চলতি মাসে ১৭ দিনে তৈরি পোশাকসহ দেশের বিভিন্ন শিল্পকারখানায় ২১ হাজার ৩৩১ জন শ্রমিক ছাঁটাই হয়েছে। এর মধ্যে সর্বাধিক ছাঁটাই হয়েছে বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএইএ) সদস্য ৮৬টি কারখানায়, ১৬ হাজার ৮৫৩ শ্রমিক। বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সদস্য ১৬টি কারখানায় ছাঁটাই করা হয়েছে ২ হাজার ২৯৮ শ্রমিক। বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সদস্য ৪টি কারখানায় ২৫৮ ও বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াজাতকরণ কর্র্তৃপক্ষের (বেপজা) ৮টি কারখানায় ৫৬ শ্রমিক ছাঁটাই করা হয়েছে। এসব সংস্থার বাইরে বিভিন্ন ধরনের ১৫ কারখানায় ছাঁটাই করা হয়েছে আরও ১ হাজার ৮৬৬ জন। বাংলাদেশ শিল্প পুলিশের পরিসংখ্যান থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অব্যাহতভাবে শ্রমিক ছাঁটাই হলে তৈরি পোশাকসহ শিল্প খাতে চরম অস্থিরতা সৃষ্টি হতে পারে। তাছাড়া ছাঁটাইয়ের শিকার শ্রমিকরা চাকরি হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। ছাঁটাইয়ের ক্ষেত্রে মালিকপক্ষ শ্রম আইন অনুসরণ করছেন না।
শ্রমিক ছাঁটাইয়ের বিষয়ে জানতে চাইলে শিল্পপুলিশের মহাপরিচালক ও অতিরিক্ত আইজিপি আব্দুস সালাম গতকাল বৃহস্পতিবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বৈশ্বিক মহামারীর কারণে শিল্পকারখানাগুলোতে শ্রমিক ছাঁটাই হচ্ছে। এটা শুধু আমাদের দেশেই নয়, সারা বিশ্বেই করোনাভাইরাসজনিত কারণে শ্রমিক ছাঁটাই হচ্ছে বলে গণমাধ্যমে খবর দেখতে পাচ্ছি। শ্রমিকরা চাকরিহারা হলে অসন্তোষ দেখা দিতে পারে; এটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। আমরা পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছি, যাতে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি না হয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘শ্রমিক ছাঁটাইয়ের সময় যাতে শ্রম আইন অনুসরণ হয় এবং মানবিকভাবে তাদের পাওনাগুলো পরিশোধ করে দেওয়া হয় এ বিষয়ে শিল্পপুলিশ তৎপরতা অব্যাহত রেখেছে।’
গত ৪ জুন বিজিএমইএ সভাপতি রুবানা হক করোনা-পরীক্ষাগার উদ্বোধনের সময় বলেন, ‘শতকরা ৫৫ ভাগ ক্যাপাসিটিতে ফ্যাক্টরি চললে মালিকদের পক্ষে শ্রমিক ছাঁটাই ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না। পরিস্থিতি যদি একটুও পরিবর্তন হয় তাহলে এই একই শ্রমিকরা একই কারখানায় যোগদানে অগ্রাধিকার পাবেন।’ রুবানা হক শ্রমিকদের ছাঁটাই করার সময় মালিকদের অবশ্যই শ্রম আইন কঠোরভাবে অনুসরণ করতে শিল্পপুলিশের কাছ থেকে পাওয়া পরিসংখ্যানে দেখা যায়, সর্বাধিক শ্রমিক ছাঁটাই হয়েছে গাজীপুর এলাকায়। সেখানে বিজিএমইএর সদস্যভুক্ত কারখানাগুলোতে ৮ হাজার ৫৬২ জন শ্রমিক ছাঁটাই করা হয়েছে। এরপরই রয়েছে আশুলিয়া এলাকা। সেখানে বিজিএমইএর ৪৯ কারখানার মধ্যে ৫টি কারখানায় ৬ হাজার ৮৫৭ জনকে ছাঁটাই করা হয়েছে। এসব শ্রমিকের মধ্যে ৫ হাজার ৬৩৪ জনেরই চাকরির বয়স এক বছরের কম। নারায়ণগঞ্জে বিজিএমইএর সদস্য ১১টি কারখানায় ৬১৬ জন ও ময়মনসিংহ অঞ্চলে ৭০৫ জন শ্রমিক ছাঁটাই করা হয়েছে।
নারায়ণগঞ্জ এলাকায় বিকেএমইএর সদস্য ১১টি কারখানার ২ হাজার ৮৫ জন শ্রমিক ছাঁটাই করা হয়েছে। আশুলিয়া এলাকায় বিকেএমইএর কারখানাগুলোতে ছাঁটাই করা হয়েছে ২১৩ জন শ্রমিক। শিল্পপুলিশের হিসাবে ৪ সংগঠন ও সংস্থার বাইরে ১৫টি শিল্পকারখানায় ১০ হাজার ৬৪৫ জন শ্রমিক কর্মরত। তাদের মধ্যে ১ হাজার ৮৬৬ শ্রমিক ছাঁটাই করা হয়েছে।
শ্রমিক ছাঁটাইয়ে শ্রম আইন মানা হচ্ছে না উল্লেখ করে জাগো বাংলাদেশ গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি বাহারানে সুলতান বাহার গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘করোনা মহামারীর কারণে মালিকরা শ্রমিক ছাঁটাই করছেন। হতে পারে তাদের কথা সত্য। কিন্তু শ্রমিক ছাঁটাই করার কিছু নিয়মনীতি রয়েছে। শ্রম আইনে শ্রমিকদের যেসব অধিকারের কথা বলা হয়েছে, ছাঁটাইয়ের ক্ষেত্রে তার ন্যূনতম বাস্তবায়নও হচ্ছে না। শ্রমিকদের বেতনভাতা না দিয়ে ছাঁটাই বা কারখানা বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। শ্রমিকরা রাস্তায় নেমে আন্দোলন করেও এর প্রতিকার পাচ্ছেন না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে শ্রমিকদের লামসাম অর্থ (সামান্য টাকা) দিয়ে বিদায় করে দেওয়া হচ্ছে। আবার কিছু শ্রমিক সংগঠনের অসাধু নেতারা মালিকদের সঙ্গে বোঝাপড়ার নামে শ্রমিকদের ঠকাচ্ছে। ফলে চাকরিহারা শ্রমিকরা মানবেতর জীবনযাপন করছেন। করোনার কারণে তারা গ্রামের বাড়িতে গিয়েও কোনো কাজ পাচ্ছেন না।’
বাহারানে সুলতান আরও বলেন, ‘শ্রমিক ছাঁটাইয়ে শ্রম আইন অনুসরণের কথা বিজিএমইএ সভাপতিসহ সবাই বলেছেন। আমরা চাই সেটা পূর্ণাঙ্গভাবে অনুসরণ করা হোক। আর এখন যাদের ছাঁটাই করা হচ্ছে ওইসব কারখানায় শ্রমিক নিয়োগের ক্ষেত্রে তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হোক।’
