রোগীর স্বজনদের হামলায় আহত চিকিৎসকের মৃত্যু

আপডেট : ১৮ জুন ২০২০, ০৫:৩৭ এএম

খুলনায় প্রসূতির মৃত্যুর পর তার স্বজনদের হামলায় এক চিকিৎসকের মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় নগরীর শেখ আবু নাসের বিশেষায়িত হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মো. আব্দুর রকিব খান (৫৯) নামে ওই চিকিৎসক মারা যান। এর আগের দিন সোমবার রাত ৯টার দিকে হামলার শিকার হন তিনি।

মারা যাওয়া চিকিৎসক রকিব খুলনা নগরীর রাইসা ক্লিনিকের পরিচালক এবং বাগেরহাট মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট টেনিং স্কুলের (ম্যাটস) অধ্যক্ষ ছিলেন। তার মৃত্যুর ঘটনায় আবদুর রহিম নামে একজনকে আটক করেছে পুলিশ। গতকাল বুধবার বিকেলে নগরীর নিরালা মসজিদের সামনে জানাজা শেষে নিরালা কবরস্থানে ডা. রকিবকে দাফন করা হয়েছে।

এদিকে ডা. রকিবের মৃত্যুর ঘটনায় সব আসামি ধরা না পড়া পর্যন্ত খুলনার সব চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএমএ। তবে এর আওতার বাইরে থাকবে খুলনা মেডিকেল কলেজ (খুমেক) হাসপাতালের জরুরি বিভাগ ও করোনা হাসপাতাল।

নিহতের ছোট ভাই ও খুলনা মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রভাষক সাইফুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে জানান, নগরীর মোহাম্মদ নগরের পল্লবী সড়কের বাসিন্দা আবুল আলীর স্ত্রী শিউলী বেগমকে ১৪ জুন সিজারের জন্য রাইসা ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়। ওই দিন বিকেল ৫টায় অস্ত্রোপচারের পর নবজাতক ও মা প্রথমে সুস্থ ছিলেন। পরে প্রসূতির রক্তক্ষরণ হলে ১৫ জুন সকালে তাকে খুলনা মেডিকেল কলেজ (খুমেক) হাসপাতালে রেফার্ড করা হয়। সেখানকার চিকিৎসকরাও রোগীর রক্তক্ষরণ বন্ধ করতে না পেরে ঢাকায় রেফার্ড করেন। ঢাকায় নেওয়ার পথে ওই দিন রাতে শিউলী বেগম মারা যান।

সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, সম্ভাব্য হামলাকারী রোগীর (মারা যাওয়া শিউলী বেগম) স্বজন কুদ্দুস, আরিফ, সবুরসহ কয়েকজন মহিলা। তারা ১৫ জুন রাত ৮টা ৫০ মিনিটের দিকে আমার বড় ভাই রকিবকে লাথি, ঘুষি ও লাঠি দিয়ে আঘাত করে। এতে তার মাথার পেছনে জখম হয়। তাকে প্রথমে গাজী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে তার অবস্থার অবনতি হলে শেখ আবু নাসের হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।’

আবু নাসের হাসপাতালের পরিচালক ডা. বিধান চন্দ্র গোস্বামী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মাথায় আঘাতের কারণে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয় ডা. রকিবের। এ কারণেই তার মৃত্যু হয়েছে।’

বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) জানায়, নিহত রকিব বিএমএ খুলনার আজীবন সদস্য ছিলেন। তিনি স্বাস্থ্য প্রশাসনে পরিচালক পদমর্যাদায় চাকরি করতেন।

নগরীর সদর থানা পুলিশ জানায়, রকিব খানের মৃত্যুর ঘটনায় গতকাল দুপুরে তার ভাই সাইফুল ইসলাম বাদী হয়ে খুলনা সদর থানায় মামলা করেছেন। এতে চারজনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতপরিচয় আরও ১০ জনকে আসামি করা হয়েছে।

সদর থানার ওসি আসলাম বাহার বুলবুল গতকাল বিকেলে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রকিবের ভাই বাদী হয়ে মামলা করেছেন। এ ঘটনায় ফুলতলার বেজেরডাঙ্গা থেকে মঙ্গলবার রাতে আবদুর রহিম নামে একজনকে আটক করা হয়েছে। তাকে মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। বাকি আসামিদের ধরতে ভিডিও ফুটেজ দেখে আমরা খোঁজ করছি। কিন্তু এখনো তাদের ট্রেস (সন্ধান) পাওয়া যায়নি।’

চিকিৎসকদের কর্মবিরতি : ডা. রকিবের মৃত্যুর ঘটনায় সব আসামি ধরা না পড়া পর্যন্ত খুলনার সব চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে খুলনা বিএমএ। তবে এর আওতার বাইরে থাকবে খুলনা মেডিকেল কলেজ (খুমেক) হাসপাতালের জরুরি বিভাগ ও করোনা হাসপাতাল। গতকাল বিকেলে বিএমএর এক সভায় চিকিৎসক নেতারা এ সিদ্ধান্ত নেন।

বিএমএর খুলনার সভাপতি শেখ বাহারুল আলম গতকাল সন্ধ্যায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রকিবের হত্যার ঘটনায় সব আসামির গ্রেপ্তার ও খুলনা সদর থানার ওসি আসলাম বাহার বুলবুলের প্রত্যাহারের আগ পর্যন্ত সব সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিকের চিকিৎসকরা কর্মবিরতি পালন করবেন।’

চিকিৎসকদের বিক্ষোভ সমাবেশ : আব্দুর রকিব খানের ওপর হামলাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে গতকাল নগরীর সাত রাস্তার মোড়ে বিক্ষোভ সমাবেশ করে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ), বাংলাদেশ প্রাইভেট হাসপাতাল ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিপিএইচসিডিওএ) ও বাংলাদেশ প্রাইভেট মেডিকেল প্র্যাকটিশনার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিপিএমপিএ)।

বিএমএ খুলনার সভাপতি ও সংগঠনের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি ডা. শেখ বাহারুল আলমের সভাপতিত্বে সমাবেশে বক্তব্য দেন বিএমএ খুলনার সাধারণ সম্পাদক ডা. মো. মেহেদী নেওয়াজ, বিপিএইচসিডিওএর খুলনা জেলা শাখার সভাপতি ডা. গাজী মিজানুর রহমান, সাধারণ সম্পাদক ডা. মো. শওকাত আলী লস্কর প্রমুখ।

সমাবেশে বক্তারা বলেন, রাইসা ক্লিনিকের পাশেই গল্লামারী পুলিশ ফাঁড়ি। কিন্তু রকিবের ওপর হামলার সময় পুলিশ এগিয়ে আসেনি। কর্মস্থলে চিকিৎসকদের নিরাপত্তা নেই। বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসকরা ঝুঁকির মধ্যে থাকছেন। তাদের ওপর হামলা যেন একটা নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সমাবেশ থেকে জানানো হয়, আজ বৃহস্পতিবার খুলনা প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে চিকিৎসকদের পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত