কিটের মজুদ কম

আপডেট : ২৬ জুন ২০২০, ০৬:১৯ এএম

দেশে গত এক সপ্তাহ ধরেই করোনা নমুনা পরীক্ষার কিটের সংকট চলছে। চাহিদা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় কিট সরবরাহ করতে না পেরে বিভিন্ন ল্যাবরেটরিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে কম নমুনা পরীক্ষার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে স্থাপিত নমুনা সংগ্রহের বুথ কর্র্তৃপক্ষকে কম নমুনা সংগ্রহ করতে বলা হয়েছে। এমনকি কিটের অভাবে বেশকিছু এ ল্যাবরেটরি এ সপ্তাহের গড়ে দুই-চার দিন করে পরীক্ষা বন্ধ রাখে। এমনকি কিট সাশ্রয় করতে অধিদপ্তর নতুন পদ্ধতিতে নমুনা পরীক্ষার নির্দেশ দিয়েছে।

গত কয়েক দিন ধরেই কিট সংকটের কারণে বিভিন্ন ল্যাবরেটরিতে নমুনা পরীক্ষা কমে গেছে। গতকাল সর্বোচ্চ ১৭ হাজার ৯৯৯টি নমুনা পরীক্ষা করা হলেও এ সপ্তাহের পরীক্ষা ১৫-১৬ হাজারের মধ্যে ছিল। নানাভাবে বিষয়টি আলোচনা ও সমালোচনা হচ্ছে। এর আগে চীনা বিশেষজ্ঞ দল দেশ ত্যাগের দিন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক ‘কিট মজুদ তলানিতে ঠেকেছে’ বলে মন্তব্য করেন। এক সংসদ সদস্য কিট সংকটের কারণে তিন জেলায় পরীক্ষা বন্ধ বলে কয়েক দিন আগে তার ফেইসবুকে স্ট্যাটাস দেন। বিভিন্ন ল্যাবপ্রধানরাও পরীক্ষা বন্ধের কথা জানান।

কিট সংকটের কারণে চার দিন নারায়ণগঞ্জের খানপুর ৩০০ শয্যা হাসপাতালের পিসিআর ল্যাবে করোনার নমুনা পরীক্ষা বন্ধ ছিল বলে জানিয়েছেন হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. গৌতম দাস। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ২০ জুন থেকে পরীক্ষা শুরু হয়েছে।

একই কারণে ১৭ জুন থেকে নমুনা সংগ্রহ বন্ধ আছে বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেও। চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, রংপুরসহ সারা দেশের জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালেও কিট সংকটের কারণে নমুনা সংগ্রহ বন্ধ হয়ে পড়েছে।

কিটের স্বল্পতায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন করোনা মোকাবিলায় গঠিত জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির সদস্য এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ভাইরোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, এ মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে আমাদের মিটিংয়ে আমরা কিটের ব্যাপারে প্রশ্ন করেছিলাম। তখন স্বাস্থ্য বিভাগ বলেছে যথেষ্ট কিট আছে এবং অর্ডারও দিয়েছে। এখন শুনছি বিভিন্ন জায়গায় কিটের সংকট চলছে। নারায়ণগঞ্জে কিটের অভাবে পরীক্ষা বন্ধ ছিল। তাহলে কিট কোথায় গেল? এমনিতেই অনেক ঘাটতি। কিটের ঘাটতি তো থাকার কথা নয়।

এ বিশেষজ্ঞ বলেন, এখন এমনিতেই আরও পরীক্ষা বাড়াতে হবে। আমরা যে পরিস্থিতি দেখছি, তাতে প্রতিদিন ২০ হাজারের মতো পরীক্ষা করলে মোটামুটি একটা রেজাল্ট পাব। গত ২৫ মে থেকে সংক্রমণের মাত্রা একটা লেভেলেই আছে। এখন যদি আরও পাঁচ হাজারের মতো পরীক্ষা বাড়াতে পারি তাহলে রেজাল্টটা আরেকটু ভালো হতো। এটা একটা পিক। আরেকটা পিক দেখা দিতে পারে আগামী কোরবানি ঈদের ১৪ দিন পর।

অবশ্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ কিটের সংকট নেই বলে দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন। তিনি গতকাল রাতে বলেন, আমাদের স্টকে আজ সকালে (গতকাল) ছিল ৭০ হাজার কিট। আরও ৬৫ হাজার এখন (গতকাল সন্ধ্যা ৭টায়) ঢুকল। ফিল্ডে ৩১ হাজারের মতো ছিল। তার মানে এক লাখ কিট হাতেই ছিল। এখন আরও ৬৫ হাজার এলো। ফলে কখনই কিট সংকট হয়নি।

মহাপরিচালক আরও বলেন, আজও (গত ২৪ ঘণ্টায়) সর্বোচ্চ ১৮ হাজার পরীক্ষা হয়েছে। স্বল্পতা যদি থাকে, তাহলে কীভাবে এত পরীক্ষা হচ্ছে। তবে সমস্যাটা হচ্ছে আমরা এক মাসের সরবরাহ দিতে পারিনি। কারণ আনতে পারছি না। এখন যে ৬৫ হাজার এলো, সেটা ছয় লাখ আসতে পারত। এলো না। চাইলেও বিদেশ থেকে সময়মতো আসছে না। তবে জুন মাসের পর যাতে একসঙ্গে বেশি করে আনা যায় তার বিশেষ ব্যবস্থা করব। কিটের কোনো সংকট নেই এবং হবে না আশা করি।

কিটের স্বল্পতার জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিকল্পনার অভাব ও কিট সরবরাহের জটিলতাকে কারণ বলে মনে করেন অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা বলেন, কিটের সংকট হওয়ার কথা নয়। আমাদের জানামতে, দেশের মধ্যেই কিছু কিট আছে। যেগুলো আগেই আমদানি করা হয়েছে। সেগুলো অধিদপ্তর কেন নিচ্ছে না, বুঝতে পারছি না। টার্কিশ একটা কিট আমদানি হয়েছে, সেটা কেন রিসিভ হচ্ছে না? একটি ওষুধ কোম্পানি এক লাখ কিট এনেছে। সেটাও আছে। এগুলো কেন নিচ্ছে না, সেটা ঠিক জানা নেই।

এছাড়া দেশে এখন শুধু চীন থেকে সে দেশের সানসিউর বায়োটেক কোম্পানির কিট আমদানি করা হচ্ছে। এই কিটে কাজ করা সহজ। ওরা এক প্যাকেটে সব ঠিক করে দেয়। ফলে এক দেশের ওপর নির্ভর করতে গিয়ে সংকট দেখা দিচ্ছে।

স্বাস্থ্য বিভাগের অবহেলাও আছে বলে মনে করেন ল্যাবপ্রধানরা। তারা জানান, আগে যে পরিমাণ পরীক্ষা করা হতো, অধিদপ্তর সে অনুপাতে আমদানির অর্ডার দিয়েছে। এখন পরীক্ষা অনেক বেড়েছে। ফলে সরবরাহের সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না। সব দেশেই কিটের সংকট। সেজন্য যখন অর্ডার দিতে হয়, তখন ভবিষ্যতের কথা ভেবে হিসাব করে দিতে হয়। তাহলে আর এ সমস্যা হয় না। কারণ এখন টাকা থাকলেও কিট পাওয়া কঠিন।

সাপ্লাই চেইনে সমস্যার কারণে কিটের এমন সংকট বলে জানান অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। তারা বলেন, এগুলো কার্গোতে আসে। ফ্লাইটের দেরি হতে পারে। আবার সরবরাহকারী কোম্পানিও দেরি করতে পারে। এখন দেশে সরকারিভাবে চীন থেকে আসা কিটেই পরীক্ষা হচ্ছে, যাতে সব রেজাল্ট এক হয়। অন্য দেশ থেকেও কিট আমদানি করা যায়। তবে এখন সবারই সংকট। চীনের এখন অবস্থা ভালো। ওরা যেটা উৎপাদন করছে, সেটা রপ্তানি করতে পারে। আর বাকি দেশে ‘ইমার্জেন্সি ইউজ অথরাইজেশন’, অর্থাৎ ওই দেশ তৈরি করে ওই দেশই ব্যবহার করবে। সুতরাং এখন চাইলেও আমদানি করা যাবে না। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইতালি, জার্মানি, স্পেন, সুইডেন উৎপাদন করে। এর মধ্যে কোরিয়া কিছু রপ্তানি করছে। তবে ওই দেশের কিট দিয়ে পরীক্ষা করা জটিল।

ঢাকার বাইরের বিভিন্ন ল্যাবে কিটের স্বল্পতার তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে চট্টগ্রামের বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ট্রপিক্যাল অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিজেস (বিআইটিআইডি) ও চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজসহ চট্টগ্রাম বিভাগের বিভিন্ন ল্যাবে কর্মরত বিশেষজ্ঞরা জানান, বিআইটিআইডিতে যে কিট আছে তা দিয়ে দুই-তিন দিন চলবে। তাও কম করে পরীক্ষা করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে আশ্বস্ত করেছে আগামী রবিবার কিট চলে আসবে।

অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, কিট সংকটের কারণে সাভারে বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএলআরআই), নোয়াখালীর আবদুল মালেক উকিল মেডিকেল কলেজসহ চট্টগ্রাম বিভাগের কয়েকটি এবং রাজশাহী বিভাগের বগুড়া শহীদ জিয়া মেডিকেল কলেজসহ আরও কয়েকটি ল্যাবে ধাপে ধাপে পরীক্ষা বন্ধ ছিল। বাকি জায়গায় কিটের স্বল্পতার কারণে টেস্ট কম করে করছে। এক দিনে যেখানে ২৫০ টেস্ট করে, সেটা দুদিনে ভাগ করে করছে। যেমন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে কিটের স্বল্পতার কারণে পরীক্ষাও কম করছে। চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিম্যাল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে যে কিট আছে, সেটা দিয়ে চার দিন পরীক্ষা করা যাবে। এর মধ্যে নতুন কিট না এলে পরীক্ষা বন্ধ হয়ে যাবে।

বিভিন্ন ল্যাবের পরীক্ষকরা জানান, কিটের স্বল্পতা শুরু থেকেই। দুই-তিন দিনের কিট দেওয়া হয় একসঙ্গে। পরে শেষ হয়ে গেলে আবার তাগাদা দিতে হয়। সেটা আসতেও দুয়েক দিন সময় লাগে। এভাবেই চলছে।

কিটের স্বল্পতার কারণে গত শনিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে কিট সাশ্রয়ী পরীক্ষার একটি নতুন পদ্ধতির নির্দেশনা দিয়েছে। গত মঙ্গলবার থেকে বিভিন্ন ল্যাবে এ পদ্ধতির প্রয়োগ শুরু হয়েছে। বিআইটিআইডির এক গবেষক বলেন, কম রি-এজেন্ট ব্যবহার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিএলআরআই থেকে বলা হয়েছে, কিটের সংকট আছে। সেজন্য ২৫ মাইক্রো লিটার রি-অ্যাকশন ভলিউম দিয়ে পরীক্ষা করতে বলেছে। এতদিন আমরা ৫০ মাইক্রো লিটার রি-অ্যাকশন ভলিউম পদ্ধতিতে পরীক্ষা করতাম। এটা স্ট্যান্ডার্ড। তবে নতুনটা করেও দেখেছি, একই রেজাল্ট আসে। এতে কিটের সাশ্রয় হয়।

কিটের স্বল্পতা নিরসনে পরামর্শ দিয়ে করোনা মোকাবিলায় গঠিত জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির সদস্য এবং সরকার সমর্থিত স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) সভাপতি অধ্যাপক ডা. ইকবাল আর্সলান দেশ রূপান্তরকে বলেন, কিট সরবরাহ হচ্ছে একটি পথে। চীন থেকে সানসিউর কিট আনা হচ্ছে। মাল্টিপল সোর্স না হলে একমাত্র সোর্সের ওপর নির্ভর করা যায় না। এখন সমাধান হতে পারে মাল্টিপল সোর্স বের করতে হবে। পৃথিবীর অনেক দেশে কিট আছে। সেসব দেশ থেকেও যাতে আনা যায়, সে উদ্যোগ নিতে হবে। সানসিউর কোম্পানির চেয়েও অনেক ভালো মানের কিট আছে। সেগুলো আমদানির ওপর জোর দিতে হবে।

গত পাঁচ-ছয় দিন ধরেই গাজীপুরের শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজের ল্যাবরেটরিতে নমুনা পরীক্ষার জন্য কিটের সংকট চলছে। গত ১৯ জুন পর্যন্ত এখানকার ল্যাবে গড়ে ১৮৮টি করে পরীক্ষা হলেও গতকাল তা নেমে এসেছে ৮২-তে। এর আগের পাঁচ দিন যথাক্রমে ৭৪, ৫৭, ১২৫, ৫৫ ও ১৫১টি পরীক্ষা হয়েছে। ল্যাব সংশ্লিষ্টরা জানান, কলেজ অধ্যক্ষ উদ্যোগ নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে কিছু কিট এনেছেন। পরীক্ষা চলছে। তবে ল্যাবের সক্ষমতা অনুযায়ী সেটা কম।

এ ব্যাপারে কলেজ অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. আসাদ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, এখন স্বল্পতা নেই। মাঝখানে স্বল্পতা তৈরি হয়েছিল। গত বৃহস্পতিবার সংকট দেখা দেয়। পরের রবিবার দেওয়ার কথা ছিল। দেয়নি। পরে ব্যবস্থা নিলে সোমবার কিট পাঠায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। মঙ্গলবার পুনরায় পরীক্ষা স্বাভাবিক হয়। এখন সমস্যা নেই। গাজীপুরে প্রতিদিন নমুনা সংগ্রহ হয় ৭০০। দুই শিফটে পরীক্ষা করলেও ১৮০টা পরীক্ষা করা যায়। বাকিগুলো ঢাকায় পাঠাতে হয়।

আমাদের ল্যাবগুলোর পরীক্ষা সক্ষমতা কেমন জানতে চাইলে ঢাকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ল্যাবরেটরি মেডিসিন অ্যান্ড রেফারেল সেন্টারের পরিচালক অধ্যাপক ডা. একেএম শামসুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, এখানে পিসিআর মেশিন চারটা। একটা মেশিনে দিনে কয়টা পরীক্ষা করা যায়, সেটা নির্ভর করে লোকবলের ওপর এবং কতবার পিসিআর মেশিনটা ব্যবহার করবেন। আমরা একটা মেশিন ২৪ ঘণ্টায় ৮-৯ বার পর্যন্ত ব্যবহার করি। সেজন্য আমরা সর্বোচ্চ পরীক্ষা করতে পারি। প্রয়োজনীয় লোকবল থাকলে দিনে ৭-৮ বার করে মেশিন চালালে প্রতিবার কমপক্ষে ৯০ বা ৯৪টা বের হয়। প্রতি মেশিন দিয়ে প্রতিদিন ৬৩০টা করে পরীক্ষা করা সম্ভব।

বিআইটিআইডির ল্যাবপ্রধান ও সহকারী অধ্যাপক ডা. শাকিল আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, একটা পিসিআর মেশিনে নমুনা একটা ব্যাচ পরীক্ষা করতে চার-পাঁচ ঘণ্টা সময় লাগে। এক ব্যাচে ৯০টা টেস্ট হয়। দুবার করলে ১৮০টা পরীক্ষা হয়। বেশিরভাগ ল্যাবেই ১৮০টা পরীক্ষা হয়। আমাদের ল্যাবে তিন ব্যাচে ২৭০টার মতো করতে পারি। যাদের দুটি মেশিন আছে তারা আরও বেশি করতে পারে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত