অর্থবছরেও এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকতে পারে বলে পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে। এ বিষয়ে সদ্য বিদায়ী পরিকল্পনা সচিব নুরুল আমিন  দেশ রূপান্তরকে বলেন, চলমান প্রকল্প রয়েছে ১ হাজার ৭০০টিরও বেশি। করোনার ক্রান্তিকালে এর সবই চলমান রাখতে হবে এমনটা না। কারণ কিছু প্রকল্প অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ। করোনার কারণে উন্নয়ন কর্মকা- আগে  থেকেই থমকে গেছে। এখন স্বাভাবিক হতে সময় লাগবে। কেননা অর্থ মন্ত্রণালয় যদি টাকা ছাড় করতে না পারে, তাহলে সচল হবে কী করে। তিনি বলেন, আগামী অর্থবছরেও চলতি বছরের অগ্রাধিকার পরিপত্র বলবৎ থাকতে পারে। তবে সব কিছু নির্ভর করছে করোনা পরিস্থিতির ওপর। 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত