কুয়েতে এমপি পাপুলের ঘুষ কেলেঙ্কারির তদন্তে নাজাহা

স্ত্রী, মেয়ে ও শ্যালিকার দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা চেয়ে চিঠি দুদকের

আপডেট : ১৮ জুন ২০২০, ০৫:৪০ এএম

লক্ষ্মীপুর-২ আসনের সাংসদ (এমপি) কাজী শহীদুল ইসলাম পাপুলের অবৈধ সম্পদের খোঁজে তদন্ত শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। কুয়েতে অর্থ ও মানব পাচারের অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়ার পর তার বিরুদ্ধে দেশটির পাবলিক প্রসিকিউশন বিভাগের পাশাপাশি অ্যান্টিকরাপশন অথরিটিও তদন্তে নেমেছে বলে জানা গেছে। কুয়েতের দুর্নীতিবিরোধী এ সংস্থাটি ‘নাজাহা’ নামে পরিচিত। এরই মধ্যে পাপুল, তার স্ত্রী সেলিনা ইসলাম, মেয়ে ওয়াফা ইসলাম ও শ্যালিকা জেসমিন প্রধানের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা চেয়ে চিঠি দিয়েছে দুদক। এ ছাড়া জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাছে ওয়াফা ছাড়া বাকি তিনজনের আয়কর নথি তলব করেছে তারা। গতকাল বুধবার দুদকের তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র দেশ রূপান্তরকে এসব তথ্য নিশ্চিত করেছে।

এর আগে ৯ জুন পাপুল, তার স্ত্রী সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি সেলিনা, মেয়ে ও শ্যালিকার বিস্তারিত তথ্য চেয়ে তাদের স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানায় চিঠি দেয় দুদক। এতে তাদের পূর্ণাঙ্গ ঠিকানা, পরিবর্তিত ও অপরিবর্তিত ঠিকানা দিতে বলা হয়। এরই মধ্যে দুদকের বিশেষ দূত মারফত পাঠানো চিঠি গ্রহণ করে সেলিনা জবাব দিয়েছেন বলে জানা গেছে।

গত ফেব্রুয়ারি মাসে পাপুলের বিরুদ্ধে অর্থ পাচার, হুণ্ডি ব্যবসা, মানব পাচারসহ বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে কুয়েতি গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়। এরপর স্বতন্ত্র এই এমপি ও তার পরিবারের সদস্যদের অবৈধ সম্পদের খোঁজে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয় দুদক। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি কমিশনের উপপরিচালক মোহাম্মদ সালাহ উদ্দিনকে অনুসন্ধান কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়। দুদকে পাপুলের বিরুদ্ধে ১৭৪ পাতার অভিযোগ জমা হয়। দুদকের অনুসন্ধান শিরোনামে বলা হয়, ‘কাজী শহীদুল ইসলাম পাপুল সংসদ সদস্য (লক্ষ্মীপুর-২) ও পরিচালক এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক প্রধান কার্যালয়, ঢাকার বিরুদ্ধে অবৈধভাবে গ্রাহক লোন বরাদ্দ করাসহ বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থ মানি লন্ডারিং করে বিদেশে পাচার এবং শত শত কোটি টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন।’

এরপর ৬ জুন রাতে কুয়েতের মুশরিফ আবাসিক এলাকার বাসা থেকে পাপুলকে গ্রেপ্তার করে দেশটির সিআইডি কর্মকর্তারা। পরদিন থেকে তাকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে গতকাল কারাগারে পাঠানো হয়েছে। পাপুল মারাফি কুয়েতিয়া কোম্পানির অন্যতম মালিক। কুয়েতে তার স্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমতি রয়েছে।

কুয়েতে পাপুলের বিরুদ্ধে নাজাহার তদন্ত প্রসঙ্গে দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কুয়েতের অ্যান্টিকরাপশন অথরিটি সাংসদ পাপুলের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্ত শুরু করেছে বলে আমরা জানতে পেরেছি। সংস্থাটির কেউ এখনো আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেনি। আমরাও এখনো তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করিনি। অনুসন্ধান কর্মকর্তা প্রয়োজন মনে করলে নাজাহার সঙ্গে যোগাযোগ করবেন। এ বিষয়ে তাকে স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে।’

দুদকের তদন্তসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা শিগগিরই কুয়েতের অ্যান্টিকরাপশন অথরিটি নাজাহার কাছে তথ্য চেয়ে ই-মেইল করব। তদন্তে তাদের প্রাপ্ত তথ্য আমাদের দেওয়ার অনুরোধ জানাব। ওই সব তথ্য পেলে আমাদের তদন্তকাজ এগিয়ে নেওয়া সহজ হবে।’

দুদকের তদন্তসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা গতকাল জানান, বুধবার পুলিশের বিশেষ শাখার ইমিগ্রেশন পুলিশ সুপারের কাছে এমপি পাপুল, সেলিনা ইসলাম, ওয়াফা ইসলাম ও জেসমিন প্রধানের বিদেশগমনে নিষেধাজ্ঞা চেয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। পাপুল বর্তমানে কুয়েতে রিমান্ড শেষে কারাগারে আছেন। চিঠিতে পাপুল সর্বশেষ কবে দেশে এসেছেন এবং কবে দেশত্যাগ করেছেন, এসব তথ্য জানাতে বলা হয়েছে। পাপুলের স্ত্রী, শ্যালিকা ও মেয়ে বর্তমানে দেশেই আছেন। এনবিআরের কাছে মেয়ে ছাড়া বাকি তিনজনের আয়কর নথি তলব করে তাদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের তথ্য চেয়েছে দুদক।

কত সম্পদ : দুদকে জমা হওয়া অভিযোগ, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের হলফনামা ও আয়কর নথিসহ বিভিন্ন সূত্রে পাপুল দম্পতির ‘পাহাড়সমান সম্পদ’ থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। এ ছাড়া শ্যালিকা জেসমিন প্রধান ও তার স্বামীর নামেও পাপুলের অনেক সম্পত্তি রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

দুদকের তথ্য অনুযায়ী, এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকের পরিচালক পাপুল ব্যবসার আড়ালে ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা অবৈধভাবে অর্জন করে বিভিন্ন দেশে পাচার করেছেন। এর মধ্যে তিনি ২০১৬ সালে ২৮০ কোটি টাকা হুণ্ডি ও বিভিন্ন ব্যক্তির ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে পাচার করেছেন। এ টাকার মধ্যে তিনি মার্কেন্টাইল ব্যাংকের মতিঝিল শাখার একটি হিসাবের মাধ্যমে ১৩২ কোটি টাকা ও প্রাইম ব্যাংকের এক কর্মকর্তার মাধ্যমে ৪০ কোটি টাকা পাচার করেন। ইউসিবিএলের মাধ্যমে ১০ কোটি ও প্রাইম ব্যাংকে ঋণ সৃষ্টি করে ১০ কোটি টাকা পাচার করেন। বাকি টাকা পাপুল তার শ্যালিকা জেসমিন ও জেডডব্লিউ লীলাবালি নামক প্রতিষ্ঠানের হিসাবে জমা করেন। কয়েকজন ব্যাংক মালিক অর্থ পাচারে পাপুলকে সহযোগিতা করেছেন বলে অভিযোগে বলা হয়।

দুদকে জমা হওয়া নথি অনুযায়ী, ৫০ কোটি টাকার শেয়ার ক্রয় করে এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকের পরিচালক হয়েছেন পাপুল। স্ত্রীর নামে একই ব্যাংকের ৩০ কোটি টাকার শেয়ার কিনেছেন। গুলশান-১-এর ১৬ নম্বর সড়কে গাউসিয়া ডেভেলপমেন্টের প্রকল্পে মেয়ে ও স্ত্রীর নামে দুটি ফ্ল্যাট, গুলশান-২-এর পিংক সিটির পেছনে গাউসিয়া ইসলামিয়া প্রকল্পে স্ত্রীর নামে ৯০০০ বর্গফুটের ফ্ল্যাট, স্ত্রী ও নিজের নামে লক্ষ্মীপুরের রায়পুরসহ বিভিন্ন স্থানে ৯১ কোটি টাকার সম্পদ আছে পাপুলের। এ ছাড়া সোনালী ব্যাংকের ঢাকার ওয়েজ আর্নার্স শাখায় স্ত্রী সেলিনার নামে ৫০ কোটি টাকার ওয়েজ আর্নার্স বন্ড ও মেয়ে ওয়াফার নামে ২০ কোটি টাকার বন্ড আছে।

দুদকের নথি অনুযায়ী, শ্যালিকা জেসমিনের নামে এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে দুটি বিলাসবহুল গাড়ি কিনে পাপুল ও তার পরিবারের সদস্যরা ব্যবহার করেন। ওই ব্যাংকে পাপুলের নামে ৪০ কোটি, ওয়াফার নামে ১০ কোটি ও সেলিনার নামে ২০ কোটি টাকার স্থায়ী আমানত রয়েছে। বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় সেলিনার ছয়তলা বাড়ি আছে। শ্যালিকা জেসমিনের নাম ব্যবহার করে ‘দিগন্ত মিডিয়ায়’ বেনামে পরিচালক হিসেবে বিনিয়োগ করেন পাপুল। মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ফাঁসির দণ্ড কার্যকর হওয়া জামায়াত নেতা মীর কাশেম আলীর সঙ্গে ব্যবসায় তার বড় বিনিয়োগ ছিল। মীর কাশেমের ফাঁসি কার্যকরের পর পাপুল বিনিয়োগের বিপুল অর্থ আত্মসাৎ করেন। এ ছাড়া পাপুল একটি ব্যাংকের পরিচালক হয়েও বেআইনিভাবে ইউসিবিএল ব্যাংক থেকে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকার ব্যাংক গ্যারান্টি ইস্যু করান। ব্যাংকটির পরিচালনা বোর্ড সভার অনুমতি ছাড়াই এ সুবিধা ভোগ করছেন তিনি। ওই ব্যাংক গ্যারান্টি ব্যবহার করে পাপুল রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্পসহ বিভিন্ন প্রকল্পে পাথর সরবরাহের ব্যবসা করেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত